আন্দোলনের বিশ্ব : প্রসবযন্ত্রণায় ছটফট করছে সমকাল -- অর্ক ভাদুড়ি

 

উত্তর আয়ারল্যান্ডে সংগঠিত বৃহৎ ধর্মঘট -- চিত্র অর্ক  : ভাদুড়ি  



১৭৫ বছর আগে কার্ল মার্কস লিখেছিলেন, ইউরোপকে তাড়া করছে কমিউনিজমের ভূত। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ইউরোপ তথা গোটা বিশ্বকে ভূত তাড়া করছে ঠিকই, তবে সেই ভূত অতি দক্ষিণপন্থার। কিন্তু সেই ভূত ছাড়ানোর ওঝাও রীতিমতো সক্রিয়। সেই ওঝা হলো গণআন্দোলন।


আগে ভূতের কথা বলা যাক। নেদারল্যান্ডসে হের্ট ভিল্ডার্সের অতি দক্ষিণপন্থি ‘পার্টি ফর ফ্রিডম’ ক্ষমতায় এসেছে। ইতালির বুকে ডানা ঝাপটাচ্ছে মুসোলিনীর উত্তরসূরিরা। দেশের ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী মেলোনির অতি ডান ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’। সঙ্গে জোটসঙ্গী ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার সালভিনির ‘লিগা নর্ড’। দুটিই কট্টর দক্ষিণপন্থি, শরণার্থী বিরোধী দল। জার্মানিতে বিপুল শক্তি বৃদ্ধি করেছে ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি)। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে হাতিয়ার করে সরকার ফেলার ছক কষছেন অতি ডানপন্থিরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সেই ‘বিপ্লবের’ খবর প্রকাশিত হচ্ছে। যাবতীয় ‘অ-জার্মান’ এথনিক ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষজনকে, এমনকি তারা যদি জার্মানির নাগরিকও হন, দেশ থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে প্রকাশ্যে। দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে ‘জার্মানি ফার্স্ট' স্লোগান।


এর মাঝেই ভেঙে গিয়েছে জার্মানির শক্তিশালী বামপন্থি দল ‘ডি লিংকে’ বা লেফট পার্টি। তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী সারা ওয়াগেনট্ (Sahra Wagenknecht)

 যিনি সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানির সোশ্যালিস্ট ইউনিটি পার্টির মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেছিলেন, নতুন দল তৈরি করেছেন। অবশ্য তাতে শাপে বর হয়েছে। কারণ সারাহ ১৪ শতাংশ ভোট পেতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক সমীক্ষা। একই সঙ্গে তিনি নিও-নাজি এএফডির ভোট কেটে নিতে পারেন ৪ শতাংশ। কিন্তু সার্বিকভাবে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।


জার্মানির মতো অতখানি না হলেও স্পেনে শক্তি বাড়ছে অতি ডানপন্থি ‘ভক্স’-এর। হাঙ্গেরিতে ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবানের অতি দক্ষিণপন্থি ‘ফিদেজ’। পোল্যান্ডে ক্ষমতায় ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’, অস্ট্রিয়ায় ক্ষমতায় ‘ফ্রিডম পার্টি’। প্রতিটিই চরম দক্ষিণপন্থি। ফ্রান্সেও বিপুল শক্তিশালী অতি ডানপন্থি লা পেনের দল ‘ন্যাশনাল র‌্যালি’।


ফ্রান্সের পরিস্থিতি অবশ্য অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। বামপন্থি সাংসদ জাঁ লুক মেলেনকঁর দল ‘লা ফ্রান্স ইনসৌমিসে’, যাকে পশ্চিমের মিডিয়া ‘অতি বামপন্থি’ বলে প্রচার করে, তারাও অত্যন্ত শক্তিশালী। গত নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ২২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন একসময় ‘সরাসরি’ কমিউনিস্ট রাজনীতি করা মেলেনকঁ। অতি ডান লা পেনের চেয়ে মাত্র ১ শতাংশ কম ভোট পেয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারেননি। যদি ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি আলাদা লড়ে ৩ শতাংশ ভোট না কেটে নিত, হয়তো ফ্রান্সের রাজনীতি অন্যরকম হতো। ব্রিটেনের জেরেমি করবিন ছাড়া ইউরোপের মেইনস্ট্রিম ‘বামপন্থি’ নেতাদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন মেলেনকঁ। করবিনের মতো ইনিও ঝুঁকি নিতে ভয় পান না। করবিন এবং মেলেনকঁ দুজনেই সোচ্চারে প্যালেস্টাইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সে জন্য তাদের রীতিমতো মুণ্ডপাত করছে পশ্চিমের মিডিয়া। 


ফ্রান্সে যে কোনো কিছুই হতে পারে। ডান অথবা বাম যে কোনো দিকেই হাঁটতে পারে রাজনীতি। কিন্তু তার বাইরে ইউরোপের অধিকাংশ দেশই এখন দেখছে বিপুল অতি দক্ষিণপন্থি উত্থান। আগামী জুনে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের নির্বাচন। সেখানে অতি ডান ব্লকের দারুণ ফলাফলের সম্ভাবনা। ষষ্ঠ স্থান থেকে এক লাফে তৃতীয় স্থানে উঠে আসতে পারে তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন মূলধারার রাজনীতিতে প্রায় অচ্ছুৎ অতি দক্ষিণপন্থিরা এমন জনপ্রিয় হলেন কেমন করে? শরণার্থী সংকট কি তাদের অক্সিজেন দিল? নাকি আরও কিছু কারণ? মধ্য বাম, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বা মধ্য ডানপন্থিদের ব্যর্থতাই কি অতি দক্ষিণপন্থার উত্থানের পথ করে দিল? সেই আলোচনা দীর্ঘ। তবে বাস্তবিকই ইউরোপের জন্য ‘এ বড় সুখের সময় নয়'।


পর ব্রিটেনের রাজনীতিতে যে বাম উত্থান হয়েছিল, এখন আর তেমন পরিস্থিতি নেই। লেবার পার্টি জিতবে, তবে এই লেবার কয়েক বছর আগের মধ্য বাম অবস্থান থেকে অনেকখানি ডানে সরে গিয়েছে। করবিন ইতিমধ্যেই বহিষ্কৃত। গ্রিসের কমিউনিস্ট পার্টি অত্যন্ত শক্তিশালী, তাদের ভোটও সম্প্রতি বেড়েছে, কিন্তু গোটা দেশের সংসদীয় রাজনীতির নিরিখে তা বেশ কম। পর্তুগাল, অস্ট্রিয়াতেও কিছু পকেটে কমিউনিস্টরা শক্তিশালী। রাজধানী ভিয়েনার পর অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর গ্রাজের মেয়র একজন কমিউনিস্ট। পর্তুগিজে কমিউনিস্টদের একাধিক সাংসদ আছেন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে অতি ডানের উত্থান হবে ঠিকই, তবে বামপন্থিদের ফলও খুব খারাপ হবে না। সমস্যা হলো বামেরা বিভিন্ন ব্লকে ভাগ হয়ে আছেন।


কিন্তু এটাই কি একমাত্র ছবি? একেবারেই না। এবার বরং ওঝার কথায় আসা যাক। আসলে ভোট রাজনীতির পাটিগণিতে সবটুকু বিচার করা যাবে না। অতি দক্ষিণপন্থার উত্থানের মাঝেই ভীষণ উৎসাহব্যঞ্জক বিষয় হলো, ইউরোপ জুড়ে শ্রমিক আন্দোলনের জোয়ার বইছে। ব্রিটেনে একের পর এক ধর্মঘট চলছে। জুনিয়র ডাক্তাররা দফায় দফায় ধর্মঘট করছেন। রেল শ্রমিক, লন্ডনের টিউব রেলের কর্মীরা ধর্মঘট করছেন। গত ১৮ জানুয়ারি গোটা উত্তর আয়ারল্যান্ড লাখ লাখ শ্রমিকের ধর্মঘটে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাকে বলা হলো উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধর্মঘট। 

ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। সুইডেনে টেসলার শ্রমিকরা বিরাট আন্দোলনে নেমেছেন। সুইডিশ শ্রমিকদের সংহতিতে অন্য দেশের শ্রমিকরাও পথে নামছেন। টেসলার শ্রমিক আন্দোলন ইতিমধ্যেই ইতিহাস তৈরি করছে। ফিনল্যান্ডেও বইছে ধর্মঘটের জোয়ার। জার্মানি এবং ফ্রান্সে কৃষকরা ট্র্যাকটর নিয়ে পথে নেমেছেন। প্যারিসে ঢোকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা মাঝেমধ্যেই অবরোধ করে রাখছেন তারা। এই লেখা যখন লিখছি, ঠিক তখনই আন্দোলনরত কৃষকরা বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করছেন দুস্থ মানুষদের জন্য।


প্যালেস্টাইনের ওপর ইসরায়েলের বীভৎস গণহত্যা গোটা পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিসরকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ব্রিটেন উত্তাল হয়ে উঠেছে প্যালেস্টাইনের সংহতিতে। লাখ লাখ মানুষ মিছিল করছেন লন্ডনের রাজপথে। এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুমাত্রিকতা। বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একযোগে রাস্তায় নামছেন এথনিক ক্লিনজিংয়ের বিরুদ্ধে। প্রান্তিক যৌনতার অধিকারের সাতরঙা পতাকার পাশেই থাকছে বামপন্থিদের লাল পতাকা, একই সঙ্গে মিছিলে হাঁটছেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম এবং জায়নবাদবিরোধী ইহুদিরা। এই আন্দোলন যে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পেরেছে তার প্রমাণ লেবার নেতা, হবু প্রধানমন্ত্রী কের স্টার্মার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যুদ্ধবন্ধের কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। আন্দোলন চলছে স্পেনেও। হাজার হাজার কৃষক কৃষি সংকট সমাধানের দাবিতে রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন এপি-৭ হাইওয়ে। পোল্যান্ডেও চলছে কৃষক আন্দোলন। গ্রেটার পোল্যান্ড গর্ভমেন্ট অফিসের সামনে ইইউ-এর নিশান ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সার্বিয়ায় নির্বাচনী কারচুপির বিরুদ্ধে বিরাট গণআন্দোলন হয়ে গেল সম্প্রতি। গ্রিসেও কমিউনিস্ট এবং বামপন্থিদের নেতৃত্বে নতুন করে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। অ্যাথেন্সের রাস্তায় ব্যারিকেড লড়াই চলছে।


কেবল ইউরোপ নয়, গণআন্দোলনের জোয়ার বইছে অন্য মহাদেশেও। ক্ষমতায় আসার পর দুমাসও কাটেনি, তার মধ্যেই রাজপথের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছেন আর্জেন্টিনার নবনির্বাচিত অতি-দক্ষিণপন্থি প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই। ক্ষমতায় এসেই আর্জেন্টিনার শ্রমিকদের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন নিজেকে ‘অ্যানার্কো ক্যাপিটালিস্ট’ বলা মিলেই। প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে ফুঁসে ওঠে জনতা। গত ২৪ জানুয়ারি লাখ লাখ শ্রমিকের ধর্মঘটে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মেসি-মারাদোনার দেশ। আফ্রিকাও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল। উত্তর কিভুর অশান্তি মোকাবিলায় পশ্চিমা শক্তির মদদপুষ্ট সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে কঙ্গোয় আন্দোলনকারীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছেন। গুস্তাভো পেট্রোর সমর্থনে হাজার হাজার জনতা পথে নামছেন কলম্বিয়ায়। গণতন্ত্রের দাবিতে উত্তাল সেনেগাল। প্রেসিডেন্ট মাকি সল নির্বাচন বাতিল করায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন জনগণ। প্রধানমন্ত্রী আরিয়েল হেনরির পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলন দমনে অতি সক্রিয়তার অভিযোগ উঠছে হাইতির পুলিশের বিরুদ্ধে। প্যালেস্টাইনের প্রতি সংহতিতে মিছিলে মিছিলে প্লাবিত মধ্যপ্রাচ্যের সব কটি দেশের রাজপথ। দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে একদা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুবনেতা জুলিয়াস মালেমার দল, যারা আন্দোলনের শক্তি হিসেবেই পরিচিত। আগামী নির্বাচনে তাদের ডার্ক হর্স বলে চিহ্নিত করছে মিডিয়া।


দক্ষিণ এশিয়া কি এই বিশ্বজোড়া আন্দোলনের স্রোত থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন? এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কা মাত্র বছর দেড়েক আগে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। সাময়িক পিছু হটার পরে সেখানে নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের দক্ষিণপন্থি নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রবল দাপট সত্ত্বেও আবারও কৃষক আন্দোলন ফেটে পড়েছে। কৃষকরা দিল্লি অভিযান শুরু করেছেন। সরকার ড্রোন থেকে টিয়ার গ্যাস ছুড়ছে। কৃষকরা ঘুড়ি দিয়ে সেই ড্রোন রুখে দিচ্ছেন। পাকিস্তানের নির্বাচনী ফলাফল কার্যত এক নীরব ভোট-বিপ্লবের সাক্ষী দিল। সরকার যেই গড়ুন, পাকিস্তানের জনগণ প্রমাণ করলেন, তারা সেনার আধিপত্যের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের পক্ষে।


একই সঙ্গে অতি দক্ষিণপন্থার উত্থান এবং গণআন্দোলনের জোয়ার মনে পড়িয়ে দিচ্ছে চার্লস ডিকেন্সের কালজয়ী উপন্যাস ‘টেল অফ টু সিটিজ’-এর প্রথম লাইন। প্রকৃত অর্থেই এ সময় সবচেয়ে কুৎসিত, আবার একই সঙ্গে অসাধারণ সুন্দর। প্রসবযন্ত্রণায় ছটফট করছে সমকাল, গর্ভে অপেক্ষারত নতুন সময়।


লেখক : সাংবাদিক ও স্বাধীন গবেষক। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং গণআন্দোলন নিয়ে কর্মরত।

No comments:

Post a Comment

নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি