![]() |
| [চিত্রঋণ-- "Goodbye the day!" শিল্পী - Gregor Pratneker] |
--- ১ ---
দো’তলার জানলার নিচে একটা দোকানের সাইনবোর্ড। সন্ধেবেলা সাইনবোর্ডটা জ্বালালেই অনেকগুলো পোকা সাইনবোর্ডের গায়ে এসে জড় হয়, জানলা দিয়ে ঘরে উড়ে আসে। সন্ধের পর এই জানলাটা খুলে রাখা মুশকিল। অথচ রাস্তার দিকের এই একটাই জানলা, ঘরের অন্য জানলাটা গলির দিকে, সেদিক থেকে আলো বাতাস কিছু আসে না। সকালের দিকে রাস্তার জানলাটা খোলা থাকে, কিন্তু সন্ধের পর বন্ধ করে দিতে হয়। তার ওপর যদি গলির দিকের জানলাটাও বন্ধ করতে হয়, তাহলে দম বন্ধ হওয়ার যোগাড় হবে। কেবল, পর্দাগুলো টানা থাকে... আগে যারা ভাড়া থাকত, তাদের ফেলে যাওয়া তেল-চিটে ধরা পর্দা। দিনের বেলাও টিউবলাইটটা জ্বালিয়ে রাখতে হয়, নাহলে আলোর অভাবটা কেমন চেপে বসে। অবশ্য আলোটা জ্বলছে না এখন, তেল-চিটে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের রোদ এসে আটকে আছে ঝুল-ধরা দেওয়ালের চুনকামে… আর অ্যাশ-ট্রের বুক ফুঁড়ে জেগে থাকা সিগারেটের ধোঁয়ায়।
- দরজাটা হাট করে রেখেছে... উফ্! অন্ধকারে ভূত ভূত খেলছ নাকি? কী অবস্থা!... কী হল? শুনতে পাচ্ছ না?
- ওহ্ তুই... দরজা খোলা ছিল?
- না হলে কি ভেঙে ঢুকলাম? ভাঙলেও তো টের পেতে না! আলো জ্বালাওনি কেন?
- কাল রাত থেকে জ্বলছে না... দেখতে হবে কী হ’ল। তুই কবে এলি?
- কী অবস্থা! পাখাটা চলছে? না তাও কাল রাত থেকে... চেয়ারে রাজ্যের আবর্জনা!
পাখাটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দিয়েছে। খুব ব্যস্ত ভাবে ফোলডিং চেয়ারটা সিলিং ফ্যানের নীচে টেনে, তার ওপর রাখা বই দুটো একরকম ছুঁড়েই পাশের টেবিলের ওপর রেখে দিল অরুন্ধতী। নিজের সালোয়ার-কামিজের ওড়না দিয়ে চেয়ারের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল “উফ্... এইভাবে মানুষ থাকে? এভাবে আর কদ্দিন চলবে বলতে পার?” মৃণাল সেই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিল না। ঠোঁটের কোনে হাসি নিয়ে অরুন্ধতীকে দেখছিল শুধু। একই রকম আছে... আগের মতই খবরদারি। বাইরের রোদ থেকে এসেছে, নীল রঙের ছাতাটা হাতে থাকলেও মুখ’টা রোদে জ্বলে লাল হয়ে আছে। কপাল আর ঠোঁটের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম। পাখার হাওয়ায় হয়ত এখনই শূষে নেবে, অথবা মুছে যাবে ওড়নায়।
“কী দেখছ কী?”, ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে থেমে গেল অরুন্ধতী।
- নাহ্... নাথিং। তুই এলি কবে? হঠাৎ এখানে?...
- কেন এসে ভুল করলাম বুঝি? অন্য কাউকে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট দেওয়া আছে? এসে পড়বে এখনই?”
- এভাবে না বলে এলি, না থাকলে তো ফিরে যেতে হত। বাইরের রোদে চাঁদি গরম হয়ে আছে... জল খা, না হলে মাথায় ঢাল।
এক চোট হেসে উঠল মৃণাল।
“তোমার মাথায় ঢালব! থাকবে না আবার কী? শনিবার তো অফিস নেই, বসেই থাকবে ঘরে সারাদিন। অফিস থাকলেও তো সেই কামাই করে পড়ে থাকবে আর...”, কথা বলতে বলতে সত্যিই স্টেনলেস স্টীলের জাগটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল অরুন্ধতী। তবে কারও মাথায় ঢালার জন্য নয়, কথার মাঝেই জাগটা তুলে মুখের কাছে নিয়ে এলো। ঘামে ভেজা গলা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জলের ধারা। গলা বেয়ে নেমে হারিয়ে গেল আকাশী কামিজের আড়ালে।
“নাহ, আর কামাইয়ের গল্প নেই... নো চাকরি, নো কামাই।”
“মানে?”, হাতের জাগটা কেঁপে উঠল। চলকে পড়ল কিছুটা জল। অযাচিত ভাবেই ভিজিয়ে দিয়ে গেল নিজের আওতার বাইরে।
- মানে আর কি... খ্যাদায়ে দিসে... হা হা হা!
- তুমি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেলে মণি দা?
এতক্ষণ ধরে চলা খবরদারিটা হঠাৎ যেন একটা হোঁচট খেল। স্টিলের জাগটা দু’হাতে আঁকড়ে ধরে অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে আছে অরুন্ধতী। চোখ দুটো একটু বেশিই বড় দেখাচ্ছে... রাগ, অবিশ্বাস না দুশ্চিন্তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ঠোঁট অল্প ফাঁক, হয়ত কিছু বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। মুখে হাসিটা ধরে রেখেই মৃণাল বলল, “এতে পাগল হওয়ার কী আছে?… চাকরি নেই তো আর কী করা যাবে?”
- নেই মানে? অত ভালো চাকরিটা...
- দূর... আর পোষাচ্ছিল না। রোজ এক নিয়ম... এক ভাবে বসে থাকা।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল অরুন্ধতী, মৃণালের কিছুটা কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে অগোছালো বিছানার গা ছুঁয়ে বলল, “কী বলছ মণিদা!... অত ভালো চাকরিটা ছেড়ে দিলে?” একটা উদ্বেগ... গলাটা যেন কেঁপে উঠল। এই উদ্বেগে অস্বস্তি হচ্ছিল মৃণালের। ইচ্ছে করেই ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। একটু দূরে সরে গিয়ে হাত বাড়িয়ে জানলার পর্দাটা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। গলিটা দিয়ে কেউ যায় না এই সময়ে। ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়েই বলল “বললাম তো ভালো লাগছিল না। চাকরি লোকে করে কেন? টাকা? সে যা আছে, তাতে দিব্যি চলে যাচ্ছে।”
কথাগুলো যেন একই প্রসঙ্গে বার বার উঠে আসে। এমনই অবেলায় কত বার এই ভাবেই চাকরির প্রসঙ্গ উঠেছিল, বার বার ঘুরে ফিরে আসা মৃণালের উদাসীনতা। অরুন্ধতী জানে, হাজার চেষ্টা করেও এই লোকটাকে প্র্যাকটিকাল করা যাবে না। তবু গলাটা গম্ভীর করে বলল “এটা কোনও কথা হল মণিদা... এভাবে চাকরি ছেড়ে বসে আছ... বাড়িতেও কেউ কিছু বলল না?” এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া মুশকিল। মৃণাল একই ভাবে জানলের বাইরে তাকিয়ে বলল, “এভাবে জেরা করবি বলেই কি অবেলায় এলি? এত সব খবরে করবি টা কী?... অ্যাদ্দিন পর এলি... তোদের খবর বল।” ঘরের মধ্যে আসতে আসতে একদিক থেকে অন্যদিক হাঁটছে অরুন্ধতী। পায়ের শব্দ হচ্ছে না, হাতের চুড়িগুলোর ধাতব শব্দ। বোধহয় নতুন কিনেছে, কিনে দিয়েছে ওকে। বড় রাস্তার দিকে জানলাটার কাছে এসে দাঁড়াল, গোড়ালিটা সামান্য উঁচু করে পর্দার ওপর দিয়ে রাস্তাটা দেখার চেষ্টা করে বলল “আমাদের আবার খবর... খুব তো খবর রেখে এসেছ চিরকাল। ছুটি পাওয়া গেল এক হপ্তার তাই ঘুরে গেলাম... ছুটিই তো পাওয়া যায় না।”
- তোর ছুটি? না তোর বরের ছুটি?
- ওই একই হল...
“বলিস কি... তোর আর তোর বরের ছুটি এক কথা?”, হা হা করে হেসে ফেলল মৃণাল।
জ্বালাবার জন্য যে সিগারেরটটা সবে ঠোঁটের ফাঁকে ধরেছিল, কোলের ওপর পড়ে গেল। টেবিলের ওপর থেকে একটা পুরনো মলাটের বই তুলে নিয়েছে অরুন্ধতী, বইটার কটা পাতা উলটে-পালটে ঠোঁট উলটিয়ে বলল “বাবা, তুমি বিমল মিত্তির পড়ছ? তোমার তো ওই সময়ের বাংলা ফিকশন সহ্য হয় না... কী সব হাবিজাবি...”, “সহ্য না হলে কি আর থাকে না? আসেপাশে সব কিছুই কি খুব সহ্য করার মত?... কিন্তু কেমন সয়ে যায়। সয়ে গেছে, এখন খারাপ লাগে না।”, সিগারেট টা আবার ঠোঁটের ফাঁকে নিয়ে ফস্ করে জ্বালিয়ে নিল মৃণাল। মুহূর্তের জন্য যেন একবার জ্বলে উঠল অরুন্ধতীর চোখ, কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। গলার স্বরটা নামিয়ে বলল “ওই খোঁচা দিয়ে কথা... ”, তারপর আবার খাটের দিকে এগিয়ে এসে গলাটা তুলে বলল “দু’মিনিটের জন্য এসেছি, তার মধ্যেও বিড়ি ধরাতে হবে? অ্যাশ-ট্রেটা তো উপচে পড়ছে... আর ফেলবে কোথায়? খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে ঘরে বসে বসে ধোঁয়া টানো... অসহ্য!”
“এই রে! সত্যিই তো, তুই কতদিন পর এলি... তোকে কী যে দেব... ঘরে...” অসহায়তা না ছেলেমানুষী ঠিক বোঝা যায় না, তবে মৃণালের কথা বলার এই ভঙ্গিটা চিরকাল অরুন্ধতীকে একই ভাবে প্যারালাইস করে দেয়। ও ধীরে ধীরে খাটের এক পাশে বসে বলল, “ফর্মালিটি করছ মণিদা? কী আবার দেবে? রান্নাঘর তো বন্ধ দেখছি... নিজে সকাল থেকে কিছু খেয়েছ?”
“হ্যাঁ তো, সকালে বেড়িয়েছিলাম একবার। তখন বাইরে থেকে খেয়ে এলাম... বেশ ঢেকুর তুলে!”, জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে মুখ করে সিগারেটের এক রাশ ধোঁয়া উড়িয়ে দিল মৃণাল। তবু কিছু ধোঁয়া হাওয়ায়ে পাক খেয়ে ফিরে এল ঘরের ভেতরে।
- সেই সকালে কখন খেয়েছ... আর এই বেলা তিনটের সময় না খেয়ে বসে আছ... এসব কী? কৃচ্ছসাধন?”
- কৃচ্ছসাধন? হা হা হা... খিদে পায়নি তো... পেলে সন্ধেবেলা আবার কিছু খাওয়া যাবে, নিয়ে আসব রাতের জন্য।”
- কোনও কথা শুনব না... এখনই চল, কোথাও একটা কাছাকাছি গিয়ে খেয়ে আসা যাক... বেশ গল্পও করা যাবে।”
- ওরে! এখনই বললেই কি আর হয়? বস না, গল্প করি এখানে...”
- না না... আমি কোনও কথা শুনব না... তুমি পড়ে থাকো একা একা এইখানে! এই ঘুপচি ঘরে দম আটকে আসে আমার... শিগগির চলো বাইরে কোথাও... চলো বলছি।”
মৃণালের ডান হাতটা ধরে দু-তিন বার টান দিল অরুন্ধতী। হাতগুলো আগের থেকে খানিক মোটা হয়ে গেছে। টানতেই মৃণাল তার দিকে হেলে গেল। সেই একরকম অধিকার বোধ, অধিকার দেখাতে বেশ পারে এখনও। হাতের চুড়িগুলো ক্রমাগত ধাতব প্রতিবাদ করে চলেছে। না শুনলে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে। কোনওরকমে বাঁ হাতে সিগারেটটা মুখ থেকে বার করে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা... উফ! তুই কি আর ছাড়বি? মাথা খাস না... চেঞ্জটা করতে দে?” চেঞ্জ করার কথা উঠতেই অরুন্ধতী মাথা নীচু করে খাট থেকে সরে দাঁড়াল। সরে গিয়ে বলল “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বাইরে ওয়েট করছি... তুমি চেঞ্জ করে বেরিয়ে এসো।” খাট থেকে নেমে হাত বাড়িয়ে সামনের হুক থেকে পাঞ্জাবী আর ট্রাউজার নামাতে নামাতে মৃণাল বলল “দূর! এখানেই বস ফ্যানের তলায়,বাথরুম আছে তো... আচ্ছা, আমি কি শেভটা করে নেব?”
--- ২ ---
এইসময়ে দোকানে বিশেষ ভিড় থাকে না। সবে বিকেল, প্রায় সব টেবিলই খালি। কোণের দিকের একটা টেবিলে এক-জোড়া বসে আছে, পাশের চেয়ারে পিঠে নেওয়ার হালকা ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখা। একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক আর একটা খাবারের প্লেট। খাবার পড়ে আছে... খেতে কি আর এসেছে? হয়ত প্রেসি কিংবা সিইউ। মৃণাল কিছুক্ষণ অন্যমনষ্ক ভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল “কতদিন পর বল?... বেশ লাগছে বুঝলি...”
- তাহলে ন্যাকামি করছিলে কেন?
- নাহ্, আসলে এদিকে আর তেমন আসা হয়না তো...
- হুম... বুঝলাম।
- ক’দিন থাকবি?
- নেক্সট সানডে’র ফ্লাইট।
- বর লম্বা ছুটি নিয়ে এসেছে তাহলে।
- না না... ও পরশুই ফিরে যাবে। নেক্সট উইক ফিলাডেলফিয়া যাচ্ছে, তার আগে কী সব অফিসিয়াল কাজ ছিল এখানে...
- তুই যাচ্ছিস না?”
- নাহ্… আগের বার গেছিলাম।”
- বেশ বরের সাথে এখান ওখান ঘুরে বেড়াস বল?
- পাসপোর্ট, ফাইল-পত্তর, ওষুধের বাক্স, শেভিং কিট… এগুলো জরুরি জিনিস। বাইরে বেরোলে সঙ্গে নিয়ে বেরোতেই হয়।”
- তাহলে এবার জরুরি জিনিসটার কি হল?
- আগের মত জরুরি নেই...
কোণের টেবিলে সেই ছেলে মেয়ে দু’টোর মধ্যে কিছু একটা কথা কাটাকাটি হয়েছে, মেয়েটা হঠাৎ উঠে চলে গেল। ছেলেটাও তার পেছন পেছন বেরিয়ে গেল টেবিলে একটা একশ টাকার নোট রেখে। সেদিকে তাকিয়ে মৃণাল একবার অস্ফুটে বলল “এরা বেশ নতুন আছে এখনও”। তারপর অরুন্ধতীর দিকে তাকিয়ে বলল “আজকালকার ছেলেপিলে কি দিল-দরিয়া দেখেছিস... টেবিলে একশ টাকা ফেলে দিয়ে চলে গেল!”
- সবাই কি তোমার মত নাকি? চা-চিনেবাদাম খাইয়ে কাটিয়ে দিলে!
- সবাই?... কেউই আমার মত নয়...
- না হওয়াই ভালো... মেন্টাল একটা!
- দেবাংশু তোকে অনেক ভালো ভালো রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়... না?”
- ইয়েস! যেখানে বলব সেখানে... যা চাইব তাই!
- যা চাইবি তাই? যা চেয়েছিলি সব পেয়েছিস?... হা হা হা..., খাসা ব্যাপার!”
- ঠুকছ... না?
- না না... ভালো ভালো। শুনে খুব ভালো লাগল... দেবাংশু সত্যিই কেপেবল।”
- হিংসে হচ্ছে?
“তোকে না তোর বর কে?”, হা হা করে জোরে হেসে উঠল মৃণাল। হোটেলের ওয়েটাররা একবার ওদের দিকে তাকিয়ে দেখল। একজন অল্প-বয়সি ওয়েটার একটা টেবিল মুছতে মুছতে ফিক করে হেসে ফেলল। একটু বেশিই সময় নিয়ে টেবিলটা মুচ্ছে ছেলেটা। অরুন্ধতী একবার ছেলেটার দিকে বিরক্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “একটু আসতে কথা বলতে পার না? কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই... উফ্!”
- ফিশ কবিরাজীটা খাসা বানিয়েছে বুঝলি? খা খা... তোর তো অর্ধেক পড়ে আছে এখনও!
- আমার খাওয়া হয়ে গেছে, তুমি শেষ করে নাও... উঠতে হবে এবার।
- আমি ওইরকম হাফে ছেড়ে দিতে পারছি না... তুই সত্যিই অতটা নষ্ট করবি? দিয়ে দে তাহলে!”
একজন ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে অরুন্ধতী ইশারায় ডাকল। এই লোকটি মুখ চেনা, অনেক দিন ধরে আছে দোকানে। এগিয়ে এসে সামনে ঝুঁকে পড়ে বলল, “আর কিছু লাগবে দিদি?” অরুন্ধতী একবার মৃণালের দিকে তাকাল, সে ফিশ কবিরাজী কাটতে ব্যস্ত। ওয়েটারটাকে বলে দিল, “না, আর কিছু লাগবে না... বিলটা নিয়ে আসুন।” লোকটা আচ্ছা বলে ঘাড় নাড়ল, তারপর একটু ইতস্ততঃ করে বলল “কতদিন পর এলেন এখেনে... ”
- আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
- তা পারব না? একসময় কত এয়েচেন...”
মৃণাল মুখে কবিরাজী নিয়ে বলল, “দূর... এতো হরিদা রে... তুইও যেমন, আমাদের চিনবে না?”
“ও আচ্ছা... বিলটা নিয়ে আসুন... একটু তাড়া আছে।”
ওয়েটার বিল আনতে চলে গেল ব্যস্ত ভাবে। অরুন্ধতী ধমকের সুরে মৃণালকে বলল, “হরিদা রে... চিনতে পেরেছে... কেতাত্থ করেছে! সত্যিই কোনও আক্কেল হবে না তোমার!”
- যাব্বাবা চিনল তো কী হ’ল?
- ও তুমি বুঝবে না... তোমাকে বোঝানো আমার কম্ম নয়!
হরি দা বিল নিয়ে টেবিলে চলে এসেছে, মুখ এখনও হাসি লেগে আছে, “এই যে দিদি, বিলটা।”
“হ্যাঁ, কত হল দেখ তো?”, বলে পাঞ্জাবীর পকেটের দিকে হাত বাড়াল মৃণাল।
- দাঁড়াও... আমি দিচ্ছি। আজ আমার ট্রিট।
“হ্যাঁ হ্যাঁ... তুই দে... বড়ের ফিলাডেলফিয়া যাওয়ার ট্রিট। দেখিস, এখানে কিন্তু কার্ড-ফার্ড চলে না... সে সব যন্তর নেই!”, আবার হেসে ফেলল মৃণাল হা হা করে।
--- ৩ ---
- কী রে! ট্যাক্সিটা এই দিকে ঘুরোতে বললি কেন? তুই তো নর্থে যাবি, এম জি রোডের দিকে নিতে বল?
- নর্থে কেন যাব?
- তোদের বাড়ি তো... ওহ, শ্বশুর-বাড়ি নর্থে না?
- এখন ফিরব না... ময়দানের দিকে যাব।
- সেকি... বাড়িতে চিন্তা করবে যে, দেরি হলে... ”
- তোমার অসুবিধে থাকলে বল, ঘুরিয়ে নিতে বলছি!”
মৃণাল আর কোনও কথা বলল না। জানলার কাঁচটা নামিয়ে বাইরের খোলা হাওয়ায় মুখটা এগিয়ে দিল। পড়ন্ত রোদের সেই আঁচটা আর নেই। কেমন একটা হালকা মেঘ, সূর্যকে ঢেকে রেখেছে। বাইরে কি সত্যিই একটা বাতাস বইছে?... নাকি ট্যাক্সিটা চলছে বলেই...
“আজ দুপুরে তোমার ওখানে আসার সময় একটা সিগ্ন্যালে সে কি জ্যাম... আর তার মধ্যে গাইতে লেগেছে ‘আমার সকল রসের ধারা...’, ন্যাকামোর একশেষ! হা হা হা”
“হারিয়ে যাওয়া মনটি আমার... ফিরিয়ে তুমি আনলে আবার।”, জানলার বাইরে বিবাদি বাগের বাসের দিকে তাকিয়েই অস্ফুট ভাবে বলল মৃণাল।
“কী? কী বিড়বিড় করছ?”
সোজা অরুন্ধতীর দিকে তাকিয়ে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল মৃণাল, আড়-চোখে রেয়ার ভিউ মিররে ট্যাক্সি ড্রাইভারের চোখ দেখে থেমে গেল। তবে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল অরুন্ধতীর দিকে। ট্যাক্সিতে বসে আছে বলে একটু হাওয়া খেললেও চাপা গরমটা রয়েছে। ঘামের বিন্দু আবার ফুটে উঠেছে অরুন্ধতীর কপালে, ঠোঁটের ওপর, গলার ভাঁজে। আগের থেকে স্বাস্থটা ঠিক হয়েছে, আগের বার এমন লাগেনি... এবার যেন একটু মোটাই মনে হচ্ছে। নিজেদের বাড়িতে হয়ত... হয়ত কেন? নিশ্চয়ই এসি আছে। এখানে গরমে হিমশিম খাচ্ছে।
- ঘেমে গেছিস যে একেবারে, গায়ে ঘাম বসে জ্বর হবে আবার... রুমাল আছে সঙ্গে?
- ঘাম দেখছিলে এতক্ষণ ধরে?
ড্রাইভারটা মাঝে মাঝেই মাথার ওপরের রেয়ার ভিউ মিররটা একবার করে দেখে নিচ্ছে। রেয়ার ভিউতে আটকানো সেই চোখ দু’টোকে অগ্রাহ্য করেই মৃণাল স্পষ্ট ভাবে বলল –
“ছড়িয়ে পড়া আশাগুলি, কুড়িয়ে তুমি লও গো তুলি... গলার হারে দোলাও তারে, গাঁথা তোমার ক’রে সারা।”
ড্রাইভারটা কী বুঝল কে জানে... সামনের ট্রাফিক সিগন্যালের জ্যামটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ডানদিকের একটা সরু রাস্তা ধরে নিল। জানলার বাইরে কর্পোরেশনের কলে চান করা বাচ্চাগুলো এ ওর গায়ে জল ছেটাচ্ছে। অরুন্ধতী সেই দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসা গলায় বলল -- “আদিখ্যেতা!”
--- ৪ ---
- ময়দান বলে এলি, আর সেই ধরে নিয়ে এলি গঙ্গার ধারে...
- বেশ করেছি... কতদিন এদিকে আসা হয় না, জানো...
যখন বেরিয়েছিল তখন পড়ন্ত রোদ, তারপর হালকা মেঘ এসে রোদ ঢেকে দিল। আর এখন সন্ধ্যাঘন মেঘগুলোর আড়ালে লুকিয়ে পড়ার আগে, শেষবারের মত উঁকি দিচ্ছে সূর্যদেব। তবে হাওয়াটা দিচ্ছে, উত্তর পশ্চিমে যেন একটা লালচে মেঘও আসতে আসতে জমাট বাঁধছে।
- আগে তাও মাঝে-সাঝে আসতাম... এখন একেবারেই আর হয়ে ওঠে না।
- চাকরিটা ছাড়লে কেন মণি দা? একা একা এভাবে ঘর ভাড়া নিয়ে...
- এমনি... দরকার হলে আবার খোঁজ করব... এখানে আর ভাল্লাগছে না, কেমন যেন দম বন্ধ করা...
- তুমি এ কথা বলছ মণি দা? কলকাতা ছেড়ে চলে যাবে বলে চাকরি ছেড়েছ তাহলে?
- কিছু ঠিক করিনি... দেখা যাক।
অরুন্ধতী চুপ করে সামনের দিকে চেয়ে রইল। বাতাসে চুল উড়ে এসে মুখে পড়ছে এলোমেলো হয়ে। ওড়নাটাও উড়ছে। হাওড়া ব্রিজ আর দ্বিতীয় হুগলী সেতুর আলোগুলো জ্বলে গেছে, সন্ধে নেমে এল। এই দিকটা বিকেলে আর সন্ধের মুখে লোকজন আসা যাওয়া করে। লোকজন বলতে কপোত-কপোতী। আসে পাশে তাই আইসক্রিম,চিনে বাদাম, ভুট্টা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মৃণাল আর অরুন্ধতীও অনেক বিকেল এখানে কাটিয়েছে। গঙ্গার বুকে হেলে যাওয়া গাছগুলোর কাছে রঙ-চঙে নৌকোগুলো বাঁধা, ঢেউয়ের ধাক্কা হালকা দোলা দিয়ে যাচ্ছে, বোধহয় জোয়ার আসবে।
- নৌকো চড়বে?
- পাগল হয়েছিস!
- তাহলে বসে বসে সল্ট-বাদাম খাও!
“খাবি?”, বলে হা হা করে হেসে উঠল মৃণাল।
- রাস্তায় বেরোনোর পর থেকে একটু বেশিই হাসছ তুমি!
- অনেক দিনের জমে থাকা হাসি রে... আজ না হাসলে, বাকি থেকে যাবে।”
- হাসি না পরিহাস?
“পাগলী!... দাঁড়া, দু-প্যাকেট সল্ট-বাদাম কিনে আনি... অন্য কিছু ইচ্ছে হলে বলিস... পরে চাইলেও পাবিনি!... হা হা হা”
একজনের থেকে কেউ কিছু কিনলে... পাশের আইসক্রিম, ঘুগনি, ঘটি-গরমরাও আশা নিয়ে চেয়ে থাকে। তাদের নিরাশ করেই মৃণাল ফিরে এলো শুধু দু-প্যাকেট সল্ট-বাদাম নিয়ে। একটা অল্পবয়সী ছেলে অনেকক্ষণ ঘুর ঘুর করছে চায়ের কেটলি নিয়ে। দুটো লেবু চা না নিলেই নয়।
রেলিঙে হ্যালান দিয়ে নোনতা বাদামগুলো একটা একটা করে খেতে খেতে অরুন্ধতী লোকজনের যাওয়া আসা দেখছে, আর মাঝে মাঝে ফিক ফিক করে হাসছে নিজের মনে। দিনের আলো আকাশ থেকে মুছে গেছে, গঙ্গার বুকে ভাসছে এদিক ওদিক থেকে পড়া আলোর চলমান প্রতিবিম্ব... স্রোতে আঁকা আলোর আলপনা। কাগজের কাপটা হাতের মুঠোয়ে মুচড়ে দিয়ে মৃণাল বলল, “অন্ধকার নেমে এসেছে... বেলা শেষ।”
“হুম, খেলা শেষ।”, একটা দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে বাদামের প্যাকেটটা উড়ে চলে গেল রেল লাইনের দিকে।
সারাদিন ইচ্ছে করেই একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলছিল মৃণাল। সন্ধের মেঘ থেকে নেমে আসা বাতাসটা অশ্বত্থপাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যেতেই, অরুন্ধতীর একটু কাছে সরে এলো... ইচ্ছেই করেই। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল –
“যখন তোমার আঁচল দম্কা হাওয়ায় একা একা উড়ছিল
তখনও নয়
বিকেলে পড়ন্ত রোদে বিন্দু বিন্দু ঘাম
তোমার মুখে যখন মুক্তোর মত জ্বলছিল
তখনও নয়
কী একটা কথায় আকাশ উদ্ভাসিত ক'রে
তুমি যখন হাসলে
তখনও নয়...
যখন তোমাকে আর দেখা গেল না --
তখনই আশ্চর্য সুন্দর দেখাল তোমাকে।”
প্রতিটি ‘তখনও নয়’-এর সাথে রেলিঙটাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরছিল অরুন্ধতীর আঙুলগুলো। চোখ বন্ধ করে অস্ফুটে শুধু বলল, “চুপ করো... আজ আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছে না!”
মৃণাল দু’পা পিছিয়ে এসে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এবার ফিরে যা রুনু... এরপর রাত হয়ে যাবে।”
“হুম, রাত হয়েই গেছে... চলো।”
“তোকে ট্যাক্সি ডেকে দিই? আমি খানিকটা হেঁটে এসপ্ল্যানেড থেকে মেট্রো ধরে নেবো।”
“খানিকটা না... অনেকটা হাঁটা।”
“ও চলে যাব ঠিক।”
“আমিও যাব... মেট্রোতে, গিরিশপার্ক অবধি। টিকিটটা তুমি কেটে দিও।”
--- --- --- ---
বেরনোর সময়ে জানলাটা বন্ধ করা হয়নি। সন্ধের আগে থেকেই উত্তর-পশ্চিমে যে মেঘটা অপেক্ষা করছিল, প্রথমে কিছুক্ষণ বাতাসের হুঁশিয়ারি দিয়ে অবশেষে ভিজিয়ে দিয়ে গেল শহরকে। অরুন্ধতী জানলার পর্দাটাও সরিয়ে দিয়ে গেছিল। দোকানের সাইনবোর্ডটা জ্বলছে, বাদলা পোকায় ঘর ভরে গেছে। এখন আর ও জানলা বন্ধ করেও বিশেষ সুবিধে হবে না। ঘরে ঢুকেই ফ্যানটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দিল মৃণাল। দমকা হাওয়া টেবিলের ওপর অগোছালো কাগজপত্রগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন পাখার হাওয়ায় সেগুলো ফরফর করে প্রতিবাদ করছে। ট্রেনের টিকিটের প্রিন্ট আউটটাও পড়ে আছে। ভাগ্যিস! জানলা দিয়ে উড়ে যায়নি... নাহলে আবার প্রিণ্ট করাতে ছুটতে হত। কাল সকালের ট্রেন। অরুন্ধতীকে বলা হল না। না... ইচ্ছে করেই জানায়নি মৃণাল। কালই কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে... জামশেদপুর’। এর পরের বার এইভাবে সারপ্রাইজ্ দিতে এলে হয়ত দেখবে দরজা তালা বন্ধ, অথবা অন্য ভাড়াটে। নতুন ঠিকানাটা অরুন্ধতীকে... আসলে, আজ সকাল অবধি ঠিল ছিল -- জানাবে না! এইমুহূর্তেও যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, মৃণাল বলবে ‘নাহ্’।
খাটে ছড়িয়ে থাকা সব কিছু একপাশে ঠেলে দিয়ে মোবাইল ফোনটা নিয়ে বসল। কিছুদিন আগে কতগুলো গান ডাউনলোড করে রেখেছিল, চালিয়ে দিল লাউডস্পিকার মোডে। জানলার বাইরের যান্ত্রিক শহরটা চোখ বন্ধ করে নিলে আর দেখা যায় না। রাস্তা থেকে ভেসে আসা গাড়ির আওয়াজ, হর্ন... সব উপেক্ষা করে মোবাইল ফোনে দেবব্রত বিশ্বাস গাইছেন –
“আর কি কখনও কবে, এমন সন্ধ্যা হবে...”
[শ্রাবণ, ১৪২০]

এমন লেখা এখনও হয়!...
ReplyDeleteএখনও লেখে কেউ!...
আদর জানাই!... ...