দুটি গদ্য -- সুধন্য সরকার


চিত্র -- সুধন্য সরকার



(১)


সোমনাথের মা বলল ; জানিস আমাদের ঘরে না; কোন জানলা নেই-- 

আলো-বাতাস আসে না!

একটা দরজা দিয়ে আসা-যাওয়া। 

একটা জানলা কাইট্যা দিবি? 

মুলিবাঁশের বেড়ার ঘর। টালির চাল। আর সোমনাথ আমার বাল্যবন্ধু। 

ময়া ময়া। একটু তোতলায়। সেবার দোলের সময় মরা মরা খেলতে গিয়ে শয়নদোলা থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে গেল ওর। 

কেউ জিজ্ঞেস করে বললে; হাত ভাঙলি কী করে? 

ও বলতো ; ময়া ময়া খ্যালতে গিয়া হাত ভ্যাইঙ্গা গ্যাছে।

ব্যস, সেই দিন থেকে ওর নাম ময়া ময়া হয়ে গেল।

পাড়ায় অনেক কাঠের কারখানা। আত্মীয় দাদারা কাজ করে সেখানে। আমরা আড্ডা দিই, গল্পগুজব করি।

সোমনাথের মা ভেবেছে আমরাও হয়তো কাঠের কাজ জানি। এবং এই কাজ করার জন্য কয়েকটি টাকাও দেবেন বলে জানালেন। 

আমরা বন্ধুরা তখন টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ক্যাম্বিস বল, রাবার ডিউস, ফুটবল কিনি চাঁদা দিয়ে। 

ম্যাচ খেলতে যাই এপাড়া ওপাড়ায়। 'হিজ মাস্টার' গেঞ্জি কারখানার অফিসে আসা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ি মেজদার কাছ থেকে নিয়ে। খেলার খবরের সাথে সাথে বইয়ের বিজ্ঞাপনও পড়ি। 

তেমনই এক বিজ্ঞাপনে দেখলাম ' সুভাষ ঘরে ফেরে নাই ' বইটি। অনেক ছবি, অনেক লেখা। 

দাম সামান্য হলেও আমার কাছে অনেক! 

আমি নেতাজীর ভক্ত। মাঝে মাঝে তাঁর কথা, তাঁর বীরত্বের কথায় আমার চোখে জল চলে আসে।

সেদিন সোমনাথের মায়ের প্রস্তাবটা আমি গ্রহণ করেছিলাম।

একটা করাত, বাটালি আর হাতুড়ি নিয়ে এলাম বিমলদার কারখানা থেকে। কয়েকটা পেরেক। 

শুধুমাত্র একটা ইচ্ছার জন্য আমার অনভিজ্ঞ দুই হাত কাঠমিস্ত্রীর কাজ না জানা আমির উপর যেন বিশ্বকর্মা ভর করে ছিল সেদিন।

ঠুক্ ঠুক্ করতে করতে দেখলাম; নেতাজী বলছেন, 'দিল্লী চলো'। আজাদ হিন্দ বাহিনী এগিয়ে চলছে। সাঁজোয়া গাড়ি, কাঁদা পথ, জল-ঝড় ডিঙিয়ে চলছে তো চলছেই। 

একটা বিমান উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে পাখির মতো, কিছুটা গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ল। কারা যেন বলাবলি করতে লাগল; নেতাজী মারা গেলেন বিমান দুর্ঘটনায়!

বিশ্বাস করি না; বিশ্বাস করিনা!

পাখিটাকে যেন দেখি আবার মাথার উপর চক্কর কাটতে।

আমি পেরেছিলাম সোমনাথদের ঘরে আলো-বাতাসের পথ তৈরি করে দিতে। 

অন্ধকার ঘরটার আলো, যা আমি আজও ভুলতে পারিনি।




(২)


গতকাল মনটা এমনই দুঃখী হয়ে ছিল যে, কিছুই ভালো লাগছিল না। 

বিকেলের  দিকে বড় রাস্তাটা পেরিয়ে এক ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

মুখ তেতো। মাথাটা অস্থির। 

একটা শূন্য মানুষ যেন আমি!

মনে হচ্ছে আমাকে যেন কেউ দেখতেই পাচ্ছে না। 

যান-বাহন আর মানুষ, রাস্তার কুকুর সবই যেন আমার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। 

ইচ্ছে না থাকলেও পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে, এক হাতেই লাইটার ধরানোর চেষ্টা করলাম। দমকা এক হাওয়ায় আগুনের শিখাটা সরে এল ডানহাতের বুড়ো আঙুলের নখের নীচে। তীব্র একটা জ্বলুনি। 

অনেকগুলো ভেড়া নিয়ে তিন-চারটে বাচ্চা ছেলে রাস্তাটা পেরিয়ে এল। ট্রাফিক বন্ধ রইল। ভেড়াগুলোর গায়ে চিহ্নিতকরণ রঙের দাগ। 

বুড়ো আঙুলটা মুখের ভিতর ঢুকিয়ে চুষতে থাকলাম। নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। জ্বলুনিটা চলতেই থাকল। আঙুলের কায়দায় টোকা মেরে সিগারেটটাকে অনেক দূরে ছুঁড়ে ফেলেছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে। 

জল, জল খেলে কি শান্ত হবে মন? 

ভাবতে ভাবতে কিছুটা এগিয়ে গেছি। ম্যাটাডোরের সাথে এক সাইকেল। হেলান দেওয়া। 

ক্যারিয়ারে বোঝাই ছাড়ানো পশুর চামড়া। চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। চামড়াগুলো যেন নড়ে উঠল। কথা বলে উঠল আমার সাথে।

বুড়ো আঙুলটা আরও তীব্র জ্বলুনিতে জ্বলে যাচ্ছে। 

লিখলাম...


'কীভাবে যেন একটু আগুনের ছোঁয়া গায়ে লাগল 

তীব্র জ্বালা, 

উপায় খুঁজতে গিয়ে 

মুখের লালায় ভিজিয়ে নিলাম শরীর। 

জ্বালা কমল না, যন্ত্রণাও না।


তুই জানিস, 

কত কিছুই তো আমি পারি না! 

ফস্ করে একদিন 

যদি হয়ে যাই অন্ধ,

গলা কেটে কথা বন্ধ।


ইরাবতী জানে 

শহরের পথে, মানুষের মুখে চোখে 


সে-ও কি পারে? 

জ্বালা যদি ধরে তারে;

কাছে এসে, দূরে থাকে। 


'পারব ' বলে ভুলে থাকে 

কী এক যন্ত্ররে...

আমরা! 


শহরের পথে পথে ব্যাধ আর কশাই মিলে

টেনে তোলে চামড়া।' 


                           ------


আমার বেঁচে থাকা যন্ত্রণাময় যেন

ফোন ধরলাম না, দিলাম না মেসেজের উত্তর। 

একি তোকে ভুলে থাকার প্রয়াস, চেষ্টা আর কসরত শুধু?

তুই পারলেও, আমি যে পারি না কিছু...


হে প্রিয়,

ফোন করিস, লিখিস মনের  কথা টুকু...


২৮/৫/২৫


কবিতাগুচ্ছ -- দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

[চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল]





ব্যক্তিগত 


(১)


নীরবতা তাল ঠুকছে না যদিও

বলে যাচ্ছে অনেক কিছু 

ছু কিত কিতের বেলা পেরিয়ে 

এখন গন্ডীর ভেতরে 

উথাল পাতাল হচ্ছে   

নাওয়ের শরীরে যেন জল নেই 

ভাটিয়ালি নেই আর চুপ খোলে

খুলছে না খাতা যাতে অক্ষর পড়বে 



(২)


এখন সোনাঝরা রোদ্দুরে নেই 

অন্ধকার ঘরের ভিতরে এক অন্ধ 

বিগত কর্কট মাখা দিনের স্মৃতি

রোমন্থন করে যায় আর আপসোস 

পোষা বেড়াল হয়ে কোলে চেপে বসে


(৩)


চুপ শব্দটির ভিতর চাপা কিছু থাকে 

তাকে সন্ধ্যা নামে ডাকি 

অন্ধকারের প্রদীপ তাকে দেখে 

আর উজ্জ্বল  

সে তখন দেবী না মা হয়ে ওঠে


(৪)


লক্ষণরেখা পেরোতে পারছি না

দানব সাধু সেজে বসে আছে 

সত্তরের আগুন কবে নিভে গেছে 

সমস্ত মিছিলকে মিছি মিছি ভেবে 

অক্ষরে দাবানল লাগাতে গিয়ে 

মৃত গাছদের অভিশাপ কুড়াই 

মাথার ভিতর পাগল ভুবন ফকির 

গান শোনাতে শোনাতে ঘুম পাড়ায়



(৫)


উপসংহার এখন অনেক দূর 

পথের মাঝখানে আকাশগঙ্গা 

মেঘের নৌকা দোলাচলে 

ছায়া পড়েছে হাজার গাছের 


দেয়াল থেকে বেরিয়ে এলে 

পাখিদের অর্কেস্ট্রা 

জলতরঙ্গ 

তারপর মেলা জ্যোৎস্না 

কুড়িয়ে নিলে দেদার খুশি 



খোসা

 

[চিত্রঋণ - আন্তর্জাল]


- ডিম সেদ্ধ করতে খরচ কম। কিন্তু, সময়টা বেশি যাবে। 

- ধুর! এইভাবে হিসেব করে নাকি। ডিম ভাজবি একসাথে ক'টা? বড়ো জোর ডবল মামলেট। কিংবা ডিম পাউরুটি টোস্ট, সেও বেশি হলে একসাথে দু'টো ডিমের বেশি নয়। কিন্তু সেদ্ধ করলে, বড়ো ডেকচিতে একসাথে অনেকগুলো সেদ্ধ হয়ে যাবে। 


ডিম, ডেকচি, স্টোভ, কেরোসিন তেল, নুন, জলের ব্যবস্থা, বসার ব্যবস্থা... সব নিয়ে একটা হিসেব করে শুরু করার মতো পুঁজি কত হতে পারে বুঝে নিল প্রকাশ। সমান সমান হিসেবে তেল, পেঁয়াজ, পাউরুটি যোগ করলে খরচ অনেকটাই বেশি হয়ে যাচ্ছে। আপাতত সেদ্ধ ডিমেই খুশি হয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। লাভের মুখ দেখলে তখন ধাপে ধাপে অন্য ব্যবস্থা... এক এক করে। কিন্তু একটা জিনিস কেমন খচখচ করছে... প্রশ্নটা নিরাপদদাকে করাই হল না। এমন ভাবে হিসেব বোঝাল, যেন প্রচুর লাভ! তখন মনেও এলো না। এখন মনে হচ্ছে। 


--- --- --- 


অরুণার ওপর থেকে নেমে, চিৎ হয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার পর হঠাৎই বলে ফেলল প্রকাশ  "আচ্ছা, লোকজন সেদ্ধ ডিম খেতে বেশি ভালোবাসে? না মামলেট?" 

এইসময়ে এমন প্রশ্নর মানে বুঝতে পারল না অরুণা। বুকের ওপর আঁচলটা টেনে প্রকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল "কী?!" 

প্রকাশ আগের মতোই চিৎ হয়ে শুয়ে বুকের কাছে রাখা ডান হাতটায় কর গুনতে গুনতে বলল "বুঝতে পারছি না। লোকে বিকেলে বা সকালে ডিম সেদ্ধ খায়। কিন্তু আমার থেকেই বা কেন খাবে? মামলেট, টোস্ট, এগুলো তো বেশি খায়... তাই না? আমার তো সেদ্ধ ডিমের থেকে এইগুলোই বেশি ভালো লাগে!"  

অরুণা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল, অন্ধকারেও ওর চোখের বিরক্তিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। এক ঝটকায় প্রকাশের বাঁ হাতটা সরিয়ে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে বলল "সময়-অসময় বলে কিছু নেই... রাতে শোয়ার পরেও.. ছিঃ... স্বার্থঃপর একটা!" 

প্রকাশ কী বলবে বুঝতে পারলো না। কিছু বলার চেষ্টাও করল না। মশারীর বাইরে হাত বাড়িয়ে জলের বোতল থেকে দু'ঢোক জল খেল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার শুয়ে পড়ল চিৎ হয়ে। বিড়বিড় করে শুধু বলল "খুব ভুল হয়ে গেল... কাল আবার নিরাপদদাকে ধরতে হবে বাজারে গিয়ে।" 

অরুণা নিজের পা দু'টোও টেনে সরিয়ে নিলো, যাতে কোনও ভাবেই প্রকাশের ছোঁয়া না লাগে। 


--- --- ---  


"কেউ সেদ্ধ খায়, কেউ ভাজা... আবার সেদ্ধ আর ভাজাও আলাদা রকমের হয়। কীসব নাম আছে। দেখেছি। সবার ব্যবস্থা হ'লে লোক বেশি জুটবে।" 

সকাল থেকে এই প্রথম কথা বলল অরুণা। এতক্ষণ শুধু ঠুকঠাক জিনিসপত্র রাখা আর বাসনের শব্দ হচ্ছিল। কথাগুলো খুব একটা অন্যায্য বলেনি, কিন্তু প্রকাশের টাকার হিসেব করতে গেলেই টানাটানি পড়ে যাচ্ছে। অরুণার কথাগুলো শুনে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল "আমিও তো এই ভেবেই আর এগোতে পারছি না। শুধু সেদ্ধ থেকে কি আর লাভ আসবে?" 

রান্নাঘর থেকে উঠে এসে অরুণা জিজ্ঞেস করল - সেদ্ধ ডিমে খরচ কম?

- সেরকমই তো বলল নিরাপদদা। 

- কী বলল?

- ওই ডিমের দাম, ডেকচি, স্টোভ, কেরোসিন... সব মিলে। 

- দিনে ক'টা করে ডিম বেচবে?

- ক'টা বিক্রী হবে তা কি আর জানি? ওই দু' ডজন দিয়ে শুরু করব। তারপর তার থেকে যেমন বিক্রী হয়। 

- নিরাপদদা'র নিজের দোকানটা যেন কিসের?

- ও চায়ের দোকান...

- শুধু চা?

-  না না... চা বিস্কুট, সিগারেট, পাউরুটি টোস্ট, পান মশলা...

- আচ্ছা-আ-আ-আ... এবার বোঝা গেল। 

- অ্যাঁ?

- না... তুমি দু'ডজনের বদলে যদি দেড় ডজন নিয়ে যাও প্রথম দিন। আর ঘরের থেকেই ছোট কড়াটা, এক শিশি সরষের তেল, দুটো পেঁয়াজ আর ক'টা লঙ্কা... তাহ'লেও কি খুব বেশি খরচ হবে?

- না তো।

- তাহ'লে প্রথম দু-তিনদিন অল্প করে দেখো না। তারপর সেই মতো না হয়...


বিকেল হওয়ার আগেই বাজারের দিকে সাইকেল নিয়ে চলে গেলো প্রকাশ। নিরাপদদা ব্যস্ত হওয়ার আগেই একবার ধরতে হবে। অরুণার কথা মতো সব কাগজে লিখে নিয়েছে। এদিক-ওদিক মেরে কেটে সেদ্ধ, মামলেট দুটো দিয়েই শুরু কর যায়। খুব একটা হেরফের হচ্ছে না। 


--- --- --- 


"আসল কথাটাই নিরাপদদা সেদিন বলেনি... এইসব করতে ডেলি যা খরচ তা তো আছেই... এ ছাড়া ওই জায়গাটা পাওয়ার জন্য পার্টিকে কিছু অ্যাডভান্সও দিতে হবে... তারপর মাসে মাসে..."

সাইকেলটা এক কোণে দাঁড় করিয়ে রাখতে রাখতেই কথাগুলো জানিয়ে দিল প্রকাশ। হাঁফাচ্ছিল, তাই সময় লাগল পুরোটে বলতে। অরুণা এই প্রসঙ্গে কোনও উত্তর দিলো না। নুন-চিনি মেশানো এক গ্লাস জল প্রকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে শুধু বলল "বসো... চা খাও। শুনছি ... বাসনগুলো মেজে নিই।" 

ঢকঢক করে সবটা জল খেয়ে জামার বোতামগুলো খুলে ফেলল ফেলল প্রকাশ। তারপর সেই জামা দিয়েই গায়ের ঘাম মুছে সেটা দিয়ে হাতপাখার মতো নিজেকে হাওয়া করতে শুরু করল। অরুণার কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেলেও নিজের মনেই এক এক করে বলে যেতে লাগল, চায়ের দোকানের নিরাপদর সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে। যদিও তার থেকে কোনও নতুন অথবা বাড়তি তথ্য এলো না। তবে নিরুপায় মানুষের এতেই সান্ত্বনা, এক কথা বাড় বাড় বললেও মনে হয় কিছু কাজ এগোচ্ছে। কথা চলছে। 


অরুণা জানে, প্রকাশ অল্পেতেই ঘাবড়ে যায়, দুশ্চিন্তা করে... বেশি চাপ পড়লে দিকভ্রান্ত হয়ে যায়। ইংরিজীতে যাকে বলে 'নার্ভাস'। শব্দটা জানা না থাকলেও, ধাতটা অরুণার চেনা। তাই ইচ্ছে করেই প্রকাশের এতগুলো কথার কোনও উত্তর দিল না। ঘরের সব কাজ সেরে দরজার কাছে এসে শান্ত ভাবে বলল "বাইরে মশা কামড়াবে, ভর-সন্ধ্যেবেলা চৌকাঠে বসলে দেনা হয়।"; তারপর ঘরের ভেতর ঢুকে গেল বিছানার চাদর ঝাড়তে। 


--- --- --- 


- নিরাপদদাও টাকা দেয়?

- পার্টিকে?

- হুম?

- বলল তো সবাই দেয়। দোকান থাকলে নাকি দিতেই হয়...

- তোমাকে ক'ত দিতে বলেছে?

- পঞ্চাশ হাজার কম করে। 

- তারপর?

- তারপর কী? মাসে মাসে?

- হুম?

- সে সব অতটা বলতে পারল না নিরাপদদা। বলল ওদের সঙ্গে কথা বলে সব আগে সেট করে নিতে হয়। না হ'লে পরে ঝামেলা হবে। 

- কার সঙ্গে কথা বলবে? তুমি তো চেনোই না কাউকে!

- নিরাপদদা চেনে। বলেছে কথা বলিয়ে দেবে। 

- বাবা, নিরাপদদার যে তোমার থেকেও বেশি গরজ!


প্রকাশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে অরুণার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভাতে খানিকটা ডালের জল ঢেলে খেতে শুরু করল। নিরাপদ'র বাড়তি আগ্রহটা প্রকাশও বোঝে। এসব সহজেই বোঝা যায়।


- হাজার পঞ্চাশ মানে তো অনেক টাকা, তোমার কাছে হবে?

- দেখি। 

- কোথা থেকে দেখবে! ব্যাংকে তো ঐ ক'টা টাকা। ছেলে-পুলে এখনও কিছু নেই। কিন্তু ঘটির জল তো ওইটুকুই আছে। যদি ভালো-মন্দ কিছু...

- তাহ'লে আর কী করতে পারি বলো?!  

- হাতেরটা, গলারটা বেচে দাও... তাও আর বলতে পারছি না। আর টাকাগুলো নিয়েও যে সব মিটে যাবে... ওদের কথার দাম আছে? জানো না তুমি? মনে নেই?

- বাজারের দিকে নাকি এমনই রেট। অন্য দিকে কম। কিন্তু সেখানে কি  খদ্দের পাব?


"শুরু করার আগেই পঞ্চাশ হাজার। তারপর প্রতি মাসে নিয়ম করে... সময় মতো। লাভের হিসেব যা করেছিল, তা আর থাকবে কী করে? ব্যবসা শুরু করার আগেই লসের খাতায় চলে যাবে। ওদের আর কি! ভালোই কাটছে হারামখোরগুলোর এই করে! নাহ্‌... বাজারের দিকে বসা যাবে না। শ্মশানে যাওয়ার পথে নিমতলার মোড়, কিংবা স্টেশনের দিকে কলোনির রাস্তাটার কেমন রেট জিজ্ঞেস করতে হবে। যদি কিছু কমসম হয়..."

রাতের দিকে ভ্যাপসা গরম, তাই না ঘুমিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে এইসব সাত-পাঁচ চিন্তা করে যাচ্ছে প্রকাশ। দু'জনেই দু'জনের দিকে পিঠ করে শুয়ে। অরুণারও ঘুম আসছে না। হাতের ওপর মাথাটা রেখে ঘুমনোর চেষ্টা করছে চোখ বন্ধ করে। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে সরু শাঁখাটা। ভাগ্যিস... এখনও ওদের কোনও ছেলে-মেয়ে হয়নি। 


--- --- --- 


কাজ শুরু করতে গিয়ে খাতায় কলমে বসে দেখা গেল যা হিসেব করেছিল তার থেকে অনেকটাই বেশি খরচ। গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চাশ হাজার টাকার অগ্রীম আর মাসিক হিস্‌সার বাইরেও একটা ব্যাপার আছে-- 

মাঝে মাঝে স্থানীয় থানা থেকে কেউ কেউ আসতে পারে। এটা বলে দেওয়া হয় না। ধরে নিতে হয়। পার্টির সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো থাকলে, চাপ কম থাকে। 

কিন্তু এইসব যেমন গোড়ায় বলতে ভুলে গেছিল নিরাপদ, সেরকম এটাও বলতে ভুলে গেছিল যে একটা গুমটির দরকার হয়। দুটো সাইকেলের চাকা লাগানো গুমটি। যেটা নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে এখানে সেখানে যাওয়া যায়, সেখানেই সরঞ্জাম রেখে ব্যবসা। সাময়িক এবং গমনশীল।  তারপর-- 


ডিমের খোসা (সম্ভাব্য উপসংহার ১) -


সব দিক ভেবে প্রকাশের শেষমেশ বাজারের আশা ত্যাগ করে শ্মশানের দিকের নিমতলা মোড়েই যেতে হ'ল। তাও মোড়ের মাথা নয়, সেখান থেকে একটু দূরে। অগ্রীমটা অনেক কমে গেল, কারণ শ্মশানে আসতে যেতে কেউ ডিম সেদ্ধ খায় না। হিসসা তখনই চাইবে, যদি কাস্টমার বেশি হয়। চাকা লাগানো গুমটিটা একজনের থেকে বাধ্য হয়ে কিনতে হ'ল। পার্টির চাপে। 

ডিম এমনিতেই অযাত্রা। তায় আবার সেদ্ধ। অরুণা বলল এক ডজনের বেশি রেখে লাভ নেই। চায়ের কেটলি আর প্লাস্টিকের কাপে একটু খরচ করল। আর কাজ চালানোর মতো সিগারেট, বিস্কুট। সকালের দিকে প্রকাশ বসে, দুপুরের দিকে অরুণা, আবার সন্ধের পর প্রকাশ। একটু বেশি রাত অবধি থাকে, শ্মশান থেকে রাতে যারা ফেরে, মাঝে পাঁচ-ছজন দাঁড়িয়ে যায়। অরুণা রাতে থাকতে দিতে চায় না। নাহ'লে দিনে না বসে সারা রাত দোকান দিলেই ভালো হ'ত। দুপুর থেকে ভোর অবধি। 


যদিও একমাস হয়নি, তবে লাভ সামান্যই। আর এর থেকে বিশেষ বাড়ারও কথা নয়। মাঝে মাঝে এক আধ দিন একশ টাকাও লাভ হয় না। মাস গেলে কতই বা জমবে হাতে? এর ভরসায় বেশিদিন চলবে না। অন্য কিছু ভাবতে হবে। দু-তিন রকম ব্যবস্থা করতে হবে সংসার টানতে গেলে। অথচ পার্টির ছেলেগুলোকে বোঝানো মুশকিল। মাসের শেষ সপ্তাহ হ'তেই ওরা আসা যাওয়া শুরু করেছে। সত্যি হিসেব দেখালেও কি অমনি অমনি ছেড়ে দেবে? 



পেঁয়াজের খোসা (সম্ভাব্য উপসংহার ২) - 


পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইলেই ওভাবে দিয়ে দেওয়া যায় না। তার ওপর মাসে মাসে, তার ওপর আবার থানা। নিরাপদদা এই ব্যাপারে সরাসরি কিছুই করতে পারল না, শুধু গোবিন্দ হাঁসদা বলে একটা লোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। তাকে পাঁচশ টাকা দিতে, সে নিয়ে গেল পার্টির ছেলেদের কাছে। পার্টি অফিস না, ক্লাব ঘর। ক্যারাম খেলতে খেলতে কথা বলল দু'টো ছেলে। নতুন কথা, পুরনো কথা... অনেক কিছু শোনার পরেও চুপচাপ রইল। পাত্তা দিল না খুব একটা। সত্যি তো... প্রকাশ ওখানে দোকান দিক বা না দিক,লাভ থাকুক না থাকুক... ওদের কী? বাজার একটা প্রাইম লোকেশন। প্রকাশ না বসলে ওই জায়গায় অন্য কেউ বসবে। এরা কেন লস খাবে? তবুও প্রকাশ কিছুক্ষণ হাতকচলে গেল। এক মিনিট করে চুপ করছিল, তারপর আবার নতুন করে বলছিল। জমিদার বা নায়েব-গোমস্তাদের কাছে যেমন চাষা-ভুষোরা হাত কচলে খাজনা মকুব করতে বলত।  শেষে একটা ছেলে বিরক্ত হয়েই বলল - "ঠিক আছে, আগে দশ হাজার দে... বাকিটা মাসে মাসে বুঝে নেওয়া যাবে।" 

এই বুঝে নেওয়ার ব্যাপারটা প্রকাশ বুঝতে পারল না। গোবিন্দ হাঁসদা তাকে বুঝিয়ে দিল-- পাঁচ কমে এক হয়ে গেছে। বিশাল ব্যাপার। মাসে মাসে একটু বেশি দিয়ে বাকিটা পুষিয়ে দিতে হবে... ধারের সুদ দেওয়ার মতো। 


বাজারে ব্যবসা করতে গেলে এতে রাজী না হয়ে উপায় নেই। ব্যাঙ্ক থেকে ঐ  দশ হাজার তুলে দিয়ে দিল প্রকাশ। কিন্তু এসবের কি আর সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে? জনদরদী দলের দুঃখী-দরদী ছেলেরা কথা দিয়েছে। এই অনেক। তবে গোবিন্দ লোকটা চালাক, এইসব রফার কথা পাঁচ কান করতে বারণ করল। অরুণা বলল - "নিরাপদকেও বলো না। দরকার নেই!"

আপাতত অরুণার কথা মতো সেদ্ধ আর ভাজা দু'টোই রেখেছে। তার সঙ্গে পাউরুটিও পাঁচ-ছটা। কেউ টোস্ট চাইলেও দেয়। বাজারে এমন দোকান আরও আছে। একচেটিয়া ব্যবসার ব্যাপার নেই। আর নিরাপদদাকে চটানো যাবে না... তাই এর বেশি কিছু করার কথাও ভাবা যাচ্ছে না আপাতত। গোবিন্দ বলেছে, দু-তিন মাস আগে টিকে থাকো... টিকে থাকাই আসল। রয়ে সয়ে খেলে সব হয়। আঁকুপাকু করলেই গলায় আটকে যাবে। 

এদিকে, মাসের শেষ হয়ে এলো... এই নামমাত্র লাভের রাখবে কী আর পার্টির ছেলেগুলোকেই বা দেবে কী?! এই ভাবতে ভাবতে প্রকাশ বিছানায় ঘেমে ওঠে রাতে। অরুণারও মাঝে মাঝে রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। গোবিন্দ বলে লোকটার পান খাওয়া দাঁতের হাসিটা স্বপ্নে তাড়া করে। লোকটা আজকাল নিয়ম করেই সন্ধ্যেবেলা বন্ধুদের নিয়ে এসে ডিম সেদ্ধ, কিংবা টোস্ট খেয়ে যায়। সন্ধ্যেবেলাই আসে, কারণ ওইসময়টা অরুণা দোকান সামলায়। 



 মানুষের খোসা (সম্ভাব্য উপসংহার ৩)  - 


প্রকাশ সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারে না। অনেক কিছু বুঝতে পেরেও চুপ থাকে। মাঝে মাঝে মাথা গরম হয়, মাঝে মাঝে ঘাড়ের কাছটা টনটন করে... মাথা ঝিমঝিম করে। চেঁচিয়ে বা অশান্তি করে কিছু কাজের কাজ হয় না, এটা শেষ ছ'-সাত মাসে হাতে কলমে বুঝে গেছে। অরুণাও বুঝিয়েছে অনেক করে। নিরাপদ লোকটা নিজে পাক্কা ব্যবসাদার। এটা-সেটা বুঝিয়ে নিজেই কিছু টাকা হাতিয়ে নেবে। ওর চেনা লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে, ওর চেনা লোকের থেকে মাল সাপ্লাই নিতে হবে, ওর ঠিক করে দেওয়া জায়গায় দোকান দিতে হবে... সবই ও বলে দেবে। চালাকি! 

নিরাপদ আর ওর দেঁতো হাসি হাসা চেনা লোকগুলোকে কাটিয়ে নিজেই পার্টি অফিসে চলে গেছিল প্রকাশ। অফিস থেকে ক্লাব, ক্লাব থেকে আর এক পাড়ার অফিস, সেখান থেকে আর এক ক্লাব। মোটামুটি সব জায়গা ঘুড়ে স্পষ্ট বুঝে গেল... হাজার নাক রগড়েও টাকা না খসিয়ে এক পা এগনো যাবে না।  শেষে গায়ে পড়েই একটা ফালতু রফা করল। সামনের ইলেকশন, ওদের লোক দরকার। প্রকাশও যাবে অন্য গ্রামে ডিউটি দিতে। দলের যা যা দরকার লাগে। ছোট-বড়ো কাজ, যতটা পারবে। প্রকাশ কী জানে আর কী পারবে... তা নিয়ে পার্টির ছেলেদের তেমন মাথা ব্যথা নেই, কারণ ওকে দরকারও নেই। কেমন যেন কাকুতি-মিনতিতেই রাজী হয়ে গেল শেষমেশ। পার্টির হয়ে বেগার খাটার জন্য এক পয়সাও পাবে না। রাতও জাগতে হ'তে পারে। অন্য গ্রামে গিয়ে পড়েও থাকতে হ'তে পারে যতদিন বলা হবে। বদলে ওই পঞ্চাশ হাজারটা কমে যাবে। আর পার্টির কাজ পাকাপাকি ভাবে করে গেলে হয়ত মাসে মাসেও কমই দিতে হবে। তবে এইসব কিছু মুখের কথা... মুখের কথা মেনেই কাজ করতে হয়। 

প্রকাশের আর দোকান দেওয়া হল না। তবে দোকানটা হয়েছে বাজারেই, নিরাপদর দোকানের থেকে একটু দূরে... প্রকাশের বউ অরুণাই সামলায়। প্রকাশকে চলে যেতে হয়েছে পাশের গ্রামে, পঞ্চায়েৎ ভোট শেষ হ'লে তবে ফিরবে। ততদিন অরুণা একাই...


পার্টির ব্যাপার-স্যাপার অরুণারও কানে আসে। প্রকাশদের সঙ্গেই কাজ করত সজল। পার্টির ছেলে। আলাদা সুবিধে ছিল। বাইক অ্যাক্সিডেণ্টে মরে যেতেই সব ফক্কা। পার্টি থেকে বলেছিল বউকে একটা চাকরি পাইয়ে দেবে। মিথ্যে বলে লাভ নেই... পাইয়েও দিয়েছে। মাস মাইনে ভালো, মেয়েটার স্কুলের মাইনেও কুলিয়ে যায়। কিন্তু সজলদার বউ কাবেরীকে এক নেতার বাড়ি রান্নাটা করে দিতে হয়। সন্ধ্যের দিকে যায়, রান্নাটা করে দিয়ে আসে। সেই নেতার বউয়ের নাকি হাঁটুর ব্যামো। নড়াচড়া বেশি করতে পারে না। অরুণা জানে, ওই রান্নার কাজটাই আসল... ওই দিয়েই সংসারটা চলছে। 

খোঁজখবর রাখলে অরুণাও একটা রান্নার কাজ, কিংবা কাপড়-কাচা বা বাচ্চা-সামলানো, নাহ'লে অথর্ব বাবা-মাকে দেখা... কিছু একটা জুটিয়েই নেবে। 

নিজেই যদি সময় থাকতে থাকতে একটা ব্যবস্থা করতে পারে... সংসারের অবস্থা থাকলে... সম্মানেরও ব্যবস্থা হয়ে যায়। 


--- --- ---  


কোন অবস্থায় কতটা ভালো থাকা, তা আমি বা আপনি বলে দেওয়ার কেউ নই। আর বিচার করার তো প্রশ্নই ওঠে না। 

কী জানেন... আমাদের, কিংবা প্রকাশ আর অরুণাকে কষ্ট করে ডিম সেদ্ধর কারবার নিয়ে এত কিছু ভাবতেই হ'ত না; যদি প্রকাশের কারখানাটা হঠাৎ বন্ধ না হ'ত। 

কী ভাবছেন? আসল অ্যান্টিক্লাইম্যাক্সটা ঠিক কোথায়? এই কারখানা লকআউটের গা সওয়া পরিচিত খবর? তিনটে উপসংহারের মাঝে ঘেঁটে যাওয়া গল্প? নাকি... এই চরিত্রের নাম দু'টো... প্রকাশ আর অরুণা?! 


[শ্রাবণ, ১৪২৫] 


অচল পয়সা

 


'Green Shutters' by Fred Salmon । (চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল (www.richard-neuman-artist.com)



গে কোনও পয়সা বাজারে অচল হয়ে এলেই জমিয়ে রাখতাম। এক পয়সা, দু পয়সা, পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, কুড়ি পয়সা, চার আনা… সব এক এক করে অচল হয়ে গেল। একটা করে রেখে দিলাম। তারপর, হঠাৎ একদিন দেখি পয়সাগুলো কেমন ঘষে ঘষে গেছে। মর্চে পড়েনি, অথচ কেমন ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে, ওপরের লেখাগুলো আর পড়া যায় না ভালো করে। এদিকে ততদিনে পঞ্চাশ পয়সার বড়ো সাইজটা অচল হওয়ার মুখে। তখন ঠিক করলাম একটা ভালো পলিথিন প্যাকেটে মুড়ে, তারপর একটা টিনের বাক্সে ঢুকিয়ে রাখব। তারপর ওই নতুন পঞ্চাশ পয়সা থেকে বড়ো মাপের এক টাকার কয়েনগুলো… সব তাই করলাম। কতরকম এক টাকার কয়েন যে জমিয়েছিলাম। সব বর্ষপূর্তি, মনীষীদের ছবি, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর… আরও কত। দু’টাকাও ছিল পুরনো। ধর… বাষট্টি সাল থেকে দু’হাজার অবধি… ক’ত বছর হচ্ছে? অ্যাঁ?… স-অ-ব। 

–সেগুলো সব আছে? 

–ওই রেখে দিয়েছিলাম তো, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভালো করে মুড়ে। তারপর একটা টিনের কৌটোর ভেতর। ভালোই থাকত। বাইরের বাতাস লাগত না। ড্যাম্প লাগত না। পোকায়… না, পোকায় তো পয়সা খায় না। বল?

–লোকজনের বিদেশের কারেন্সি অথবা ডাকটিকিট জমানো হবি থাকে দেখেছি। তুমি এইসব পুরনো… মানে অচল পয়সা কালেক্ট করো? 

–নাহ্‌… এখন আর করি না। 

–তাহলে তখন কি ঘাড়ে ভূত চেপেছিল?!

–হ্যাঁ। ভূতই হবে। আসলে, একবার একজন বলেছিল অচল পয়সারও দাম আছে। একটা সময় আসে যখন সেই পয়সা লোকে অনেক দাম দিয়ে কেনে! এই যেমন ব্রিটিশ আমলের পয়সাগুলো, ইয়ুরোপের সব দেশের প্রাচীন মুদ্রা... অচলই তো… কিন্তু নাকি বেশ ভালো দাম ছিল বাজারে। এখনও আছে। 

–আর তুমি তাই শুনে পয়সা জমাতে শুরু করলে? একশো বছর পর তোমার থেকে কেউ কিনতে আসবে বলে? কী ক্ষ্যাপা মাল ভাই! 

–না না… আমি কি আর একশো বছর পর থাকব? আমি আর কাকে বেচতাম, আর কে-ই বা কিনত!!

–তাহ’লে?

–আসলে, একবার মনে হ’ল— কেউ কেউ যেমন গুপ্তধন রেখে যায়, তেমন আমিও এমন পুরনো খুচরো পয়সা সিন্দুক ভর্তি করে রেখে দেব! একদম লুকিয়ে রাখব কোথাও। কেউ টের পাবে না! তারপর একটা ধাঁধা বানিয়ে রেখে দেব। সেই সিন্দুক খুঁজে বার করার সন্ধান। ব্যস্‌… আমি মরার একশো বছর পরেও লোকে ওই সিন্দুক খোঁজার চেষ্টা করবে। ধাঁধা উদ্ধার করে তার সন্ধান জানার চেষ্টা করবে। আমি কিছু করি আর না করি… আমার নামে একটা সিন্দুক ভর্তি গুপ্তধন। আর ওই সিন্দুকের জন্যেই আমার নাম মনে রাখবে! ভাব!

– ...

–কী হ’ল? তাকিয়ে দেখছিস কী? আইডিয়াটা হেব্বি না? টর্চে বা পয়সার আলোয় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে একশো বছর পুরনো আট আনা, চার আনা, ইন্দিরা গান্ধীর ছবি, নেতাজীর ছবি! ভেবে দেখ!

–তোমার তো সিরিয়াস মাথা খারাপ! এসব করে কী লাভ?

–তাহ’লে একটা গল্প বলি শোন। আমাদের পাড়ায় একটা বুড়ি ছিল। সবাই বলত খাঁদি মাসি। লোকের বাড়ি কাজ করে খেত। তারপর থুত্থুরি বুড়ি হয়ে আর কাজ করতে পারত না। তিনকুলে কেউ ছিল না। এত বছর ধরে চেনা-জানা। পাড়ার লোকজনই টাকা-পয়সা দিয়ে আসত মাঝে মাঝে। ওতেই দিন চলত।  আর বুড়ির পাশাপাশি আর একটি পরিবার থাকত, তারা দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিত। তারপর একদিন শুনলাম খাঁদি মাসি মরে গেছে। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি বডি পড়ে। পাড়ার কাকুদের সঙ্গে আমার ছোটকাকাও দাঁড়িয়ে বুড়ির বডির পাশে। ম্যাটাডোর এলে শ্মশানে নিয়ে যাবে। অবাক লাগল, বুড়ির ওপর কেবল চার-পাঁচটা মালা। সাদা চাদরটা কেমন খাঁখাঁ করছে। পাড়ায় অন্য কেউ মরলে দেখতাম অনেক মালা, ধূপ, তারপর ফুল দিয়ে মোটা-গোড়ের রিং-এর মতো, কপালে চন্দন। বেশ পরিপাটি সাজানো গোছানো ব্যাপার আর কি! কিন্তু এখানে স্রেফ পাঁচটা লিকলিকে রজনীগন্ধার মালা। চেনের মতো আড়াআড়ি রাখা। চোখে তুলসীপাতা। আর কপালের মাঝামাঝি একটা চন্দনের ফোঁটা। এই অবধি দেখেই বাড়ি চলে এলাম। 

–তারপর?



***



তারপর কী হ’ল। সেই গল্পটা শেষ না করেই রতনকাকা উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে, লুঙ্গিটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল— “মালা কম থাক, আর বেশি থাক… কিছু যায় আসে না বুঝলি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম এর সঙ্গে ওই গুপ্তধন, পয়সা জমানোর কী সম্পর্ক? কিছুই বলল না। পাঞ্জাবির ভেতর হাত ঢুকিয়ে পিঠ চুলকোতে চুলকোতে চলে গেল। পেছন দিকে না তাকিয়েই বলে গেল— ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে রে… সন্ধ্যাহ্নিক সেরে আবার বেরুতে হবে!’ 
মোটামুটি সবাই জানে মাথায় হালকা ছিট। তাও মাঝে মাঝে খোঁচালে বেশ রগড় হ’ত। 

আজ হঠাৎ ঘটনাটা মনে পড়ে গেল এইসব আয়োজন দেখে। রতনকাকার ছেলেরা দেখলাম বেশ রজনীগন্ধা স্টিক, মালা, সব কিছুরই ব্যবস্থা করেছে। ছেলের বউরা চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়েও দিয়েছে শ্বশুরমশাইকে। দুই ছেলের বউই দেখলাম সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। একজনের মুখে আঁচল চাপা। আর একজন ভুরু কুঁচকে। ম্যাটাডোরটা ছাড়ার আগে ওতে উঠে পড়ে রতনকাকার ছোটছেলে কমলের পাশে উবু হয়ে বসলাম। তারপর আসতে আসতে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম— “সেই অচল পয়সার বাক্সটার কথা জানিস? কিছু বলে গেছেন?” কমল ভুরু কুঁচকে এমনভাবে তাকাল, যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি। আমি আর একবার জিজ্ঞেস করতে বেশ গলায় চড়িয়ে বলল “কীসের বাক্স?” আমি বডির দিকে তাকিয়ে মালা ঠিক করতে করতে বললাম “নাহ্‌, কিছু না।” 

ওই বুড়ির গল্পটা, ফুলের মালা, এসবের মধ্যেই কি কোনও ক্লু ছিল? এখন কী করব বুঝতে পারছি না… শ্মশানে গিয়েই বা কী করব? 



[ডিসেম্বার, ২০১৮ । প্রকাশিত - চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবপত্রিকা]


রান্নাঘর সিরিজ




চিত্রঋণ - আন্তর্জাল





রান্নাঘর ১ 

নিজেকেই টিপে দেখো
চেখে দেখো
রন্ধন হচ্ছ ঠিক মতো? 
ভাজার সাথে সাথে 
রঙ পালটাচ্ছে কি?
যতটা কষ্ট-- এই ভেজাল শরীরে
কড়াইয়ের তেলে কোনও ভেজাল নেই... আগুনেও না।


রান্নাঘর ২

হেঁসেলের ন্যাতা
এক কোণে পড়ে থাকে
ভিজে 
সারাটা দুপুর 
তোমারই মতো
পুরনো হলে
পাড় কিংবা আঁচল
ছিঁড়ে নাও, ফরফর করে 
ঠিক কোনও কাজে লেগে যায়।
ওই ন্যাতাটাও কত ছবিতে হেসে উঠেছে... 
মনে পড়ে?



রান্নাঘর ৩

পোড়া গন্ধ
নতুন করে চিনেছ, 
পৃথক পোড়া-গন্ধে ভিন্ন মন খারাপ 
ঝলসে যাওয়া
আলাদা করে পায় ।
কখনও কোথাও আগুন নেভাতে 
মেঘলা আকাশ, দুধ উথলে ওঠে
পুড়িয়ে ওভেন 
দহন অস্ত যায়।
দাগ আড়ালেরও রপ্ত হয়েছে কিছু উপায়
সয়েই গেছে ছ্যাঁকা, 
শেষ প্রহরে ফেটে যাওয়া ফোসকাটা
বেলা বাড়লেই অরন্ধনে হারিয়ে যায় 
অথবা উড়ে যায় ড্যান্ডেলিয়ন বীজের মত।



রান্নাঘর ৪

আঁকড়ে ধরলে রিকশার ছাউনি
অন্য হাতে ক্লিপবোর্ড
প্রশ্নপত্র
সিলেবাসের বাইরের কোনো প্রশ্ন
অস্বস্তিই বাড়াতে পারে।
ছেলে চেষ্টা করেছে, হয়ত আবোলতাবোল,
তোমারই মতো। 
শাসন করে যাচ্ছ ক্রমাগত, 
ছাউনিটা পিছু ছাড়ছে না।
তার ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতেই
আঁকড়ে ধরলে উত্তপ্ত কড়াইয়ের হাতল!
সেলাইবাক্সের পাশেই মলম রাখা থাকে।
তাকেই তো দেখেছিলে রিকশা থেকে এতদিন পর?
এখন শাসন বুলিয়ে নাও, বালিকার মতো মাথা নিচু করে
দেরি হলে আবার ফোসকা পড়ে যাবে।



[আশ্বিন, ১৪২৪] 


দৈত্যকুলে তরণীসেন

 

চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল


'দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ' -- এই প্রবাদটির সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। রাক্ষস-রাজ হিরণ্যকশিপুর পুত্র সেই হরি-ভক্ত প্রহ্লাদ... যাকে চরম সংকটে রক্ষা করতে নরসিংহ অবতার রূপে ভগবান বিষ্ণু আবির্ভূত হন। বধ করে পাপ-জন্ম থেকে মুক্তি দেন হিরণ্যকশিপুকে। সেরকম রামায়ণেও দৈত্যকুলে এক রাম-ভক্ত ছিল... তরণীসেন। যদিও, তরণীসেনের চরিত্র বা পরিণতি প্রহ্লাদের মতো নয়। বরং উল্টোই। সত্যি বলতে... তরণীসেনকে নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা চারিত্রিক বিশ্লেষণের অবকাশও নেই। বিভীষণ এবং সরমার পুত্র তরণীসেন একেবারেই বাঙালীর নিজস্ব। কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কা কাণ্ডে যে তরণীসেন বধের অধ্যায়... তা বাল্মিকী রামায়ণে নেই। বাল্মিকী রামায়ণে তরণীসেন চরিত্রটিই নেই! 

পর পর দু'জন রাক্ষস সন্তানকে জন্ম দেওয়ার পর নিকষার তৃতীয় সন্তানটিও হয়ত রাক্ষস-মতি হবে বলেই প্রত্যাশা করেছিল দৈত্যকুলের সকলে। কিন্তু বিভীষণ পেয়ে গেল পিতা বিশ্রবার জেনেটিক ট্রেট... ধার্মিক মতি। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ যেমন ব্যতিক্রম, তেমনই ব্যতিক্রম বিভীষণ। বেদজ্ঞ এবং শাস্ত্রজ্ঞ দশাননও ছিল। গুণ এবন জ্ঞান তারও কম নয়। কিন্তু বিভীষণ রাক্ষস হয়েও ছিল নেকড়ের পালে ভেড়ার মত। তবে সে জ্ঞানী, বিচক্ষণ... চুপচাপ অনেক কিছুই দেখত, বুঝত... যেন অপেক্ষা করত উপযুক্ত মুহূর্তের। রাবণকে প্রতিহত করার চেষ্টা ব্যর্থ হতে সেই উপযুক্ত মুহূর্ত এলো... নিজের পথে চলার পরিকল্পনা নিল বিভীষণ। রাবণ যে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই অপমানও ভুলেছিল বলে মনে হয় না। তারপর কী কী করল, মোটামুটি সবাই জানি। 

     এই বিভীষণেরই পুত্র তরণীসেন। দৈত্যকুলেরই একজন, কিন্তু বাপ-ঠাকুর্দার মতো সাত্ত্বিক, ধার্মিক... এবং রাম-ভক্ত। অথচ তার কর্তব্য-নিষ্ঠা একেবারে অন্যরকম। বিভীষণ রাবণের শিবির ত্যাগ করে চলে গেল রামের দিকে। তরণীসেন গেল না। রাবণ যখন বিভীষণকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলছে, বিভীষণ রামকে লঙ্কার বিরুদ্ধে মন্ত্রণা দিচ্ছে... সেই কথা বলছে; তরণীসেন সেই প্রসঙ্গেও গেল না। বলল -- পিতার ব্যাপারে আলোচনা করা উচিৎ না। মা সরমাকে বলল -- আমি জানি শ্রীরাম বিষ্ণুর অবতার, যদি দাসের সন্তান বলে না মারেন, তাহলে ফিরব... না হলে বৈকুন্ঠলোকে স্থান হবে। তরণীসেন যুদ্ধ করল রামের বিরুদ্ধে, রাক্ষস সেনা নিয়ে এগিয়ে গেল... গঙ্গা-মাটি দিয়ে পতাকায় আর রথের সর্বাঙ্গে রাম-নাম লিখে!

  কৃত্তিবাসের সৃষ্টি এক অদ্ভুত ট্র্যাজিক নায়ক তরণীসেন। স্বল্প উপস্থিতি... অথচ স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তিন প্রহর যুদ্ধের পর রাক্ষস যোদ্ধা মকরাক্ষ বীরগতি প্রাপ্ত হল। ঠিক তখনই কৃত্তিবাস জন্ম দিলেন তরণীসেন চরিত্রের। লঙ্কাকাণ্ডের এক ছোট্ট অধ্যায় -- তরণীসেনের যুদ্ধ ও পতন। অবতার শ্রীরামচন্দ্রের হাতে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেই সে গেল সমরে।  রাম-লক্ষণ ও পিতা বিভীষণের দর্শন করবে... এই উদ্দেশ্য। যুদ্ধ প্রান্তরে প্রবেশ করেই খুঁজতে লাগল... তারা কোথায়। এক এক করে বানর যোদ্ধাদের পরাস্ত করে যখন রামকে দেখতে পেল, তখন প্রণাম করে স্তুতি করতে শুরু করল তাঁর। শ্রীরাম বিভীষণকে জিজ্ঞেস করলেন -- "শত্রুপক্ষে এ কে যে আমার স্তুতি করে?... আমাদের কেন প্রণাম করে?" বিভীষণ নিজের পুত্র-পরিচয় গোপন রেখে বলল, রাবণের জ্ঞাতি... ভাইয়ের ছেলে; ধার্মিক যোদ্ধাপতি। জানাল --

"প্রভু, না জান কারণ!

লঙ্কাপুরে ও তোমার ভক্ত এক জন।।

তোমার চরণ বিনা অন্য নাহি জানে ।

আসিয়াছে সংগ্রামেতে রাজার শাসনে।।"

ঠিক এইখানেই 'দৈত্যকুলে তরনীসেন'-এর চরিত্র খোদাই করে দিয়েছেন কৃত্তিবাস। পাঠকের কল্পনায় ফুটে উঠবে বিভীষণের অতীত, এবং তার পুত্র হিসেবে তরণীসেনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। 

তখনই হয়ত পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যেত। আসন্ন অঘটন এড়ানো যেত। কিন্তু তা ঘটল না। তরণীও আক্রমণ করল, রামচন্দ্রও সবাইকে থামিয়ে বিভীষণকে চেপে ধরে বললেন না "ব্যাপারটা খোলসা করে বল তো?" কিন্তু এ তো কৃত্তিবাসের নিজস্ব সৃষ্টি! উনি তরণীকে বিভীষণের পাশে দাঁড় করালেন না। তরণীসেন একই সঙ্গে ধার্মিক এবং কর্তব্যনিষ্ঠ। সে লড়ে গেল শ্রীরামের সেনার বিপক্ষে। এক এক করে সকলে এল, কেউ তাকে পরাস্ত করতে পারল না। রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাঝেই তাঁর মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন করল তরণীসেন! শ্রীরামচন্দ্রের বন্দনা করতে বসল অস্ত্র ত্যাগ করে। সেই বন্দনাও কৃত্তিবাসের এক সচেতন প্রয়াস, যা শুনে রাম চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলছেন "লঙ্কায় এমন ভক্ত আছে? এই লঙ্কা আক্রমণ করে কী হবে? কীভাবে বধ করব এমন ভক্তদের?" একটি কনট্রাস্টের কী চমৎকার দৃশ্যায়ন। মহাভারতে অর্জুন এই দ্বিধাতেই অস্ত্র তুলতে পারছেন না, শ্রীকৃষ্ণ গীতা উপদেশ দিচ্ছেন। বিশ্বরূপ দর্শন করাচ্ছেন অর্জুনকে। আর এখানে তরণীসেন বিশ্বরূপ দর্শন করছে, তার বন্দনা শুনে অবতার স্বয়ং বলছেন "কী করব যুদ্ধ করে? কাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলছি?" 

যুদ্ধ ত্যাগ করে বনে ফিরে যেতে চাইছেন শ্রীরাম, এই অঘটন দেখে তরণীসেন আবার তাদের উসকে দিল সীতার উদ্দেশ্যে কটু কথা বলে।  আবার যুদ্ধ শুরু হল। লক্ষ্মণ পিছু হটল, রামও নাজেহাল হলেন। রণক্লান্ত তরণীসেনও ভাবছেন "আর কতক্ষণ?"! 

অবশেষে আবার সেই বিভীষণ নিজের কাজটা করে দিল, জানিয়ে দিল রামকে - 

"শুনো প্রভু রঘুনাথ! করি নিবেদন।

ব্রহ্ম অস্ত্রে হইবেক উহার মরণ।।

অন্য অস্ত্রে না মরিবে এই নিশাচর।

সদয় হইয়া ব্রহ্মা দিয়াছেন বর।।"

শ্রীরাম ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেখে তরণীসেন বুঝল, তার যুদ্ধে আসার উদ্দেশ্য পরিণতি পেতে চলেছে, রাক্ষস-দেহ থেকে মুক্তি আসন্ন। শেষ বারের মতো শ্রীরামকে প্রণাম জানাল --

"তোমার চরণ হেরে পরিহরি প্রাণ।

পরলোকে প্রভু! শ্রীচরণে দিও স্থান।।

এতেক ভাবিতে বাণ অঙ্গে এসে পড়ে।

তরণীর মুণ্ড কেটে ভূমিতলে পড়ে।।

দুইখণ্ড হ'য়ে বীর পড়ে ভূমিতলে।

তরণীর কাটামুণ্ড রাম রাম বলে।। "


এরপর অবশেষে বিভীষণ কী বলছে, কীভাবে রামের কাছে প্রকাশ করছে যে তরণীসেন ওরই ছেলে... সেইসব ঘটনা আসে। রাবনের শোক, সরমার বিলাপের প্রসঙ্গ আসে। কিন্তু তরণীসেনের এই পরিণতির পরে সবকিছুই ম্লান মনে হয়ে। কৃত্তিবাস এই স্বল্প পরিসরে তরণীসেনকে একজন ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে এমনভাবে উপস্থাপনা করেছেন যা সত্যিই মনে রাখার মতো একটা প্রয়াস। কিন্তু প্রশ্ন জাগে --

 তরণীসেনের চরিত্র কল্পনা কেন করলেন কৃত্তিবাস? ঠিক কোনদিকটা দেখানোর ইচ্ছে ছিল? দৈত্যকুলে তরিণীসেনের মতো লোকও আছে, এটা দেখানো? বিভীষণের যে নেতিবাচক দিক, তা তরণীসেনের মধ্যে ছিল না... তরণী কর্তব্য এবং ধর্মভারে আবেগতাড়িত হয়ে প্রাণত্যাগ করল, বিভীষণ হল লঙ্কাধিপতি... এইটা দেখানোর জন্য? যে কোনো কারণেই হোক, শুধুমাত্র রামের হাতে মরলে মুক্তি পেয়ে বৈকুন্ঠলোকে যাবে -- এই দেখানোর জন্য তরণীসেন চরিত্রটি এনেছেন বলে মনে হয় না। তরণীসেনের নিজস্বতা আছে, প্রভাব আছে। রাম ইচ্ছে করলেই তরনীসেনকে না মেরে বিকল্প কিছু ভাবতে পারতেন, তা যে হল না... এও কৃত্তিবাসের ইচ্ছেতেই। বেঁচে গেলে তরণীসেন সস্তা হয়ে যেত, বিভীষণের মতো 'টু-ফেস' হয়ে যেত।  মাইকেল মধুসূধন দত্ত অনেক পরে 'মেঘনাদ বদ' কাব্যে ইন্দ্রজিৎ এবং রাবণকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছিলেন... কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দীতে বসে কৃত্তিবাসের চিন্তায় 'তরণীসেন'-এর আগমন, এও এক রকম মনে রাখার মতো অবদান। নিজেই যেন একটা মিনি মহাকাব্য, অথবা মহাকাব্যের বীজ। পরবর্তী কোনো কবির প্রচেষ্টা হয়ত তরণীসেনকে নিয়েও বড়ো কাজ হতে পারত। হয়ে ওঠেনি। 


   আর এই যে বললাম, বাল্মিকী রামায়ণে 'তরণীসেন' চরিত্রটি নেই, এই প্রসঙ্গেই বলি --  বাল্মিকী রামায়ণে আছে বিভীষণের কন্যা ত্রিজটার কথা। ত্রিজটা নারী, সে যুদ্ধ করবে না। সে ছিল তার মা সরমার মতই অশোকবনে বন্দিনী সীতার ছায়া সঙ্গিনী। ত্রিজটা কখনো রাবনের গুপ্তচর, রাবণের মন্ত্রনার অংশ। আবার কখনো সে সীতার দুঃখের সঙ্গী, তার মনোবল বাড়াচ্ছে... সীতাকে বোঝাচ্ছে, সে যাতে অবসাদে দুর্দশায় প্রাণত্যাগ না করে । কৃত্তিবাসের চেড়ীরা অন্যরকম, তারা উৎপীড়ন করে সীতাকে। কটু কথা বলে। সেখানে ত্রিজটা বা তার মতো কেউ নেই। 

ত্রিজটার মন্দির আছে কাশীতে, সেখানে মেয়েরা ব্রত-উপবাসও করে ত্রিজটার আরাধনায়। এমনকি উজ্জয়িনীতেও আছে ত্রিজটাকে নিবেদিত মন্দির। এমনকি ভারতের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যত্র যেখানে রামায়ণ-গাথা মিশে আছে সংস্কৃতিতে, সেখানেও ত্রিজটার বিশেষ অস্তিত্ব আছে। অথচ ত্রিজটার সীতামাতা তাকে অযোধ্যায় নিয়ে গেলেন না, বললেন "সেখানে রাক্ষসীদের থাকা অসুবিধে... তুমি বরং বারানসী গিয়ে মোক্ষ লাভ করো।" 

আবার, তেলুগু মহাকাব্য 'সীতা পুরণামু' তে কবি ত্রিপুরানেনী রামস্বামী বিভীষণকে দ্রাবিড়িয় এবং সরমাকে আর্য্য রমনী হিসেবে পোর্ট্রে করেছিলেন। সরমা এমন এক আর্য্য রমনী যার পরামর্শে ক্রমে বিভীষণ দ্রাবিড়ের থেকে দূরে সরে যায়, নিজের হিতাহিত বুঝে রামের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সরমা চেয়েছিল আর্য্য রঘুপতির বিজয়, এবং রাক্ষসকুলের নাশ। আর্য্য সরমার কন্যা ত্রিজটাও মায়ের শিক্ষাতেই শিক্ষিত হয়েছিল। সরমা আর ত্রিজটার সেবা আর সহৃদয় ব্যবহার রাক্ষস-গৃহে বন্দিনী সীতার বড়ো সহায় হয়ে উঠেছিল। অবশেষে সরমা এবং ত্রিজটাকে সীতার সঙ্গেই অযোধ্যায় চলে যায়।   

ত্রিজটাকে নিয়েও কিছু আলোচনার অবকাশ থেকে, কিন্তু বাঙালীর নিজস্ব তরণীসেনের উদয় আর পরিণতি রীতিমতো এপিক-ড্রামার মত। তাই সেই নিয়ে বেশি বলা হয়ে গেল।


[বৈশাখ, ১৪২৭]


পৃথক গৌরাঙ্গ ভজনের গ্রাম– কেতুগ্রামের বিরাহিমপুর -- সম্পর্ক মণ্ডল

 



রাঢ়বাংলায় আমরা যদি একবারে উত্তর প্রান্তে হাজির তাহলে আমরা দেখবো একের পর এক বৈষ্ণবতীর্থ গ্রাম, যেখানকার ভূমি পবিত্র হয়ে বৈষ্ণবীয় ভাবরসে। বিরাহিমপুরও তেমন একটি গ্রাম, যেটা উত্তর রাঢ় তথা পূর্ব বর্ধমানের গঙ্গাটিকুরি আর ঝামটপুর-বহরানের মধ্যে অবস্থান করলেও তার কয়েক মিটার দূরেই অবস্থিত মুর্শিদাবাদের সীমানা। তবে মধ্যযুগ থেকে এর অবস্থান বিচার করলে এটি মনোহর শাহি পরগণার অন্তর্গত। সেই বৈষ্ণব ভাবে সিক্ত মনোহর শাহি পরগণা, যেখানে থেকে মনোহর শাহি কীর্তনের সূত্রপাত ঘটে। কাঁন্দরা, সোনারুন্দি, দক্ষিণখন্ড বা এই বিরাহিমপুর গ্রামাঞ্চলে আজও মনোহর শাহি কীর্তনীয়ারা কেউ কেউ বাস করেন। এখানে উল্লেখ্য যে বিখ্যাত কীর্তনীয়া যদুনন্দন দাস এই বিরাহিমপুরেরই বাসিন্দা ছিলেন, আজও তার বংশধরদের কেউ কেউ এই গ্রামে বাস করে। যায় হোক, মনোহর শাহি পরগণার পরিচয় বাদ দিলেও এর আর একটি পরিচয় হল এটি কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত একটি বৈষ্ণব গ্রাম, যেখানে সশিষ্য স্বয়ং নিত্যানন্দ মহাপ্রভু এসেছিলেন এবং তিনি বিনোদ দিঘির পারে বৃক্ষতলে বিশ্রাম করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন দীক্ষালাভের পর চৈতন্যদেব রাঢ়ভ্রমণে বেরিয়ে এখানে এসেছিলেন কিন্তু এই তথ্যের সপক্ষে কোনও যথাযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় নি। অজয়-গঙ্গার সংযোগস্থলে কেশব ভারতীর কাছে দীক্ষা নিয়ে চৈতন্যদেব রাঢ়ভ্রমণ করেছিলেন তা সত্য কিন্তু তার যাত্রাপথে বিরাহিমপুর ছিল না, কারণ তিনি অজয় তীর ধরে ভ্রমণ করে রসুই গ্রামে জ্ঞান হারিয়েছিলেন, পরে সুস্বাদু আহার্যে তার দেহে বল আসলে তিনি স্থানটির নাম 'রসবতী ' রেখেছিলেন, পরে তা রসুই গ্রাম নামে পরিচিত হয়, তারপরে তিনি কেতুগ্রাম হয়ে ঈশানী নদী ধরে নৌকাযোগে গঙ্গাটিকুরির পাশ দিয়ে গিয়ে উদ্ধারণপুরে ঘাটে পৌঁছেছিলেন এবং শান্তিপুর যাত্রা করেছিলেন উদ্ধারণপুর থেকে। তাই কোনওভাবেই তিনি বিরাহিমপুর যান নি, এটুকু নিশ্চিত। অনেকে বিরাহিমপুরকে বিরুমপুর বলেও ডাকেন, এর পিছনে একটি ছোট্টো ইতিহাস আছে। সেনরাজা লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসন অনুযায়ী, তার মা তাদের পুরোহিতকে পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন, যা বর্তমানে বালুটিয়া ( বাল্পছীটা ),  খাঁড়ুলিয়া ( সোমালিয়া) , মুরুন্দি ( মোড়লডিহি), জলসুতি ( জলশৌখি) এবং কিয়তরাল ( রাউন্দি) বলে পরিচিত, অর্থাৎ এই গ্রামগুলি সাথে একইসাথে বিরুমপুরের অস্তিত্ব লক্ষ্মণ সেনের আমলে ছিল না। পরে মুসলিম আক্রমণ শুরু হলে এই অংশটির অবস্থান অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে হওয়ায় এখানে একদল মুসলিম বসবাস শুরু করে এবং আজকের বিরাহিমপুরের তৎকালীন নাম ছিল 'ডাঙাপাড়া', কেউ কেউ বলেন ইব্রাহিম নাম সেনানী নাম থেকে বিরাহিমপুর শব্দটি এসেছে কিন্তু কাটোয়া মহকুমার মধ্যযুগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সম্পূর্ণ অন্য তথ্য, স্থানীয় গ্রাম দত্তবরুটিয়ার প্রভাবশালী কায়স্থ দত্ত খাঁ'রা ( বর্তমানে দত্ত) অসংখ্য লাঠিয়াল সহ এই স্থানে আক্রমণ করে মুসলিমদের এখান থেকে লাঠি ঠেঙিয়ে বিতাড়িত করলে ডাঙাপাড়া ক্রমে 'ঠেঙাপাড়া ' নামে পরিচিত হয়। পরে পরে মুসলিমদের মুখে স্থানটির নাম প্রচার হয় বে-রেহম-পুর ( বে-রেহমভাবে তাদের মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল) ও ক্রমে বিরাহিমপুরে রূপে জনপ্রিয় হয়। অবস্থাপন্ন কায়স্থরা পরে বিরাহিমপুর নামকে পরিবর্তন করে একবার বিনোদপুর এবং অন্যবার রাধাকৃষ্ণপুর নাম রাখার চেষ্টা করা হয়। বিনোদপুর নাম রাখার প্রসঙ্গে তাদের যুক্তি ছিল কায়স্থ পূর্বপুরুষ গোপালচরণ দত্তের প্রতিষ্ঠা করা কুলদেবতা রাধা-বিনোদ বিগ্রহের নাম অনুযায়ী গ্রামের নাম পরিবর্তন, অন্যদিকে দত্ত বংশের জমিদারপুরুষ শ্রীরাধাকৃষ্ণ দত্ত নিজের নাম অনুযায়ী এই গ্রামের নাম পাল্টাতে চেয়েছিলেন কিন্তু কালের নিরিখে বিরাহিমপুর নামটিই আজও শোভা পাচ্ছে সবক্ষেত্রেই, বাকি দুটি নাম হারিয়ে গ্যাছে। এখানে জেনে রাখা দরকার, এই দত্তবংশীয়দের পূর্ব পুরুষের হাত দিয়েই দিনাজপুরে একদিন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল , যার সাথে যুক্ত ছিলেন প্রভাকর দত্ত। প্রভাকর দত্তের পিতা রবি দত্ত গৌড়েশ্বরের অধীনে সেনানায়ক হিসাবে কাজ করতেন।


                    



বৈষ্ণবধর্মে ডুবে থাকা গ্রামটির অন্যতম একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল শ্রীগোরাঙ্গের পৃথক ভজন ব্যবস্থা, যেটা কাটোয়া মহকুমাতে বাকি স্থানগুলিতে তেমনিভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই গ্রামে বিভিন্নরকম বৈষ্ণব বিগ্রহের পুজো হয়, যেমন সিংহ বংশীয়দের শালগ্রাম শিলা, মিত্র বংশীয়দের রাধাকান্ত জিউ বিগ্রহ, চট্টোপাধ্যায় বংশের রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এবং দত্ত বংশীয়দের পৃথক নারায়ণ শিলা। এখানে কৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে দুই রাধার প্রাধান্য দেখা যায়, যথা শ্রীরাধা ও শ্রীললিতা সখী হিসাবে পূজ্য। এই বিগ্রহটি রাধা-বিনোদ মন্দিরে বর্তমান। বিরাহিমপুরের আর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সুদৃশ্য টেরাকোটা মন্দিরের গ্রাম।




রাধা-বিনোদ মন্দিরটি হল একটি সুদৃশ্য টেরাকোটা মন্দির। যেটা বঙ্গীয় রীতিকে অনুসরণ করে আটচালা বিশিষ্ট এবং সামনে একটা টিনের ছাউনি দেওয়ার আর একটি চালা। প্রবেশ পথে চাঁদনি নকশা দেওয়া প্রবেশদ্বার। মনে করা হয় ১৭০০ সনের চারের দশকে এটি তৈরি করা হয়েছে, যদিও সময়কাল নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। কালের নিরিখে রাধা-বিনোদ মন্দিরের টেরাকোটার কাজগুলো ম্লান হলেও কিছুদিন আগেও আমরা মুগ্ধ হতাম সেই মন্দির চাতালে বসে। অনেকবার মন্দিরটিকে সংস্কার করার দাবিও ওঠে। বর্তমানে টেরাকোটার সুদৃশ্য কাজগুলো আজ অদৃশ্য! মূল্যবান টেরাকোটার কাজগুলির আজ সিমেন্টের ঢালাই করা হয়েছে। ভাবতেও অবাক লাগে বর্তমান প্রজন্ম উদাসিতা নিয়ে, যে মন্দিরকে এককালে কাটোয়া মহকুমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা মন্দির বলে গণ্য করা হতো, তার আজকের চেহারা দেখলে দুঃখ আসে। অনেককাল আগেই মাননীয় বৈষ্ণব গবেষক শ্রীবঙ্কিম চন্দ্র ঘোষ, তার ‘ রাঢ়ের বৈষ্ণব তীর্থ পরিক্রমা ‘ বইয়ে বিরাহিমপুরের রাধা-বিনোদ মন্দির সম্পর্কে লিখেছিলেন –” মন্দিরের গা ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা আগাছাগুলি তুলে ফেলা লোকের অভাব। মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়মিত ঝাড়ু পড়ে বলেও মনে হয় না“। এসব পড়তে স্থানীয় গ্রামবাসী হিসাবে আমাদেরও কষ্ট হয় খুব। যায় হোক, সারাবছরই বৈষ্ণব রীতি মেনে এখানে রাস, দোল, ঝুলনযাত্রার মতো অনুষ্ঠান খুব জাঁকজমক করেই পালন করা হয় এবং বংশ পরম্পরায় প্রাপ্তবিগ্রহগুলিকে নিত্যসেবা দেওয়া হয়।


কালের হাওয়ার এসব ইতিহাস চাপা পড়ে গেলেও প্রবীণ ব্যক্তিরা আজও রোয়াকে বসে এই ইতিহাসকে রোমন্থন করে, সে রোমন্থনের কথা আমি নিজেও শুনেছি। আমি আজও স্তব্ধ হয়ে ভাবি, চৈতন্যদেবকে স্বপ্ন পেয়ে একদিন এই গ্রামের উপর দিয়েই তো কিশোর কৃষ্ণদাস কবিরাজ ঝামটপুর থেকে বৃন্দাবনের পথে পাড়ি দিয়েছিলেন......।





আলোকচিত্র -- সম্পর্ক মণ্ডল


নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি