| Crimson Shadows : Stephen Hansrote |
ঘরের দেওয়ালগুলোর কেমন অবস্থা, কী রঙ, কোথায় কতটা পলেস্তারা খসে পড়তে চাইছে, কোথায় অপরিচিত ভৌগলিক মানচিত্রের জলছবি... একবার ঘরের আলো নিভিয়ে দিলে আর কিচ্ছু আলাদা করে চেনা যায় না। চারদিকের অন্ধকারও একরকম নিরাপত্তা। দেওয়াল... কখন কোথায় থাকে, তার ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করে। ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে রাতের আঁধার। জানলা, রাস্তার আলো... সান্ত্বনা কিংবা অজুহাতের মতো।
এই আলোটা নিভিয়ে, মা কালীর ছবির দিকে তাকিয়ে তিনবার কপালে হাত ঠেকিয়ে মশারীর ভেতর ঢুকে পড়াই প্রকৃত অর্থে বিশ্রাম। সেই দিনের মতো অবসর নেওয়া। আঁধার কিংবা রাত্রির কাছে অবশেষে আত্মসমর্পণ।
প্রতিরাতের মতো আরও একটা আত্মসমর্পণের পর মাঝে মাঝে মশারীর বাইরে চোখ যায়। একদিকে জানলার বাইরের প্রচ্ছনতা, আর একদিকে একটা লাল অগ্নিবিন্দু দেখতে পাই। ধূপ জ্বলছে। ছোটবেলা বাবাকে দেখতাম, শোয়ার আগে ধূপ জ্বালিয়ে শুতে। একদিন একটা ধূপ অচেতন হয়ে পাশের দেশলাই বাক্সের ওপর পড়ে গেছিল। অন্ধকার ঘরে দপ করে জ্বলে উঠেছিল আলো। সঙ্গে সঙ্গে আগুন নিভিয়ে দিয়েছিল বাবা, একটা মোটা কাপড়ের আসন দিয়ে তার দমবন্ধ করে। কিন্তু ওই শেষ। তারপর আর রাতে ধূপ জ্বালানো হ'ত না। অথচ, এখন আমি ধূপ জ্বালিয়ে শুই। যেদিন ছোটবেলার কথা, ছোটবেলার ঘর, ছোটবেলার রাত মনে পড়ে... সেদিন ধূপ জ্বালিয়ে শুই। ধূপ-দানীর পাশে একটা ছোট কাঠের পুতুল আছে, অন্ধকারে তার আদল খোঁজার চেষ্টা করি। পারি না। ক্রমে ঘরের অন্ধকারের সঙ্গে চোখ ধাতস্থ হ'লে একসময় জেগে ওঠে পুতুলের আদল। বহু বছর আগে পুরী থেকে কেনা একটা কাঠের পুতুল। হাত দুটো ঘোরানো যায়। সেও এক স্মৃতি, ধূপের মতো রাতের পর রাত জেগে থাকে। মশারীর মধ্যে ঢুকলে মনে হয় ওই দেওয়ালের কাছে, ঠাকুর্দার ছবির পাশে ধূপ জ্বলছে। আর এই দেওয়ালের দিকে ছোট ট্রানজিস্টার রেডিও। অনুরোধের হিন্দি গান চলছে-- মন চাহে গীত। গানগুলো শুনতে শুনতে ঘুম এসে যায়। রেডিও নেই, ঘরটাও নেই... শুধু একটা ধূপ ছাই হ'তে হ'তে দিয়ে যায় এত কিছু!
ধূপের সেই লাল অগ্নিবিন্দুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সূর্যের মতো, খুব ধীরে বদলে যায় তার অবস্থান... ধূপ যত ক্ষয় হয়, তত নিচে নেমে আসে। ক্রমে নিচে নেমে আসছে, অথচ আমি দেখে বুঝতে পারি না... শুধু তাকিয়ে থাকি, সারাদিনের কথা ভাবি পাশ ফিরে। আমার পাশে যে শুয়ে থাকে, তার কথা ভাবি। যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল, যেদিন ঠিক করেছিলাম আমরা এভাবেই একসঙ্গে কাটিয়ে দেবো বাকি জীবন... সেই দিন, সেই রাতগুলোর সঙ্গে এই রাতগুলো কত আলাদা! সম্পর্কও অভ্যেস হয়ে যায়। ও-ও হয়ত ওপাশ ফিরে রাতের পর রাত কত কিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে। আমাকে জানায় না। আমরা দু'জন দু'দিকে ফিরে ঘুমোই। ঘুমের মধ্যে আবার মুখোমুখি ফিরে শুই। তারপর আবার দু'জন দু'দিকে মুখ। পর পর অনেকগুলো রাত একে-অপরের শরীরে মিশতে মিশতে আমরা দুজনকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। একদিন রাতে, সব কিছু মিটে যাওয়ার পর আমার চোখে ঘুম আর ক্লান্তি এলো... আমি ধূপের দিকে ফিরে শুলাম। ও পিঠে হাত রেখে কাঁধের কাছে মাথা নিয়ে এলো। তার ক'দিন পর, ওকে দেখলাম ওপাশ ফিরে দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুতে। আমিও এপাশে ফেরালাম না আগের মতো। পিঠে মুখ গুঁজলাম না। ধূপের দিকে ফিরে শুলাম।
রাতে ঘুম আসতে দেরি হ'লে এভাবেই কোনও কোনও রাতের কথা মনে পড়ে যায়। পুরনো ডাকনামের কথা, পুরনো অ্যালবামের কথা, ফটো-ফ্রেমের কথা, বেড়াতে যাওয়ার কথা। চলে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া মানুষের ছবিতে একটা আলাদা মুহূর্ত ধরা থাকে। সেই হাসির মধ্যে জীবনের প্রতি জমে থাকা অভিযোগের আভাস পাওয়া যায় না।
ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী ফির কহাঁ, সুন যা দিল কি দাসতাঁ...
কুকুরের ডাক শুনে চমকে উঠলাম। আচ্ছন্নতা কেটে গেল। রাতে এই রাস্তা দিয়ে কোনও সাইকেল বা মোটরবাইক গেলে কুকুরগুলো ডেকে ওঠে। সেরকমই দু'তিনবার ডেকে থেমে গেল। যখন রাত হয় বাড়ি ফিরতে, এই কুকুরগুলোকে দেখেছি। দিনের বেলার থেকে অনেক আলাদা এদের রাতের চেহারা। পরিচিত কুকুরের চোখেও অচেনা সন্দেহ। রাত নিরাপত্তাহীনতাকে দশগুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্য সময় ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ছুটে আসা কুকুরটাও কেমন ঠাণ্ডা দৃষ্টি নিয়ে দূর থেকে তাকিয়ে দেখে... পুতুলের মতো।
দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম অন্ধকারে ধাতস্থ হয়ে গেছে চোখ। আবছা আবছা অনেক কিছু দেখা যাচ্ছে। সবই চেনা। অবাক হওয়ার মতো, নতুন করে আবিষ্কার করার মতো কিছু নেই। শুধু জানলার বিপরীতে দেওয়ালে ফুটে ওঠা আর একটা জানলা ছাড়া। জানলা দিয়ে আলো এসে এইভাবেই আর একটা অসম চতুষ্কোণ তৈরী করে দেয়। এক অন্যরকম জ্যামিতিক আকার, যা হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না। ছোটবেলা হাত বারিয়ে ধরতে গেলে হাতের ওপর আলো পড়ত। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই আলোয় নিজের হাত দেখতাম। দেখতাম হাতের ছায়া। জানলা দিয়ে আলো এসে যেন একটা মায়াবী হলুদ দরজা খুলে দিতো দেওয়ালের গায়ে। তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই অন্য কোথাও চলে যাওয়া যায়... অথচ, তাকে স্পর্শ করা যায় না। রাত ফুরলেই ফিকে হয়ে মিলিয়ে যায়। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে ওই দেওয়ালের চতুষ্কোণের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এখনও থাকি। ঘর বদলে গেছে, বাসিন্দারা বদলে গেছে... সেই অন্য জগতে যাওয়ার মায়া দরজা বদলায়নি। এখনও তার দিকে তাকালে অবাক হই, নতুন করে আবিষ্কার করি তাকে। অনেক বছর আগে, এক রাতে ওকে ঘুম থেকে তুলে বলেছিলাম, দেওয়ালের কাছে ওই আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াও। প্রথমে বুঝতে পারেনি, অবাক হয়েছিল। আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ওকে আদর করছিলাম, তখন আমরা দু'জনেই দরজার মাঝে... দু'জনেই মায়া। তারপর মাঝে মাঝে নিজেই দাঁড়াতো দেওয়ালের কাছে গিয়ে, যেখানে জানলা দিয়ে আলো আসে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসত... সে হাসি এক পরিচিত আহ্বানের মতো। এখন কি আর মনে পরে সেসব কথা? হয়ত পড়ে!
ঘুমের এক বড়ো শত্রু তলপেটের ব্যথা। চাপ পড়লে বুঝতে পারি, আবার উঠতে হবে... আবার যেতে হবে। ইচ্ছে না থাকলেও, এইসব কিছু ছেড়ে যেতে হবে। ব্লাডারে চাপ বাড়ে, অস্বস্তি হয়। যাব না বলে জেদ ধরে থাকলেও ঘুম হয় না, জেদই সার। খুব সাবধানে বিছানা ছেড়ে উঠে, মশারী তুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। একপাশে ধূপ আর অন্যপাশে আলোর চতুষ্কোণকে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। ছিটকিনীটা শব্দ না করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ঠক করে একটা মৃদু শব্দ হ'ল। ঠিক তখনই আরও একটা শব্দ শুনলাম, একই রকম 'ঠক'। ধূপ-দানীর পাশে থাকা কাঠের পুতুলটা পড়ে গেছে। অল্প আলোতেও বুঝতে পারলাম, ধূপের ছাইয়ের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে পুতুলটা।
ফিরে এসে দেখলাম পুতুলটা তখনও পড়েই আছে। পড়েই তো থাকবে! কাছে গিয়ে দেখলাম ধূপটার আরও কিছুটা বাকি আছে ফুরোতে। পুতুলটা তুললাম সোজা করে রাখব বলে। কিন্তু রাখা হ'ল না। কাঠের পুতুলটা হাতে নিয়ে দেওয়ালের কাছে সেই আলোর চতুষ্কোণের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মায়াবী দরজায় ছায়া পড়ল আমাদের। আলো পড়ল পুতুল আর আমার মুখে। আমাদের নিষ্পলক চোখে। ঘুম নেই। নিজের ছায়া দেখে মনে হ'ল পুতুল নয়, বেহালা হাতে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মনে হ'ল বহুকাল বেহালার সুর শোনা হয় না। কত কাল আগে শেষ বেহালা হাতে নিয়েছিলাম। এখন বেহালা বাজালে সবার ঘুম ভেঙে যাবে। ওরও ঘুম নষ্ট হবে শুধু শুধু। দেওয়ালের হলুদ আলো, মনে হ'ল হলুদ বেলাভূমি। আমাদের দীর্ঘ ছায়া পড়েছে সেই হলুদ বেলাভূমিতে। আর একটু এগোলেই পায়ে ভিজে বালি ঠেকবে। সমুদ্র ছোঁয়া নোনা বাতাসে সোঁ সোঁ শব্দ ভেসে আসছে। পুতুলটা হাতে নিয়ে হাতটা সামনের দিকে মেলে ধরলাম। মনে হ'ল পুতুলটাই আমাকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেলাভূমি ধরে। কী সুন্দর ক্লান্তিহীন যাত্রা... এতটুকু কষ্ট নেই!
হঠাৎ খেয়াল হ'ল সমুদ্রের ঢেউ লেগে পাজামা ভিজে যাবে, পাজামা গোটাতে হবে তার আগে। পাজামা গোটাতে গিয়ে মনে পড়ল, সব বেলাভূমি ফিরে আসে নিরেট দেওয়ালে। তারপর মনে পড়ল-- আমি কোনও দিনই বেহালা বাজাতে পারি না। হাতের মুঠো শক্ত করে, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম মায়া দরজার সামনে... একা। মুঠোর চাপ সহ্য করল পুতুলটা... চুপ করে।
বাইরে তীব্র আর্তনাদ করে উঠল সিকিওরিটি গার্ডের হুইসল্। মাঝে মাঝে মনে হয়, ইচ্ছে করে এমন শব্দ করে... বানশীর মতো!
--- --- ---
চোখে আলো পড়তে ঘুম ভাঙল। হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশে রাখা হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম বেলা বেড়ে গেছে। পাশের ঘর থেকে ওর গলা পেলাম, কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। আসতে আসতে কথাগুলো বুঝতে পারলাম-- "আমার কেমন চিন্তা হচ্ছে... তোরা আজ বিকেলের দিকে একটু আসতে পারবি? কাঠের পুতুলটা কেন বিছানায় নিয়ে শোবে বল?... না না, ঘুমোচ্ছে... আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি..."
জিভটা কেমন বিস্বাদ লাগছে। রোদ পড়ে তেতে উঠছে ডান-কানটা।
কাঠের পুতুলটা তো ধূপদানীর পাশেই রাখা আছে দেখছি, যেমন থাকে।
আমিও কিছু জিজ্ঞেস করব না। চায়ের কাপে ডুব দেব, দিনের মুখে মিলিয়ে যাব বিস্কুটের মতো।
[প্রকাশিত -- ইবলিশ পত্রিকা, ১৪২৬]
No comments:
Post a Comment