'Green Shutters' by Fred Salmon । (চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল (www.richard-neuman-artist.com)
আগে কোনও পয়সা বাজারে অচল হয়ে এলেই জমিয়ে রাখতাম। এক পয়সা, দু পয়সা, পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, কুড়ি পয়সা, চার আনা… সব এক এক করে অচল হয়ে গেল। একটা করে রেখে দিলাম। তারপর, হঠাৎ একদিন দেখি পয়সাগুলো কেমন ঘষে ঘষে গেছে। মর্চে পড়েনি, অথচ কেমন ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে, ওপরের লেখাগুলো আর পড়া যায় না ভালো করে। এদিকে ততদিনে পঞ্চাশ পয়সার বড়ো সাইজটা অচল হওয়ার মুখে। তখন ঠিক করলাম একটা ভালো পলিথিন প্যাকেটে মুড়ে, তারপর একটা টিনের বাক্সে ঢুকিয়ে রাখব। তারপর ওই নতুন পঞ্চাশ পয়সা থেকে বড়ো মাপের এক টাকার কয়েনগুলো… সব তাই করলাম। কতরকম এক টাকার কয়েন যে জমিয়েছিলাম। সব বর্ষপূর্তি, মনীষীদের ছবি, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর… আরও কত। দু’টাকাও ছিল পুরনো। ধর… বাষট্টি সাল থেকে দু’হাজার অবধি… ক’ত বছর হচ্ছে? অ্যাঁ?… স-অ-ব।
–সেগুলো সব আছে?
–ওই রেখে দিয়েছিলাম তো, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভালো করে মুড়ে। তারপর একটা টিনের কৌটোর ভেতর। ভালোই থাকত। বাইরের বাতাস লাগত না। ড্যাম্প লাগত না। পোকায়… না, পোকায় তো পয়সা খায় না। বল?
–লোকজনের বিদেশের কারেন্সি অথবা ডাকটিকিট জমানো হবি থাকে দেখেছি। তুমি এইসব পুরনো… মানে অচল পয়সা কালেক্ট করো?
–নাহ্… এখন আর করি না।
–তাহলে তখন কি ঘাড়ে ভূত চেপেছিল?!
–হ্যাঁ। ভূতই হবে। আসলে, একবার একজন বলেছিল অচল পয়সারও দাম আছে। একটা সময় আসে যখন সেই পয়সা লোকে অনেক দাম দিয়ে কেনে! এই যেমন ব্রিটিশ আমলের পয়সাগুলো, ইয়ুরোপের সব দেশের প্রাচীন মুদ্রা... অচলই তো… কিন্তু নাকি বেশ ভালো দাম ছিল বাজারে। এখনও আছে।
–আর তুমি তাই শুনে পয়সা জমাতে শুরু করলে? একশো বছর পর তোমার থেকে কেউ কিনতে আসবে বলে? কী ক্ষ্যাপা মাল ভাই!
–না না… আমি কি আর একশো বছর পর থাকব? আমি আর কাকে বেচতাম, আর কে-ই বা কিনত!!
–তাহ’লে?
–আসলে, একবার মনে হ’ল— কেউ কেউ যেমন গুপ্তধন রেখে যায়, তেমন আমিও এমন পুরনো খুচরো পয়সা সিন্দুক ভর্তি করে রেখে দেব! একদম লুকিয়ে রাখব কোথাও। কেউ টের পাবে না! তারপর একটা ধাঁধা বানিয়ে রেখে দেব। সেই সিন্দুক খুঁজে বার করার সন্ধান। ব্যস্… আমি মরার একশো বছর পরেও লোকে ওই সিন্দুক খোঁজার চেষ্টা করবে। ধাঁধা উদ্ধার করে তার সন্ধান জানার চেষ্টা করবে। আমি কিছু করি আর না করি… আমার নামে একটা সিন্দুক ভর্তি গুপ্তধন। আর ওই সিন্দুকের জন্যেই আমার নাম মনে রাখবে! ভাব!
– ...
–কী হ’ল? তাকিয়ে দেখছিস কী? আইডিয়াটা হেব্বি না? টর্চে বা পয়সার আলোয় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে একশো বছর পুরনো আট আনা, চার আনা, ইন্দিরা গান্ধীর ছবি, নেতাজীর ছবি! ভেবে দেখ!
–তোমার তো সিরিয়াস মাথা খারাপ! এসব করে কী লাভ?
–তাহ’লে একটা গল্প বলি শোন। আমাদের পাড়ায় একটা বুড়ি ছিল। সবাই বলত খাঁদি মাসি। লোকের বাড়ি কাজ করে খেত। তারপর থুত্থুরি বুড়ি হয়ে আর কাজ করতে পারত না। তিনকুলে কেউ ছিল না। এত বছর ধরে চেনা-জানা। পাড়ার লোকজনই টাকা-পয়সা দিয়ে আসত মাঝে মাঝে। ওতেই দিন চলত। আর বুড়ির পাশাপাশি আর একটি পরিবার থাকত, তারা দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিত। তারপর একদিন শুনলাম খাঁদি মাসি মরে গেছে। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি বডি পড়ে। পাড়ার কাকুদের সঙ্গে আমার ছোটকাকাও দাঁড়িয়ে বুড়ির বডির পাশে। ম্যাটাডোর এলে শ্মশানে নিয়ে যাবে। অবাক লাগল, বুড়ির ওপর কেবল চার-পাঁচটা মালা। সাদা চাদরটা কেমন খাঁখাঁ করছে। পাড়ায় অন্য কেউ মরলে দেখতাম অনেক মালা, ধূপ, তারপর ফুল দিয়ে মোটা-গোড়ের রিং-এর মতো, কপালে চন্দন। বেশ পরিপাটি সাজানো গোছানো ব্যাপার আর কি! কিন্তু এখানে স্রেফ পাঁচটা লিকলিকে রজনীগন্ধার মালা। চেনের মতো আড়াআড়ি রাখা। চোখে তুলসীপাতা। আর কপালের মাঝামাঝি একটা চন্দনের ফোঁটা। এই অবধি দেখেই বাড়ি চলে এলাম।
–তারপর?
***
তারপর কী হ’ল। সেই গল্পটা শেষ না করেই রতনকাকা উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে, লুঙ্গিটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল— “মালা কম থাক, আর বেশি থাক… কিছু যায় আসে না বুঝলি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম এর সঙ্গে ওই গুপ্তধন, পয়সা জমানোর কী সম্পর্ক? কিছুই বলল না। পাঞ্জাবির ভেতর হাত ঢুকিয়ে পিঠ চুলকোতে চুলকোতে চলে গেল। পেছন দিকে না তাকিয়েই বলে গেল— ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে রে… সন্ধ্যাহ্নিক সেরে আবার বেরুতে হবে!’
মোটামুটি সবাই জানে মাথায় হালকা ছিট। তাও মাঝে মাঝে খোঁচালে বেশ রগড় হ’ত।
আজ হঠাৎ ঘটনাটা মনে পড়ে গেল এইসব আয়োজন দেখে। রতনকাকার ছেলেরা দেখলাম বেশ রজনীগন্ধা স্টিক, মালা, সব কিছুরই ব্যবস্থা করেছে। ছেলের বউরা চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়েও দিয়েছে শ্বশুরমশাইকে। দুই ছেলের বউই দেখলাম সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। একজনের মুখে আঁচল চাপা। আর একজন ভুরু কুঁচকে। ম্যাটাডোরটা ছাড়ার আগে ওতে উঠে পড়ে রতনকাকার ছোটছেলে কমলের পাশে উবু হয়ে বসলাম। তারপর আসতে আসতে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম— “সেই অচল পয়সার বাক্সটার কথা জানিস? কিছু বলে গেছেন?” কমল ভুরু কুঁচকে এমনভাবে তাকাল, যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি। আমি আর একবার জিজ্ঞেস করতে বেশ গলায় চড়িয়ে বলল “কীসের বাক্স?” আমি বডির দিকে তাকিয়ে মালা ঠিক করতে করতে বললাম “নাহ্, কিছু না।”
ওই বুড়ির গল্পটা, ফুলের মালা, এসবের মধ্যেই কি কোনও ক্লু ছিল? এখন কী করব বুঝতে পারছি না… শ্মশানে গিয়েই বা কী করব?
[ডিসেম্বার, ২০১৮ । প্রকাশিত - চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবপত্রিকা]
No comments:
Post a Comment