আসন্ন সন্ধিক্ষণে

 

চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল



কটা পাহাড়ী রাস্তা, এঁকে-বেঁকে চলে গেছে নিজের মত। তার একদিকে ভেজা পাথুরে দেওয়াল, অন্যদিকে পাহাড়ী ঢাল, নেমে গেছে অনেকটা নীচে। তার তল দেখা যায় না। শুধু চোখে পড়ে সবুজ আর সবুজ... গভীর পার্বত্য অরণ্য। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে, কিছুক্ষণ পর চোখে পড়ল একটা ভেড়ার পাল। কেমন লাইন দিয়ে চলে যাচ্ছে, সেই পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে। কেউ কেউ থেমে পথের ধারের ঘাসে কিছুক্ষণ মুখ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গে কোনও মেষপালক চোখে পড়ল না। শুধু তাদের মতই সাদা মেঘের পাল তাদের সঙ্গে পাহাড়ের গা বেয়ে চলে যাচ্ছে।      

     তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে, এক জায়গায় চোখে পড়ল, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা সরু পথ নেমে গেছে জঙ্গলের ভেতরে। কী খেয়াল হল...  পাহাড়ী রাস্তা, মেঘেদের পাল ছেড়ে সেই অন্য রাস্তা দিয়ে নেমে গেলাম, জঙ্গলের কোলে। প্রথমে হালকা গাছপালা, তারপর গভীর জঙ্গল। অথচ গভীর জঙ্গলেও সেই সরু পথ কোথাও হারাল না, সেই পথকে অনুসরণ করেই নেমে যেতে লাগলাম। নামতে নামতে, একসময়ে খেয়ালই রইল না-- কোথা থেকে আসছি, কোথায় যাচ্ছি... শুধু ওই পথ বেয়ে নেমে যেতে থাকলাম, গভীর থেকে গভীরে। 

      হঠাৎ একসময়ে কানে এলো নানারকম পাখির ডাক। গাছের আড়ালে আড়ালে মনে হল অনেক পাখি... অথচ একটাকেও দেখতে পেলাম না। অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু একটাও পাখি দেখা গেল না। ডাক শুনে পাখি চিনে নেওয়ার মত ক্ষমতা নেই, কিন্তু কাছে দূরে ক্ষণে ক্ষণে অনেক রকম প্রজাতির পাখির ডাক যে শুনতে পারছি... তা স্পষ্টই বুঝতে পারলাম। আবার সেই সরু পথ ধরে নামতে লাগলাম। এবার সেই পাখির ডাকের সাথে মিশল একটা অন্য শব্দ... জল পড়ার বয়ে যাওয়ার শব্দ, যেন কোনও পাহাড়ী প্রস্রবণ। কোথায় সেই জলপ্রপাত? তার আওয়াজকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম, আরও বেশ খানিকটা পথ।  


     নীচে নামতে একসময়ে জঙ্গলের ঘনত্ব কমল কিছুটা, পাহাড়ের ঢাল কিছুটা সমতল মনে হল সেই জায়গায়... চোখে পড়ল সেই জলপ্রপাত। পাহাড়ের অনেকটা ওপর থেকে বর্ষায় পুষ্টিলাভ করা কোনও পাহাড়ী নদী ঝাঁপিয়ে পড়েছে জঙ্গলের বুকে। সেইখানে অরণ্যের চাঁদোয়া অতিক্রম করে আকাশ দেখা যায়, মেঘ ভেসে যায় ঝর্ণার ঝাঁপ দেওয়া জল ছুঁয়ে। আর, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি... নাম না জানা রঙিন পাখি, দল বেঁধে পাক খেয়ে উড়ে যায়। এমন দেখতে পাখি আগে কোথাও কখনও দেখিনি! 

      হঠাৎ চোখে পড়ল, একটি গাছের তলায় রক্তাম্বর পরে একজন বসে আছেন। তাঁর চোখ বন্ধ, মাথায় খুব ছোট ছোট চুল, মাথা ন্যাড়া করার পর চুল উঠলে যেমন হয়। হাত দু’টো সামনের দিকে কোলের ওপর রেখে গাছের তলায় পদ্মাসনে, ধ্যানে বসার মত। মুখের গড়ন নেপালী আদলের, গায়ের রঙ ফরসাই... তবে কেমন যেন পিতাভ। নেপালী হতেই পারেন, অথবা ভূটানের, কিংবা তিব্বতী?

     সেখানে পাখির ডাক আর জলপ্রপাতের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই... তাঁর চেহারায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কিছুক্ষণ ওইখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম, তাঁর দিকে চেয়ে। একই ভাবে চুপ করে বসে রইলেন, ধ্যানমগ্ন; কিন্তু দেখে মনে হ’ল আমার অস্তিত্ব তিনিও অনুভব করেছেন। অথচ চোখ খুললেন, এতটুকু বিচলিত হলেন না। যেন সচেতন ভাবেই অগ্রাহ্য করলেন আমার উপস্থিতি। নিজেকে হঠাৎই কেমন অবাঞ্ছিত মনে হল এই অরণ্য মাঝে।

     কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম কে জানে? হঠাৎ একটা গুরু গম্ভীর শব্দে চমকে উঠলাম। পাহাড়ের মাঝে, জঙ্গলের গভীরে, কোথা থেকে এই গুরু গম্ভীর ধ্বনি? সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই শব্দ! এক গম্ভীর ওমকার ধ্বনির মত। প্রথমে ভাবলাম ওই লাল কাপড় পড়া লোকটা বোধহয়... কিন্তু না, তাঁর চোখ বন্ধ, তিনি স্থির... তাঁর ঠোঁটও নড়েনি একটুও। তাঁর দিকে স্থির সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম-- এই বার সেই আওয়াজ এলে ঠিক বুঝতে পারব। কিছুক্ষণ পর আবার সেই আওয়াজ! জঙ্গলে, পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হওয়া গম্ভীর ওমকার... কিন্তু সেই মানুষটি তখনও নির্লিপ্ত ভাবেই বসে। ক্রমে মনে হল এই আওয়াজ মানুষের নয়... যেন পাহাড় নিজেই এখানে নিভৃতে ডাকে, গম্ভীর ওমকার ধ্বনিতে। আরও কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু আর সেই ধ্বনি কানে এলো না।

 

     এই প্রথম খেয়াল হল... এবার ফিরে যাই। কিন্তু যে সরু পথ ধরে নেমে এসেছিলাম, সেই পথ আর খুঁজেই পেলাম না কোথাও। পেছনে শুধু গভীর জঙ্গল... কোনও পথ নেই! তবু আন্দাজে ওপরদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কেন জানি না, মনে হল-- যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেমন নেমেছিলাম... তেমন উঠে গেলেই আবার সেই রাস্তা পেয়ে যাব। সেই জঙ্গলের ফাঁকে নিজের পথ বানিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলাম ওপর দিকে। হঠাৎ মনে হল... কেউ যেন পিছু নিয়েছে। ফিরে দেখলাম-- পেছনে কেউ নেই, শুধু পাহাড়ী গাছের ভিড়। ভাবলাম মনের ভুল, আবার এগিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আবার মনে হল কেউ পেছন পেছন আসছে, পড়ে থাকা পাতার স্পষ্ট খসখস। আবার ফিরে চাইলাম, একেবারে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালাম পেছন দিকে... ফেলে আসা জঙ্গলের দিকে। এবারে দেখতে পেলাম তাকে, যে এতক্ষণ আমার পিছে পিছে আসছিল। আমার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। হালকা খয়েরীর ওপর কালো ডোরা কাটা, স্থির দৃষ্টি... একটি বা একজন পূর্ণবয়স্ক বাঘ। চোখের দৃষ্টিতে হিংস্রতা নেই, শান্ত... যেন এমনিই চেয়ে আছে। অদ্ভুত ব্যাপার... হয়ত ওইচোখের দৃষ্টি দেখেই আমার মনের মধ্যে কোনও আতঙ্ক জন্মল না। বেশ দূরত্ব বজায় রেখেই সে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু চোখ সরাল না... সে স্থির, তার দৃষ্টিও নিষ্পলক। 

     কিছুক্ষণ এক ভাবে তাকিয়ে থাকার পর সে ডেকে উঠল... তবে সেই ডাক বাঘের গর্জনের মত শোনাল না। এ সেই গম্ভীর ওমকার ধ্বনি, যা ঝর্ণার ধারে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম...পাহাড়ের ডাক। সেই ওমকার ধ্বনি শুনেই আবার খেয়াল হ’ল... দেরি হয়ে যাচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে ফিরে চাইলাম, দেখি জঙ্গলের মাঝেই আবার একটি পথ! সোজা পাহাড়ের গা বেয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে। অথচ একটু আগেও এমন কোনও পথ চোখে পড়েনি। আশ্চর্য হলেও, সেই পথকে অবিশ্বাস করলাম না। সেই পথ ধরেই ওপরে উঠে যেতে লাগলাম। যেতে যেতে যতবার পেছন ফিরে চাইলাম, দেখলাম সেই বাঘটি আমার পেছন পেছন আসছে। ততটাই দূরত্ব বজায় রেখে... দূরত্ব কমেওনি, বাড়েওনি। তার চোখের দৃষ্টিও একই রকম স্থির। বিস্ময় না অপ্রাকৃত, জানি না--  তখনও আমি কোনও রকম আতঙ্ক অনুভব করলাম না। একবারও মনে হল না -- ছুটে পালাই... এমন সাক্ষাৎ নিশ্চিৎ প্রাণ সংশয়! 


     সেই বাঘ আমার পিছু পিছু অনেক দূর অবধি এলো। অরণ্যের এক গভীরতা থেকে অন্য গভীরতায় চলে যাওয়া সেই আঁকাবাকা পাহাড়ী সংকীর্ণ পথ। তারপর পাহাড়ের অন্যত্র... তারপর জনবসতি... জনবহুল লোকালয়ের ভিড়ে... ইস্কুলের সিঁড়িতে, অফিসের করিডোরে... যেখানেই যাই, পেছন ফিরলেই দেখি সেই বাঘটা দাঁড়িয়ে আছে। চোখে একই রকম স্থির, শান্ত দৃষ্টি। আমাদের মাঝের দূরত্ব কমেওনি, বাড়েওনি। এক সময়ে এইভাবেই চলতে চলতে একটা মন্দিরের সামনে এসে পড়লাম। সেই মন্দিরটি আমি আগে কখনও দেখিনি, সেই মন্দিরে কোন দেবতা বা দেবীর আরাধনা হয়, তাও জানি না। সেই মন্দিরের সামনের চাতাল পেরিয়ে সিঁড়ির কয়েকটি ধাপ উঠেই দেখি সেখানেও সেই বাঘটা আমার পিছু নিয়েছে। তবে, এখানে তার পাশে আরও একটা লোক! তার একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কপালে লাল তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর পরনে গেরুয়া জোব্বার মত। লোকটাকে দেখে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হল... এক অব্যক্ত বিরক্তি আর রাগ! এতক্ষণে, বা এতদিনে কেবল এই বাঘের সান্নিধ্যে যে অভ্যেস হয়ে গেছিল, সেই স্থানে এই ব্যক্তির উপস্থিতিকেই মেনে নিতে পারলাম না। অযাচিত অনুপ্রবেশ, এক ঘোর অপছন্দের অনুভূতি পাক খেয়ে উঠল শরীরে।

            ওর দিকে তাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালাম। কোনো দুষ্টু জন্তুকে বাধা দিতে যেমন ভয় দেখানো হয়... সেভাবে বোধহয় চোখও পাকিয়েছিলাম। সেই লোকটা অমনি দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে দু-তিনবার ভেংচি কেটে পালিয়ে গেল। যেন, এযাত্রায় যাচ্ছে... একটু পরেই ফিরবে অন্যদের নিয়ে। তখন হিসেব বুঝে নেবে।

     কিন্তু বাঘটা কোথাও গেল না। সে আমার দিকে তাকিয়ে, দু’টো থাবা সামনে করে ওইখানেই বসে পড়ল। তারপর আবার ডাকল,সেই পরিচিত গম্ভীর ওমকার ধ্বনি। আর সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের ভেতর বেজে উঠল শঙ্খ। বাঘ আমার দিকে তাকিয়ে রইল একই ভাবে... তার দৃষ্টি স্থির, প্রাশান্তিময়, দিব্য। আমাদের মাঝের দূরত্ব ওই বাড়িয়ে দেওয়া থাবা দুটো কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে।




[শ্রাবণ, ১৪২০]


No comments:

Post a Comment

নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি