চোখের পাতায় জ্যোৎস্না - চোখের পাতায় রোদ


চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল





রাত ঠিক ক'টা, বুঝতে পারছি না। তবে ভালোই গভীর, রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে, নিঝুম। কোনও চার চাকা বা দু'চাকার দেখা নেই। দূরে কোথাও পাড়াতুতো কুকুররা একে ওকে ডাকছে। দু একজন এদিক ওদিক যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আমাকেও দূর থেকে দেখছে জুলজুল করে। রাস্তার আলো কম, এদিকটায় লাইটপোস্টের আলোগুলো খারাপ হয়ে গেছে বোধহয়। উলটোদিকে গলির মুখে একটা লাইটপোস্টের আলো জ্বলছে, সেই মধ্যবিত্ত আলোই খরচ হতে হতে এই রাস্তায় এসে মিলিয়ে গেছে। অন্ধকারে ওদের চোখ জ্বলে, কিন্তু সে জ্বলা কি আর টর্চের মত? ওরা আছে বুঝতে পারছি, আমি আছি ওরা বুঝতে পারছে। পাড়াটা নিঝুম, রাস্তায় লোক নেই... তবুও একটা ছোট দোকান তখনও খোলা। সেই দোকানের কমজোরি আলোর সামনের দিকে যতটা আলো করে রেখেছে, সেই দিকে এগিয়ে গেলাম। দোকানদার শান্তিকাকু, পরিচিত। এখনও দোকান খোলা রেখেছে কেন? শান্তিকাকুর দোকান তো এখানে নয়, সে দোকান তো আমার চেনা ! জিজ্ঞেস করতে কিছুই বলল না। শুধু বলল 'তোর কিছু লাগবে?' না... দোকানটা দেখার আগে অবধি আমার কোনও কিছুরই দরকার ছিল না। এত রাতে আমি রাস্তায় কী করছি, তাও স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু শান্তিকাকুর সামনে সাজানো কাচের বয়ামগুলো দেখে যেন দরকারগুলো জেগে উঠল। ওই বাবল-গামগুলো দরকার... যার সঙ্গে ফুটবল প্লেয়ারদের ছবিওয়ালা কার্ড দেয়! ওই চকোলেটগুলো দরকার... যার সঙ্গে এরোপ্লেনের ছবি থাকে! ওই চিউইং গামগুলো দরকার... যার সঙ্গে হিম্যান-স্কেলেটরের স্টিকার দেয়! কিন্তু টাকা নেই... টাকা তো বাবা দেয়। আমার কাছে টাকা থাকে না। সেই বয়ামটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, যেখানে ওয়ার্ল্ড কাপ বাবল-গামগুলো আছে, কিনলেই ফুটবলারের কার্ড। বয়ামগুলোর দিকে তাকিয়েই আছি... শান্তিকাকু গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
          হঠাৎ একটা বাদামী রঙের ঘোড়া দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল; অন্ততঃ ঐ দোকানের আলোয় বাদামী বলেই মনে হ'ল তার রঙ। খুব যে ছুটতে ছুটতে এলো তা নয়, হালকা গতিতেই... দুলকি চালে। ঘোড়ার ওপরে কেউ একটা বসে, কিন্তু আমার থেকে এতটাই ওপরে যে মাথা তুলে দেখতে গিয়ে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল, তবু তার মুখ অবধি দেখতে পেলাম না। বাদামী ঘোড়াটা একদম আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ঘামের গন্ধ পাচ্ছি। হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই কেমন শিউরে কেঁপে উঠল। আমি চমকে দোকানের দিকে পিছিয়ে এলাম। পিঠটা একটা টিনের পাতে খোঁচা খেল। লোকটা সিগারেট চাইল... চার্মস। শান্তিকাকু সিগারেটের প্যাকেটটা হাত বাড়িয়ে দিতে... সেটা নিয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। শান্তি কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম 'তুমি দাম চাইলে না?' শান্তিকাকু চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল সেই বাদামী ঘোড়ার অন্ধকারে মিশে যাওয়ার দিকে চেয়ে... তারপর ফোঁশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার আমাকে বলল 'তোর কিছু লাগবে?' আমি কিছু না বলে সোজা কাঁচের বয়ামের ঢাকনাটা খুলে ফেলালাম, ওয়ার্ল্ড কাপ বাবল-গাম! কিন্তু হাতে নিয়ে দেখি শুধু মোড়ক, ভেতরটা খালি। একটা একটা করে অনেকগুলো হাতড়ে বার করলাম বয়াম থেকে। সব খালি, সব মোড়ক। তারপর চকোলেটের বয়ামটা থেকে বার করতে গেলাম। সেখানেও সব মোড়ক। তারপর একের পর এক সব ক'টা বয়াম থেকে যা বার করছি সবই মোড়ক! ভেতরে কিচ্ছু নেই! সব খালি! ঘামছি, গলা শুকিয়ে গেছে। শান্তিকাকুকে বললাম - 'একি! সব তো খালি... ভেতরে তো কিছুই নেই!' শান্তিকাকু খিল খিল করে হেসে বলল 'হ্যাঁ! সব খালি... ভেতরে কিচ্ছু নেই! সব ভ্যানিশ হয়ে গেছে... ম্যাজিক!' আমার কেমন হঠাৎ ভয় করে উঠল। 'এত রাতে আমি একা একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি... বাড়িতে মা চিন্তা করছে... এখন আমার ঘুমনোর কথা...' এই চিন্তাগুলো একসাথে মাথার মধ্যে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। সেই বাদামী ঘোড়াটা আবার দোকানের সামনে ফিরে এসেছে। আবার আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে এসে। সারা রাস্তা ভরতি চকলেট আর চিউইং গামের মোড়ক ছড়ানো। সেই মোড়কগুলোর কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে... ফরররর; আর উড়ে উড়ে যাচ্ছে মোড়কগুলো। চারিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় উড়ছে। ঘোড়ার ওপর বসে থাকা লোকটা তার হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। তার হাতে একটা ডেয়ারি মিল্কের চকোলেট। 

      এবারেও তার মুখটা দেখতে পেলাম না। মাথা তুলে তার কাঁধের ওপরে দেখার চেষ্টা করলেই কেমন চোখের পাতা বুঁজে আসে, ঘুমে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমি চকোলেটের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শান্তিকাকু ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলল 'এই চকোলেটটা ঠিকঠাক। নিবি তো? কি রে? নিবি তো এটা?' শান্তিকাকু খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতেই থাকল। আর ওই হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাস্তার ওপর একটা ঝড় উঠল। ঘোড়ার নিঃশ্বাস থেকে ঝড়। কেমন গা শিরশির করে উঠল... হাত-পা অবশ হয়ে গেল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছি। রাস্তায় সব মোড়কগুলো পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছে। ঘোড়াটা ফরফর করে নিঃশ্বাস ফেলছে। শান্তিকাকুর হাসি আর থামে নয়া! লোকটা স্থির ভাবে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে... হাতে চকোলেট। আর আমি... আমি কিছুই করতে পারছি না। হাত-পা নড়ছে না। দাঁড়িয়ে আছি পাথরের মত।


--- --- ---

পোল্যান্ডের ভ্রৎস্লাভ-এ (Wroclaw) একদিন সকালে একটি দল অনেকজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করল-- 'আজকে সূর্যাস্তের আগে আপনার একটি স্বপ্ন থাকলে, সেটা কী?' স্বপ্ন - Dream ; এই শব্দটাই তারা ব্যবহার করল - 'What would be one dream before the sunset?' তাতে বালক থেকে বৃদ্ধ অনেকে অনেক রকম প্রতিক্রিয়া দেখালেন। কেউ কেউ ভেবে উঠতে পারলেন না একটি স্বপ্ন কী হ'তে পারে। কেউ কেউ বলল 'দিনের শেষে আমি খুশি থাকতে চাই'। একটি বাচ্চা ছেলে বলল ২০০ Zloty (পোলিশ মূদ্রা Zloty) পাওয়া তার স্বপ্ন; আর অপর একটি বাচ্চা ছেলে বলল এক মিলিয়ন Zloty! একজন মা বললেন তাঁর আজকের স্বপ্ন 'সন্তানের সুস্থ জীবন। কেউ বললেন 'আমার ক্যান্সারটা সেরে যাক', কেউ বললেন 'পৃথিবীতে বড় বেশি বেদনা, সেই বেদনা কমুক', আর একজন ভেজা চোখে, ধরা গলায় বললেন 'আমার সন্তানরা যেন আমাদের থেকে ভালো জীবন পায়।' এটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। এক একজনের উত্তর এবং প্রতিক্রিয়া সত্যিই মনে রাখার মত। 
            কিন্তু কথা হ'ল-- এখানে স্বপ্ন আছে... কিন্তু ঘুম নেই! এই মানুষগুলি স্বপ্ন দেখেন, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেন? বেঁচে থাকার এই কার্নিশের গায় বিন্দু বিন্দু জমে থাকা জলের ফোঁটার মত ইচ্ছে গুলোই কি স্বপ্ন নয়? জীবনের এক তৃতীয়াংশ ঘুমিয়ে কাটানোর যে সমীক্ষা, তা কি শুধুই নিষ্ফল নিদ্রা? নাকি জীবনের এই এক তৃতীয়াংশের মধ্যেই একটা অন্য জগতে বেঁচে থাকার অধ্যায়? কখনও নিজের ইচ্ছে মত, কখনও সেই বিবেকের তাড়া খেতে খেতে?!
কার্ল ইয়াং ঠিক এই জায়গাটাকেই ধরে বলছেন -
"Yet anyone who stops for a moment to recall a dream will be aware of this contrast , which is infact one of the main reasons why the ordinary person finds dreams so hard to understand . They do not make sense in terms of his normal waking experience , and therefore he is inclined either to disregard them or to confess that they baffle him ."
কিন্তু এই ঘুম থেকে উঠে স্বপ্ন মনে করার চেষ্টার থেকেও অনেক বড় পাওয়ার হাউস হয়ে মস্তিষ্কে থাকে-- জেগে থেকে ইচ্ছেগুলো দানা বেঁধে যে স্বপ্নের সৃষ্টি করে। ঠিক যেমন করে স্বপ্ন লালিত হচ্ছে উড়ালপুলের নিচে বসবাস করা তাঁবুর ভেতরে, যেমন স্বপ্ন লালিত হচ্ছে বাস্তারের মানুষগুলোর মনে, যেমন স্বপ্ন লালিত হচ্ছে ক্ষরাবিধ্বস্ত গ্রামের পরিবারগুলোর মনে। আবার সেই একই ভাবে স্বপ্ন বুনতে বুনতে হেঁচে যাচ্ছে পিঠে ব্যাগ নিয়ে একটা বাচ্চা মেয়ে, আর তার হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া তার মা। স্বপ্ন দেখতে দেখতে খবরের কাগজ বিলি করা আব্দুল কালাম। স্বপ্ন দেখতে দেখতে সকলের সমাদর পাওয়া অভিনেতা নওয়াজুদ্দিন সিদ্দকী। কাগজকুরুনির কাজ সেরে বইবাঁধানোর ঘরে স্বপ্ন দেখতে দেখতে গবেষক হয়ে ওঠা মাইকেল ফ্যারাডে।
            এই স্বপ্নের জগৎই কোথাও লুইস ক্যারলের 'Through the Looking-Glass', কোথাও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভূত পতরীর দেশে' ... আবার কোথাও জর্জ অরওয়েলের 'Nineteen Eighty-Four'। ঠিক এই পথেই স্বপ্ন হয়ে যায় নবারুণ ভট্টাচার্যের 'লুব্ধক' ।
পরলোক চর্চার সময় রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় পুত্র শমীন্দ্রনাথকে বার বার ডেকে যে 'শমীর পৃথিবী'র কথা শুনতেন, সেই পারলৌকিক অস্তিত্ব আসলে কী?
স্বপ্ন কোথাও ইউটোপিয়া, স্বপ্ন কোথাও যাদুবাস্তব... স্বপ্নই আসলে ইচ্ছে, ইচ্ছে... সব মনের ইচ্ছে, আর ইঁদুরকল থেকে পালানো।

--- --- ---


'Man and his Symbols' বইটিতে কার্লস ইয়াং এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন -
"The British author Robert Louis Stevenson had spent years looking for a story that would lit his "strong sense of man's double being, " when the plot of Dr. Jekyll and Mr.Hyde was suddenly revealed to him in a dream."

অবাক হওয়ার বোধহয় কিছু নেই, কারণ এমন স্বপ্নে পাওয়া অনুপ্রেরণা বা পরিকল্পনার কথা হয়ত প্রচুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন রসায়নিক যৌগ 'Buckminsterfullerene' আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এমন স্বপ্নে পাওয়া 'আইডিয়া'র কথা প্রচলিত আছে। আবার এও প্রতিষ্ঠিত জনশ্রুতি-- রাণী রাসমণি স্বপ্নাদেশ পেয়েই দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের কাজ শুরু করেন। এমন অনেক রকম স্বপ্নের গল্প বা স্বপ্নাদেশের কথা কান পাতলে বাংলার জেলায় জেলায় শোনা যাবে (সবটা মিথ্যে বা বুজরুকি বলে উড়িয়ে দেওয়ার মানে দেখি না)। কিন্তু সবটাই কি স্বপ্নের মধ্যে 'ইউরেকা' বা 'ওরাক্‌ল'? নাকি এই মানুষগুলির চিন্তার একটা স্তর থেকে অবচেতন একটা চাদর সরে যায় এই ভাবে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে? হয়ত এই চিন্তাটা মনে ছিলই। ট্রানজিয়েণ্ট ভাবে এসেছিল, তাৎক্ষণিক ভাবে, অথবা অন্য কিছু দেখা বা শোনার মাধ্যমে ঝিনুকের মধ্যে সাগরের জল প্রবেশ করার মত ঢুকে গেছিল। কখন সেটা মুক্ত হয়ে গেছে সে জানেই না। সেই স্বপ্নটা এসে চিনিয়ে দিয়ে গেল, মুক্তটা থেকে গেছে মাথার ভেতরে। তাহ'লে... যে স্বপ্নকে, বা স্বপ্নগুলোকে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আমরা ভুলে যাই, বা মনের কোণে ফেলে রেখে দিই... কখনও ফ্রীজে রেখে দেওয়ার মত, কখনও ভাড়ার ঘর কিংবা চিলেকোঠায় তালাবন্ধ করে দেওয়ার মত, আবার কখনও গুমঘরে বন্ধ করে দেওয়ার মত; সেই স্বপ্নগুলোর মূল্য কী হ'ল? এইখানেই সিগমণ্ড ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণ ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়--
"To begin with, it happens that certain material appears in the dream-content which cannot be subsequently recognized, in the waking state, as being part of one's knowledge and experience. One remembers clearly enough having dreamed of the thing in question, but one cannot recall the actual experience or the time of its occurrence. The dreamer is therefore in the dark as to the source which the dream has tapped, and is even tempted to believe in an independent productive activity on the part of the dream, until, often long afterwards, a fresh episode restores the memory of that former experience, which had been given up for lost, and so reveals the source of the dream. One is therefore forced to admit that in the dream something was known and remembered that cannot be remembered in the waking state."

বিশ্বাস-অবিশ্বাস, গুরুত্ব দেওয়া বা না দেওয়া, অন্বেষণ করা কিংবা বিছানাতেই ফেলে দেওয়া-- এসব থাকেই, সেই অন্য একটা দিক। কিন্তু জেগে থেকে যে স্বপ্নগুলো নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে সেগুলোর সঙ্গেও বোধহয় এইভাবেই বিশ্বাস, গুরুত্ব বা অন্বেষণের একটা যোগসূত্র থাকে। সেই স্বপ্নের মধ্যেও থাকে পবিত্রতা, অথবা চূড়ান্ত অপরাধের বীজ। অনেক তত্ত্ব কথা আর থিওরির বাইরে এই বেঁচে থাকা আর জেগে থাকা স্বপ্নগুলোর স্বয়ম্ভূ অস্তিত্ব। এই নিয়ে চটজলদি কনক্লিউশনে আসা যায় না, আসার কথাও নয়। বরং এই স্বপ্ন ব্যাপারটাই চূড়ান্ত যাদু-বাস্তব উপস্থিতি, যেখানে দালির সৃষ্ট চিত্রর মত সময়কে গলে গলে পড়তে দেখা যায়। কিংবা রাসকিন বন্ডের গল্পে সেই কাটা ঘুড়িটার মত ভেসে বেরিয়ে যাওয়া যায় অন্য অনেকের নাগালের বাইরে। এই ভাসার মধ্যেই একটা রেফারেন্স ফ্রেম যার প্রকৃত শুরু আর শেষ নিজের আয়ত্ত এবং সাধ্যের বাইরে। একেবারেই বাইরে। যেমন আমার নিজেরও মাঝে মাঝেই মনে হয়, অনেকটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎ একদিন ঘুম ভেঙে দেখব বিছানায় মাথা ভারি হয়ে পড়ে আছি, চোখের পাতায় রোদ্দুর... অনেকটা বেলা হয়ে গেছে।


--- --- ---


ধাপে ধাপে অনেকটাই নীচে নেমে গেছে সিঁড়িগুলো, ওপরদিকের সিঁড়িগুলোতে শ্যাওলা, আগাছা... একটা দুটো বট-অশ্বত্থের চাড়াও চোখে পড়ে। আর একদম নীচের দিকের সিঁড়িগুলোতে ফাটল, ভাঙন। যেন নোনা ধরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। তবে জলে গিয়ে শেষ নয়, শেষ কাদা মাটিতে। সেইখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ধূধূ মাঠ। মাঠের ওপারে বেতের বেড়া, কলা গাছ, টিনের চালের ঘর। আর ঘন থেকে আরও ঘন সবুজ হয় যাওয়া গাছগাছালী। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনও মানুষের দেখা পেলাম না। একটা শুকনো হাওয়া বইছে, তার শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশে অনেকটা ওপরে চিল চক্কর কাটছে। হয়ত মেঘগুলো জমাট বাঁধবে এবার। সূর্যের তেজ কেমন কম, অথচ অস্ত যেতে এখনও অনেক দেরি। বাতাসে মাঠের ধূলো উড়ছে। মাঠটা যেন একটু বেশিই বিস্তৃত... যতটা চওড়া, তার থেকে অনেক বেশি লম্বা। অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। যেন একটা বিশাল মাঠ বয়ে চলে গেছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মাঠের বুকে মাটি ফেটে গেছে, ঠিক যেমন কোনও ঝিল কিংবা ভেরির সব জল সুকিয়ে যাওয়ার পর তার কাদা মাটি ফেটে গেলে যেমন হয়। সেই ফাটল থেকেই ধোঁয়ার মত ধূলো উড়ছে, ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। আসতে আসতে যেন বাতাসের গতি বাড়ছে। ধূলোগুলোও মেঘের মত আকাশে উঠছে, সূর্য কে ঢেকে দিচ্ছে। কমে যাচ্ছে আলোর তেজ। আকাশে মেঘ না ধূলো ছেয়ে যাচ্ছে, বোঝা মুশকিল। এবার এখান থেকে যেতে হবে, কিন্তু যাব কোথায়? মাঠ পার হয়ে ওপারে চলে যাব? নাকি ফিরে যাব? সিঁড়ির ধাপে বসে পড়লাম ভাবতে ভাবতে। এই প্রথম মনে হ'ল... এটা ঠিক এমনি সিঁড়ি নয়, কোনও ঘাটের ধাপ। কোন ঘাট? এখানে জল কোথায়? কিছুই তো নেই!

হঠাৎই একটা লোক কোথা থেকে এসে এই সিঁড়ির ধাপে ধাপে নেমে যেতে লাগল মাঠের দিকে। বেশ খানিকটা নীচে নেমে যাওয়ার পর হঠাৎ পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। অচেনা মুখ, সাধারণ চেহারা। ফতুয়া আর লুঙ্গি পরা। মুখে গোঁফ, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হাতে একটা সবুজ-সাদা ডোরাকাটা নাইলনের ব্যাগ। আমাকে জিজ্ঞেস করল 'এখানে কোনও কাজ আছে?' আমি বললাম 'না'। তারপর জিজ্ঞেস করল 'তাইলে কি ওপারে যাবা?' আমি বললাম 'বুঝতে পারছি না'। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল 'আকাশের অবস্থা ভালা না... চলেন'। আমি সিঁড়ির ধাপটা থেকে আসতে আসতে উঠে পড়েছি ওর কথার উত্তর দিতে দিতে। বাতাসে ওর চুল উড়ছে। জিজ্ঞেস করলাম 'আচ্ছা, এই জায়গাটার নাম কি বলতে পারেন? এটা কেমন ঘাটের মত দেখতে... অথচ সামনে এমন ধূ ধূ মাঠ, ফাঁকা জমি...' লোকটা কেমন খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল, তারপর বলল, 'ও যবে ঘাট ছেল, তবে ছেল... এখন জল নাই, ঘাটও নাই।' আমি বললাম, 'জল মানে... নদী ছিল? শুকিয়ে গেছে?' লোকটা আবার খ্যাক খ্যাক করে হাসল, হাসতে হাসতে বসে পড়ল শেষ ধাপে। তারপর বলল, 'ইদিকে নতুন বুঝি? সে দেখেই বুজিচি!... হ্যাঁ, ঘাট ছেল, লোকে বলত 'বাবুঘাট'। নদী ছেল।' 'বাবুঘাট' নামটা শুনেই কেমন বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠল। এ বলে কী? নদি 'ছিলো'? ঘাট 'ছিলো'?
সেই লোকটা বলে চলল-- 'শহর ছেল... নদীর পারে টেরেন চলত, বিরিজ পার করে বড় ইস্টিশন ছেল... ' এই সব বলতে বলতে ডানদিকে হাত তুলে দেখালো। দূরে একটা ভেঙে পড়া ব্রীজের অবশেষ। ওপারে খানিকটা টিকে আছে, এপারে খানিকটা ঝুলছে... মাঝে সিঁদুরে মেঘ আর ধূলোয় ঢেকে থাকা আকাশকে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
শোঁ শোঁ করে তখনও একটানা হাওয়া দিচ্ছে। ধূলো উড়ছে। আকাশের রঙটা টকটকে লাল হয়ে গেল হঠাৎ, সেই রক্তাম্বর আভাতে আশেপাশে সব কিছুই রক্তিম। লোকটা সেই ফুটিফাটা মাঠ... না মাঠ নয়, শুকিয়ে যায় ভাগিরথীর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পলির ধূলোয় মিলিয়ে গেল। সেই দানবের পাঁজরের মত পড়ে থাকা ব্রীজের অবশেষের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনুভব করলাম... ঝড় এসে উড়িয়ে নিয়ে গেলেও, কিছুতেই এখান থেকে নড়া সম্ভব নয়, এক চুলও নড়া সম্ভব নয়।

 

[জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৪]




No comments:

Post a Comment

নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি