ধূসর উদ্যোগ, বিবর্ণ ভ্রান্তির মেঘ


চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল



উদ্যোগ পর্বের প্রায় শেষের দিকে এসে, মাতা (রাজমাতা?) কুন্তী বাসুদেবকে স্পষ্ট বলে দিলেন, যুধিষ্ঠিরকে গিয়ে আচ্ছা করে দু’কথা শুনিয়ে দিতে ওঁর হয়ে। বার্তা খুবই স্পষ্ট -“পুত্র, তুমি মন্দমতি, শোত্রিয় ব্রাহ্মণের ন্যায় কেবল শাস্ত্র আলোচনা করে তোমার বুদ্ধি বিকৃত হয়েছে, তুমি কেবল ধর্মেরই চিন্তা করছ... তুমি পিতৃপিতামহের আচরিত রাজধর্ম পালন করো, তুমি যে ধর্ম আশ্রয় করতে চাও তা রাজর্ষিদের ধর্ম নয়। দুর্বল বা অহিংসাপরায়ণ রাজা প্রজাপালন করতে পারেন না... মহাবাহু, সাম দাম ভেদ বা দণ্ডনীতির দ্বারা তোমার পৈতৃক রাজ্যাংশ উদ্ধার করো। তোমার জননী হয়েও আমাকে পরদত্ত অন্নপিণ্ডের প্রত্যাশায় থাকতে হয়, এর চেয়ে দুঃখের আর কী আছে?” 

     যুধিষ্ঠিরের ধর্ম চেতনা এবং অবস্থানগত দার্শনিক দৃষ্টিকোণকে বাসুদেব কৃষ্ণ ছাড়া আর কেউ এই ভাবে তুলোধনা করেনি। এবং এত কিছুর পরে আবার ‘বিদুলা নামনী ক্ষত্রিয়া জননীর উপাখ্যান’-রূপী ভোকাল টনিক! এবং তারও শেষে তীর্যক খোঁচার সঙ্গে বলা– “কোনও রাজা শত্রুর পীড়নে অবসন্ন হ’লে তাঁকে তাঁর মন্ত্রী এই উৎসাহজনক তেজোবর্ধক উপাখ্যান শোনাবেন।” একেবারে গীতায় একের পর এক জীবন-দর্শনের কথা এবং বিশেষ কর্মযোগের বৃত্তান্ত শুনিয়ে স্ট্র্যাটেজিক সারথী কৃষ্ণ, ধনঞ্জয়ের যে মগজ ধোলাইটি করেছিলেন, উদ্যোগপর্বে যুধিষ্ঠিরের প্রতি মাতা কুন্তীর এই বার্তা যেন তারই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ! দেবী কুন্তীর এই আকস্মিক নাতিশীতোষ্ণ বার্তা, একদম মেঘ না চাইতেই জল। বাসুদেব নিজেও এর থেকে ভালো করে নিমরাজী যুধিষ্ঠিরকে সোজা রাস্তায় আনতে পারতেন না।


     দুর্যোধন প্রথম থেকেই রনং দেহী ছিলেন, মহাভারতের অদ্ভুত প্রতিনায়ক, প্রতিষ্ঠিত 'দুষ্টু লোক'। পাণ্ডবদের কাছে দৌত্য করতে আসা মহামতী বিদূরের মুখে কৌরবদের শাসানী শুনে যুধিষ্ঠিরও স্থৈর্য হারিয়ে সপাটে বলেন, “আমার রাজ্য ফিরিয়ে দিলে ক্ষমা করতে রাজী আছি, না হলে ময়দানেই ফয়সালা হবে।” আর বাকি এদিক ওদিক কেউ যদি যুদ্ধটাকে এড়িয়ে যাওয়ার মত সামান্য প্রচেষ্টা করতে উদ্যত হ’ন, সেখানে প্রবল উসকানি দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছেন বাসুদেব কৃষ্ণ। এইরকম পরিস্থিতিতে, অন্য কেউ নয়... স্বয়ং কুন্তী যুদ্ধের পক্ষে সওয়াল করছেন সরাসরি। সরাসরি কুন্তীভোজ সমেৎ নিজের পিতৃকুলকে স্বভাগ্যের এই দীর্ঘায়িত দুর্দশার জন্য দোষারোপ করছেন। একদিকে যেখানে আর এক বর্ষীয়ান কূলবধু মাতা গান্ধারী আসন্ন যুদ্ধের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত... সেখানে বেপরোয়া ভাবে যুদ্ধের আবশ্যকতাকে আহ্বান জানাচ্ছেন আর এক ক্ষত্রিয়া, মাতা কুন্তী। যেন তিনি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী, কেশব তাঁর সন্তানদের হয়ে দৌত্য করতে এমনি এমনি আসেননি! সব দিক বেঁধেই এগোনো হবে, কেবল ওই মিনমিনে বড়ো ছেলেটি বেঁকে না বসলেই হ’ল।


এই উদ্যোগ পর্ব যেন মহাভারতের এক পর্দা সরিয়ে দেওয়ার পর্ব। উন্মোচনের পর উন্মোমোচন ঘটছে একের পর এক চরিত্রের... কোথাও জোরালো ভাবে, কোথাও সূক্ষ্ম ভাবে। এই পর্বেই কিছু চরিত্রের  মনের ভাব, অদ্ভুত মুনশীয়ানার সঙ্গে এক উজ্জ্বল আলোকে নিয়ে আসা হয়েছে, যা আগে সেই ভাবে ধরা পড়েনি। সেই এক আদিম প্রবৃত্তি উঁকিঝুঁকি দিয়েছে বিদগ্ধদের মনেও... দশ জনের মধ্যে আট জন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে আসন্ন যুদ্ধের পক্ষে থাকাই সমীচীন বোধ করলেন। এমন কি কামারের এক ঘা’র মত, স্বয়ং বাসুদেবও শান্তির প্রস্তাবের বকলমে পাণ্ডবপক্ষের হয়ে এমন আস্ফালনটি করে গেলেন ভরা সভায়, যে এরপর দুর্যোধনের মত রগচটা মানুষের ‘প্রেস্টিজ’ বাঁচাতে গেলে গলাফাটিয়ে বলতেই হয় ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী!’ একটা দোতলা বাড়ির বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া মামলায় কে ঠিক কে ভুল সেসবের ঊর্দ্ধে গলার শিড়া ফুলিয়ে তর্ক চলে... কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি এমনি এমনি ছেড়ে দেয় না, আর এ তো রাজপাটের ব্যাপার!  


                                                                                              --- --- --- 


আসলে পরিকল্পনা, কৌশল, ষড়যন্ত্র, সিদ্ধান্ত... এই জিনিসগুলো হয়েই এইরকম। স্কুলের বইয়ে ধরিয়ে দেওয়া পাঠ্যপুস্তকে একের পর এক ঘটনা আর সাল-তারিখ, এবং আর একটু কপালে ভাঁজ পড়া স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্বে ‘কেন হইয়াছিল... না হইলে কী হইত... বিস্তারিত ঘটনা এবং ফলশ্রুতি’-- এইটুকুই তো ইতিহাস নয়! বিভাগীয় গভীরতা বা পাঠ্যসূচীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখাই কী করে?...  কিন্তু তবু কেমন মনে হয়, পরীক্ষার নম্বরকে শেষ কথা ধরে নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে ইতিহাস শব্দের আসল সংজ্ঞাই ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমানের দর্পণে অতীতের প্রতিবিম্ব দেখে ভবিষ্যৎকে খোঁজার যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা-ই হ’ল ইতিহাস। ঠিক যেমন ইতিহাসবীদ ই এইচ কার (E. H. Curr) বলেছিলেন, "It is a continuous process of interaction between the historian and his facts, an unending dialogue between the past and the present." 

     রাজাদের স্থাপত্য আর যুদ্ধ-বিগ্রহর গপ্পো নয় শুধু; ইতিহাস এক নিরন্তর অন্বেষণ। যেখানে দাঁড়িয়ে আনন্দমঠের সেই ইন্ট্রোস্পেকশনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে - “মা যাহা ছিলেন... মা যাহা হইয়াছেন”। সেই দর্পণের দিকেই যদি দৃষ্টি ফেরাই, উপমহাদেশের সেই প্রতিবিম্ব কেমন কালতরঙ্গে খেলা করে। সেই একই রকম উদ্যোগ পর্বের মঞ্চাভিনয় চলেছে এক এক জায়গায়, এক এক ভাবে। সেই পূর্বপরিকল্পনা মত ঘুঁটি সাজিয়ে ফেলা, চিকের আড়ালে ষড়যন্ত্রের দ্যূতক্রীড়া। সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এক আসন্ন যুদ্ধকে ইন্ধন যোগানো, যাকে এড়িয়ে যাওয়া খুব একটা কঠিন হ’ত না। সেই একই ভাবে রাষ্ট্রসংঘে উত্থিত শান্তি প্রস্তাবের অন্তরালে কালো ধোঁয়া উঠতে থাকে... সে ধোঁয়া আকাশ ঢেকে ফেলে কখনও চেচনিয়ায়, কখনও গাজায়, কখনও ভিয়েতনামে, কখনও ইরাকে, কখনও লিবিয়ায়, কখনও পূর্ব ইয়ুরোপে। 

       নিশ্চিতরূপেই, যুদ্ধ হ’ল স্বার্থের সব থেকে বৃহৎ এবং নৃশংস আত্মপ্রকাশ (যার ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে থাকে স্বার্থ, ক্ষমতা আর অহংকার)। সে দুনিয়ার যে কোণেই হোক, যে কারণেই ঘটুক। সেই দর্পণের প্রতিবিম্ব ঠিক চিনিয়ে দেয় কে তখন ছিল, আর এখন এমন হয়ে উঠছে চোখের সামনে। আমরা স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে খালাস, অথচ সময় যন্ত্রের নাবিক ইতিহাস, ঠিক পাল তুলে অতীতের সমুদ্র থেকে বর্তমানের সাগরতটে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলে। সবকিছুরই এক চিরপরিচিত প্যাটার্ন থেকেই যায়। আমরা যখন কিছুটা চিনতে পারি, বুঝতে পারি-- সেই পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত, অবস্থানগত পক্ষপাতের মধ্যে কোথাও একটা গলদ থেকে গেছে... ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে যায়। এদিক ওদিক থেকে শুধু চাপা দীর্ঘশ্বাস আর স্বগতোক্তি ভেসে আসে ‘কী ছিল... আর কী হয়ে গেল!’ মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে যা ঘটে গেছে, তারই পুনরাবৃত্তি ফিরে ফিরে এসেছে ইতিহাসের পাতায়... এক একরকম আঙ্গিকে, আসন্ন যুদ্ধের দামামা রব নিয়ে। আমরা বার বার তাদের চিনতে ব্যর্থ হই, সতর্ক থাকতে ব্যর্থ হই। আমাদের এই নিশ্চিন্ত আত্মতৃপ্তিই কখনও ‘ফার্স্ট ডিভিশন’, কখনও উচ্চশিক্ষার সংশাপত্র।


এই ‘ভুল’ শব্দটাও কিন্তু বিদ্রুপ করতে বড়ো ভালবাসে। শুধু পরিকল্পিত কিছু কাজের অপ্রত্যাশিত ফল পাওয়াই ভুল নয়, একদম সুপরিকল্পিত ভাবে ভ্রান্ত ধারণাকে প্রশ্রয় দিয়ে গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত এবং তেমন ভ্রান্তির ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপও সমান ভুল। সব আলোচনা বা বিতর্কের ঊর্দ্ধে, সেই সব ভুল অকাট্য ‘ভুল’-ই থেকে যায়। সেই স্কুল থেকেই, কেউ ভুল করলে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সবার আগে আমরা হাসতে শিখে যাই। এক প্রতিষ্ঠিত ‘সঠিক’-এর ধারে কাছে না আসতে পারা ভুলের প্রাপ্য বিরাট লাল গোল্লা। আমরা বিদ্রুপ করে নিই খুব খানিক হেসে নিয়ে, আর ভুলও হাসতে শিখে যায় আমাদের ওপর। আমাদের হাসির মধ্যেই ভুল হাসছে ঠিক এই ভাবে। 

     কখনও নেপোলিয়ান বা হিটলারের রাশিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত এক ‘ম্যামথ মিস্টেক’, আবার একদিকে এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে অন্ধ ব্যক্তি-সিদ্ধান্তের ভুলই ঘটনার গতি-প্রকৃতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে... ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বাঁচিয়ে দিয়েছে স্বৈরাচারের কালো মেঘে ঢাকা অনন্ত দুঃস্বপ্নের হাত থেকে। কারও মস্ত বড়ো ভুল, বোধহয় এই ভাবে কারও জন্য মস্ত বড়ো ঠিক হয়ে যায়। ঠিক সেই ভাবে প্রতিষ্ঠিত সংস্কার আর আজন্ম মেনে নেওয়া প্রথাগুলোও তো সব কেমন বিচার-আলোচনার ঊর্দ্ধে নিজের মত করে ভুল-ঠিকের প্রচলিত সংবিধান আঁকড়ে  বসে থাকে। এক ব্যক্তি, এক গোষ্ঠী অথবা এক সম্প্রদায়ের এক বা একাধিক ভুলই, বিস্তার পেতে পেতে সকলের মাঝে এমন এক ‘মহাকায় ঠিক’-এর রূপ নেয় যাকে লঙ্ঘন করা সাধারণ মানুষের কাছে এক দুরূহ হয়ে ওঠে।  একটা সামাজিক ঢেঁকির এক দিকে বসে একজন বলেন ‘বিশ্বাস কখনও অন্ধ হয় না’ আর একদিকে বসে অন্য একজন বলেন ‘বিশ্বাসের আবার চোখ কি? বিশ্বাস অন্ধই’। 

      ভুল যেন গড়িয়ে গড়িয়ে একবার এর পক্ষ আর একবার ওর পক্ষ নিয়ে নিরন্তর ঢেঁকির ওঠা নামা চালু রেখে দেয়। আর এই রকম ছড়িয়ে থাকা ভুল... বারে বারে চেহারা পালটানো বহুরূপী ভুল, জড়াগ্রস্ত প্রাচীন ভুল, স্বার্থ আর অহংকারের ভুল... কিংবা নেহাত ভালো কিছু করতে গিয়ে ‘ব্যাকফায়ার’ হয়ে যাওয়া ভুলগুলো কখনও ডুব-সাঁতার দেয় আর কখনও মাথা তুলে ভেসে ওঠে বলেই বোধহয়... কালেভদ্রে কোনো প্রবল ঠিক সেই ভুলেদের বিরুদ্ধে লড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ভুলের অন্ধকার আছে বলেই, আলোর প্রয়োজন এত বেশি করে অনুভব করি আমরা। ভুলগুলোই কখনও সেই আলোর জ্বালানী, আবার ভুলের ফুঁ দিয়েই সেই আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে কত বার! তবু যারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে ভালোবাসি, যে ওই আলোই সার কথা; তারা ভুলের অন্ধকারকেও অস্বীকার করতে পারিনি। সেই আঁধারকে সমীহ করেই বার বার আলোর অন্বেষণ করতে হয়। সেই আলোর আভাস না পাওয়া গেলে, কালক্রমে কম্পমান অথবা ক্ষীণ হয়ে এলেও ‘ক্ষুদ্র আমি’ আর তার কাছে-দূরে সবকিছু কেমন বিপন্ন মনে হয়। 


                                                                                                --- --- --- 


 আর তারপর... আশ্রমবাসিক পর্বের অপরাহ্নে, শোকাহত প্রাক্তন রাজ-দম্পতির সঙ্গে রাজমাতা (তখন নিশ্চিৎ রূপেই রাজমাতা) কুন্তীও বানপ্রস্থের পথে উদ্যত হলেন। পুত্রশোকে অর্ধমৃত ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারীর পক্ষে উত্তর-যুদ্ধ কালে পাণ্ডবদের আস্ফালন অসহনীয় হয়ে ওঠায়, তাঁদের এই সিদ্ধান্ত অনুভব করা কঠিন নয়। কিন্তু একদা ‘পরদত্ত অন্নপিণ্ডের’ প্রতি বিরূপ কুন্তী তাঁর সুযোগ্য ক্ষত্রিয় পুত্রদের বিজয়ের রাজভোগ হজম করতে পারলেন না কেন? সে কি কর্ণ-বিয়োগের শোকে? নাকি দ্বিধায়? নাকি কুণ্ঠিত হয়ে? পেছনে ফিরে যখন যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়েছিলেন, সেই উত্তর হয়ত সেই দৃষ্টির মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন বিচক্ষণ ধর্মপুত্র, অন্দরমহলের সেই আখ্যান মহর্ষি ব্যাস সযত্নে আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে দিলেন।


আর তারপর... দাঙ্গাবিধ্বস্ত নোয়াখালীতে, ভাঙা কাচের টুকরো ছড়ানো মেঠোপথে খালি পায়ে এগোতে এগোতে,  এক 'মহাত্মা' কিছুতেই ভেবে পেলেন না-- কেমন করে এই বিপুল প্রাণহানী রোধ করবেন।


আর তারপর... দিল্লীর কোনও এক হরিজন কলোনীতে মাথা নিচু করে বসে সাতাত্তর বছরের সেই বৃদ্ধ, অসহ ভারে ঝুঁকে পড়া কাঁধ আর চোখের দৃষ্টি নিয়ে মাটির মেঝেতে আঁকিবুকি করে যাচ্ছেন...  উত্তর মিলছে না, অঙ্কটা যে ভাবে শুরু হয়েছিল... ধাপে ধাপে এসে এখন কেমন যেন হাতের বাইরে চলে গেছে... কোন ধাপে যে হিসেবের ভুল?! পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা বেজে উঠবে এখনই, ঠিক উত্তর কিছুতেই আর মেলানো হ’ল না। ঢং ঢং ঢং... বারো বার... মধ্য রাতের ঘন্টা... 

“At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps...”



[শ্রাবণ, ১৪২১]

 

আসন্ন সন্ধিক্ষণে

 

চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল



কটা পাহাড়ী রাস্তা, এঁকে-বেঁকে চলে গেছে নিজের মত। তার একদিকে ভেজা পাথুরে দেওয়াল, অন্যদিকে পাহাড়ী ঢাল, নেমে গেছে অনেকটা নীচে। তার তল দেখা যায় না। শুধু চোখে পড়ে সবুজ আর সবুজ... গভীর পার্বত্য অরণ্য। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে, কিছুক্ষণ পর চোখে পড়ল একটা ভেড়ার পাল। কেমন লাইন দিয়ে চলে যাচ্ছে, সেই পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে। কেউ কেউ থেমে পথের ধারের ঘাসে কিছুক্ষণ মুখ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গে কোনও মেষপালক চোখে পড়ল না। শুধু তাদের মতই সাদা মেঘের পাল তাদের সঙ্গে পাহাড়ের গা বেয়ে চলে যাচ্ছে।      

     তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে, এক জায়গায় চোখে পড়ল, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা সরু পথ নেমে গেছে জঙ্গলের ভেতরে। কী খেয়াল হল...  পাহাড়ী রাস্তা, মেঘেদের পাল ছেড়ে সেই অন্য রাস্তা দিয়ে নেমে গেলাম, জঙ্গলের কোলে। প্রথমে হালকা গাছপালা, তারপর গভীর জঙ্গল। অথচ গভীর জঙ্গলেও সেই সরু পথ কোথাও হারাল না, সেই পথকে অনুসরণ করেই নেমে যেতে লাগলাম। নামতে নামতে, একসময়ে খেয়ালই রইল না-- কোথা থেকে আসছি, কোথায় যাচ্ছি... শুধু ওই পথ বেয়ে নেমে যেতে থাকলাম, গভীর থেকে গভীরে। 

      হঠাৎ একসময়ে কানে এলো নানারকম পাখির ডাক। গাছের আড়ালে আড়ালে মনে হল অনেক পাখি... অথচ একটাকেও দেখতে পেলাম না। অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু একটাও পাখি দেখা গেল না। ডাক শুনে পাখি চিনে নেওয়ার মত ক্ষমতা নেই, কিন্তু কাছে দূরে ক্ষণে ক্ষণে অনেক রকম প্রজাতির পাখির ডাক যে শুনতে পারছি... তা স্পষ্টই বুঝতে পারলাম। আবার সেই সরু পথ ধরে নামতে লাগলাম। এবার সেই পাখির ডাকের সাথে মিশল একটা অন্য শব্দ... জল পড়ার বয়ে যাওয়ার শব্দ, যেন কোনও পাহাড়ী প্রস্রবণ। কোথায় সেই জলপ্রপাত? তার আওয়াজকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম, আরও বেশ খানিকটা পথ।  


     নীচে নামতে একসময়ে জঙ্গলের ঘনত্ব কমল কিছুটা, পাহাড়ের ঢাল কিছুটা সমতল মনে হল সেই জায়গায়... চোখে পড়ল সেই জলপ্রপাত। পাহাড়ের অনেকটা ওপর থেকে বর্ষায় পুষ্টিলাভ করা কোনও পাহাড়ী নদী ঝাঁপিয়ে পড়েছে জঙ্গলের বুকে। সেইখানে অরণ্যের চাঁদোয়া অতিক্রম করে আকাশ দেখা যায়, মেঘ ভেসে যায় ঝর্ণার ঝাঁপ দেওয়া জল ছুঁয়ে। আর, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি... নাম না জানা রঙিন পাখি, দল বেঁধে পাক খেয়ে উড়ে যায়। এমন দেখতে পাখি আগে কোথাও কখনও দেখিনি! 

      হঠাৎ চোখে পড়ল, একটি গাছের তলায় রক্তাম্বর পরে একজন বসে আছেন। তাঁর চোখ বন্ধ, মাথায় খুব ছোট ছোট চুল, মাথা ন্যাড়া করার পর চুল উঠলে যেমন হয়। হাত দু’টো সামনের দিকে কোলের ওপর রেখে গাছের তলায় পদ্মাসনে, ধ্যানে বসার মত। মুখের গড়ন নেপালী আদলের, গায়ের রঙ ফরসাই... তবে কেমন যেন পিতাভ। নেপালী হতেই পারেন, অথবা ভূটানের, কিংবা তিব্বতী?

     সেখানে পাখির ডাক আর জলপ্রপাতের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই... তাঁর চেহারায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কিছুক্ষণ ওইখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম, তাঁর দিকে চেয়ে। একই ভাবে চুপ করে বসে রইলেন, ধ্যানমগ্ন; কিন্তু দেখে মনে হ’ল আমার অস্তিত্ব তিনিও অনুভব করেছেন। অথচ চোখ খুললেন, এতটুকু বিচলিত হলেন না। যেন সচেতন ভাবেই অগ্রাহ্য করলেন আমার উপস্থিতি। নিজেকে হঠাৎই কেমন অবাঞ্ছিত মনে হল এই অরণ্য মাঝে।

     কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম কে জানে? হঠাৎ একটা গুরু গম্ভীর শব্দে চমকে উঠলাম। পাহাড়ের মাঝে, জঙ্গলের গভীরে, কোথা থেকে এই গুরু গম্ভীর ধ্বনি? সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই শব্দ! এক গম্ভীর ওমকার ধ্বনির মত। প্রথমে ভাবলাম ওই লাল কাপড় পড়া লোকটা বোধহয়... কিন্তু না, তাঁর চোখ বন্ধ, তিনি স্থির... তাঁর ঠোঁটও নড়েনি একটুও। তাঁর দিকে স্থির সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম-- এই বার সেই আওয়াজ এলে ঠিক বুঝতে পারব। কিছুক্ষণ পর আবার সেই আওয়াজ! জঙ্গলে, পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হওয়া গম্ভীর ওমকার... কিন্তু সেই মানুষটি তখনও নির্লিপ্ত ভাবেই বসে। ক্রমে মনে হল এই আওয়াজ মানুষের নয়... যেন পাহাড় নিজেই এখানে নিভৃতে ডাকে, গম্ভীর ওমকার ধ্বনিতে। আরও কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু আর সেই ধ্বনি কানে এলো না।

 

     এই প্রথম খেয়াল হল... এবার ফিরে যাই। কিন্তু যে সরু পথ ধরে নেমে এসেছিলাম, সেই পথ আর খুঁজেই পেলাম না কোথাও। পেছনে শুধু গভীর জঙ্গল... কোনও পথ নেই! তবু আন্দাজে ওপরদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কেন জানি না, মনে হল-- যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যেমন নেমেছিলাম... তেমন উঠে গেলেই আবার সেই রাস্তা পেয়ে যাব। সেই জঙ্গলের ফাঁকে নিজের পথ বানিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলাম ওপর দিকে। হঠাৎ মনে হল... কেউ যেন পিছু নিয়েছে। ফিরে দেখলাম-- পেছনে কেউ নেই, শুধু পাহাড়ী গাছের ভিড়। ভাবলাম মনের ভুল, আবার এগিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আবার মনে হল কেউ পেছন পেছন আসছে, পড়ে থাকা পাতার স্পষ্ট খসখস। আবার ফিরে চাইলাম, একেবারে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালাম পেছন দিকে... ফেলে আসা জঙ্গলের দিকে। এবারে দেখতে পেলাম তাকে, যে এতক্ষণ আমার পিছে পিছে আসছিল। আমার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। হালকা খয়েরীর ওপর কালো ডোরা কাটা, স্থির দৃষ্টি... একটি বা একজন পূর্ণবয়স্ক বাঘ। চোখের দৃষ্টিতে হিংস্রতা নেই, শান্ত... যেন এমনিই চেয়ে আছে। অদ্ভুত ব্যাপার... হয়ত ওইচোখের দৃষ্টি দেখেই আমার মনের মধ্যে কোনও আতঙ্ক জন্মল না। বেশ দূরত্ব বজায় রেখেই সে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু চোখ সরাল না... সে স্থির, তার দৃষ্টিও নিষ্পলক। 

     কিছুক্ষণ এক ভাবে তাকিয়ে থাকার পর সে ডেকে উঠল... তবে সেই ডাক বাঘের গর্জনের মত শোনাল না। এ সেই গম্ভীর ওমকার ধ্বনি, যা ঝর্ণার ধারে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম...পাহাড়ের ডাক। সেই ওমকার ধ্বনি শুনেই আবার খেয়াল হ’ল... দেরি হয়ে যাচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে ফিরে চাইলাম, দেখি জঙ্গলের মাঝেই আবার একটি পথ! সোজা পাহাড়ের গা বেয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে। অথচ একটু আগেও এমন কোনও পথ চোখে পড়েনি। আশ্চর্য হলেও, সেই পথকে অবিশ্বাস করলাম না। সেই পথ ধরেই ওপরে উঠে যেতে লাগলাম। যেতে যেতে যতবার পেছন ফিরে চাইলাম, দেখলাম সেই বাঘটি আমার পেছন পেছন আসছে। ততটাই দূরত্ব বজায় রেখে... দূরত্ব কমেওনি, বাড়েওনি। তার চোখের দৃষ্টিও একই রকম স্থির। বিস্ময় না অপ্রাকৃত, জানি না--  তখনও আমি কোনও রকম আতঙ্ক অনুভব করলাম না। একবারও মনে হল না -- ছুটে পালাই... এমন সাক্ষাৎ নিশ্চিৎ প্রাণ সংশয়! 


     সেই বাঘ আমার পিছু পিছু অনেক দূর অবধি এলো। অরণ্যের এক গভীরতা থেকে অন্য গভীরতায় চলে যাওয়া সেই আঁকাবাকা পাহাড়ী সংকীর্ণ পথ। তারপর পাহাড়ের অন্যত্র... তারপর জনবসতি... জনবহুল লোকালয়ের ভিড়ে... ইস্কুলের সিঁড়িতে, অফিসের করিডোরে... যেখানেই যাই, পেছন ফিরলেই দেখি সেই বাঘটা দাঁড়িয়ে আছে। চোখে একই রকম স্থির, শান্ত দৃষ্টি। আমাদের মাঝের দূরত্ব কমেওনি, বাড়েওনি। এক সময়ে এইভাবেই চলতে চলতে একটা মন্দিরের সামনে এসে পড়লাম। সেই মন্দিরটি আমি আগে কখনও দেখিনি, সেই মন্দিরে কোন দেবতা বা দেবীর আরাধনা হয়, তাও জানি না। সেই মন্দিরের সামনের চাতাল পেরিয়ে সিঁড়ির কয়েকটি ধাপ উঠেই দেখি সেখানেও সেই বাঘটা আমার পিছু নিয়েছে। তবে, এখানে তার পাশে আরও একটা লোক! তার একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কপালে লাল তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর পরনে গেরুয়া জোব্বার মত। লোকটাকে দেখে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হল... এক অব্যক্ত বিরক্তি আর রাগ! এতক্ষণে, বা এতদিনে কেবল এই বাঘের সান্নিধ্যে যে অভ্যেস হয়ে গেছিল, সেই স্থানে এই ব্যক্তির উপস্থিতিকেই মেনে নিতে পারলাম না। অযাচিত অনুপ্রবেশ, এক ঘোর অপছন্দের অনুভূতি পাক খেয়ে উঠল শরীরে।

            ওর দিকে তাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালাম। কোনো দুষ্টু জন্তুকে বাধা দিতে যেমন ভয় দেখানো হয়... সেভাবে বোধহয় চোখও পাকিয়েছিলাম। সেই লোকটা অমনি দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে দু-তিনবার ভেংচি কেটে পালিয়ে গেল। যেন, এযাত্রায় যাচ্ছে... একটু পরেই ফিরবে অন্যদের নিয়ে। তখন হিসেব বুঝে নেবে।

     কিন্তু বাঘটা কোথাও গেল না। সে আমার দিকে তাকিয়ে, দু’টো থাবা সামনে করে ওইখানেই বসে পড়ল। তারপর আবার ডাকল,সেই পরিচিত গম্ভীর ওমকার ধ্বনি। আর সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের ভেতর বেজে উঠল শঙ্খ। বাঘ আমার দিকে তাকিয়ে রইল একই ভাবে... তার দৃষ্টি স্থির, প্রাশান্তিময়, দিব্য। আমাদের মাঝের দূরত্ব ওই বাড়িয়ে দেওয়া থাবা দুটো কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে।




[শ্রাবণ, ১৪২০]


চোখের পাতায় জ্যোৎস্না - চোখের পাতায় রোদ


চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল





রাত ঠিক ক'টা, বুঝতে পারছি না। তবে ভালোই গভীর, রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে, নিঝুম। কোনও চার চাকা বা দু'চাকার দেখা নেই। দূরে কোথাও পাড়াতুতো কুকুররা একে ওকে ডাকছে। দু একজন এদিক ওদিক যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আমাকেও দূর থেকে দেখছে জুলজুল করে। রাস্তার আলো কম, এদিকটায় লাইটপোস্টের আলোগুলো খারাপ হয়ে গেছে বোধহয়। উলটোদিকে গলির মুখে একটা লাইটপোস্টের আলো জ্বলছে, সেই মধ্যবিত্ত আলোই খরচ হতে হতে এই রাস্তায় এসে মিলিয়ে গেছে। অন্ধকারে ওদের চোখ জ্বলে, কিন্তু সে জ্বলা কি আর টর্চের মত? ওরা আছে বুঝতে পারছি, আমি আছি ওরা বুঝতে পারছে। পাড়াটা নিঝুম, রাস্তায় লোক নেই... তবুও একটা ছোট দোকান তখনও খোলা। সেই দোকানের কমজোরি আলোর সামনের দিকে যতটা আলো করে রেখেছে, সেই দিকে এগিয়ে গেলাম। দোকানদার শান্তিকাকু, পরিচিত। এখনও দোকান খোলা রেখেছে কেন? শান্তিকাকুর দোকান তো এখানে নয়, সে দোকান তো আমার চেনা ! জিজ্ঞেস করতে কিছুই বলল না। শুধু বলল 'তোর কিছু লাগবে?' না... দোকানটা দেখার আগে অবধি আমার কোনও কিছুরই দরকার ছিল না। এত রাতে আমি রাস্তায় কী করছি, তাও স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু শান্তিকাকুর সামনে সাজানো কাচের বয়ামগুলো দেখে যেন দরকারগুলো জেগে উঠল। ওই বাবল-গামগুলো দরকার... যার সঙ্গে ফুটবল প্লেয়ারদের ছবিওয়ালা কার্ড দেয়! ওই চকোলেটগুলো দরকার... যার সঙ্গে এরোপ্লেনের ছবি থাকে! ওই চিউইং গামগুলো দরকার... যার সঙ্গে হিম্যান-স্কেলেটরের স্টিকার দেয়! কিন্তু টাকা নেই... টাকা তো বাবা দেয়। আমার কাছে টাকা থাকে না। সেই বয়ামটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, যেখানে ওয়ার্ল্ড কাপ বাবল-গামগুলো আছে, কিনলেই ফুটবলারের কার্ড। বয়ামগুলোর দিকে তাকিয়েই আছি... শান্তিকাকু গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
          হঠাৎ একটা বাদামী রঙের ঘোড়া দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল; অন্ততঃ ঐ দোকানের আলোয় বাদামী বলেই মনে হ'ল তার রঙ। খুব যে ছুটতে ছুটতে এলো তা নয়, হালকা গতিতেই... দুলকি চালে। ঘোড়ার ওপরে কেউ একটা বসে, কিন্তু আমার থেকে এতটাই ওপরে যে মাথা তুলে দেখতে গিয়ে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল, তবু তার মুখ অবধি দেখতে পেলাম না। বাদামী ঘোড়াটা একদম আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ঘামের গন্ধ পাচ্ছি। হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই কেমন শিউরে কেঁপে উঠল। আমি চমকে দোকানের দিকে পিছিয়ে এলাম। পিঠটা একটা টিনের পাতে খোঁচা খেল। লোকটা সিগারেট চাইল... চার্মস। শান্তিকাকু সিগারেটের প্যাকেটটা হাত বাড়িয়ে দিতে... সেটা নিয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। শান্তি কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম 'তুমি দাম চাইলে না?' শান্তিকাকু চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল সেই বাদামী ঘোড়ার অন্ধকারে মিশে যাওয়ার দিকে চেয়ে... তারপর ফোঁশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার আমাকে বলল 'তোর কিছু লাগবে?' আমি কিছু না বলে সোজা কাঁচের বয়ামের ঢাকনাটা খুলে ফেলালাম, ওয়ার্ল্ড কাপ বাবল-গাম! কিন্তু হাতে নিয়ে দেখি শুধু মোড়ক, ভেতরটা খালি। একটা একটা করে অনেকগুলো হাতড়ে বার করলাম বয়াম থেকে। সব খালি, সব মোড়ক। তারপর চকোলেটের বয়ামটা থেকে বার করতে গেলাম। সেখানেও সব মোড়ক। তারপর একের পর এক সব ক'টা বয়াম থেকে যা বার করছি সবই মোড়ক! ভেতরে কিচ্ছু নেই! সব খালি! ঘামছি, গলা শুকিয়ে গেছে। শান্তিকাকুকে বললাম - 'একি! সব তো খালি... ভেতরে তো কিছুই নেই!' শান্তিকাকু খিল খিল করে হেসে বলল 'হ্যাঁ! সব খালি... ভেতরে কিচ্ছু নেই! সব ভ্যানিশ হয়ে গেছে... ম্যাজিক!' আমার কেমন হঠাৎ ভয় করে উঠল। 'এত রাতে আমি একা একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি... বাড়িতে মা চিন্তা করছে... এখন আমার ঘুমনোর কথা...' এই চিন্তাগুলো একসাথে মাথার মধ্যে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। সেই বাদামী ঘোড়াটা আবার দোকানের সামনে ফিরে এসেছে। আবার আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে এসে। সারা রাস্তা ভরতি চকলেট আর চিউইং গামের মোড়ক ছড়ানো। সেই মোড়কগুলোর কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে... ফরররর; আর উড়ে উড়ে যাচ্ছে মোড়কগুলো। চারিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় উড়ছে। ঘোড়ার ওপর বসে থাকা লোকটা তার হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। তার হাতে একটা ডেয়ারি মিল্কের চকোলেট। 

      এবারেও তার মুখটা দেখতে পেলাম না। মাথা তুলে তার কাঁধের ওপরে দেখার চেষ্টা করলেই কেমন চোখের পাতা বুঁজে আসে, ঘুমে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমি চকোলেটের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শান্তিকাকু ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলল 'এই চকোলেটটা ঠিকঠাক। নিবি তো? কি রে? নিবি তো এটা?' শান্তিকাকু খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতেই থাকল। আর ওই হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাস্তার ওপর একটা ঝড় উঠল। ঘোড়ার নিঃশ্বাস থেকে ঝড়। কেমন গা শিরশির করে উঠল... হাত-পা অবশ হয়ে গেল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছি। রাস্তায় সব মোড়কগুলো পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছে। ঘোড়াটা ফরফর করে নিঃশ্বাস ফেলছে। শান্তিকাকুর হাসি আর থামে নয়া! লোকটা স্থির ভাবে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে... হাতে চকোলেট। আর আমি... আমি কিছুই করতে পারছি না। হাত-পা নড়ছে না। দাঁড়িয়ে আছি পাথরের মত।


--- --- ---

পোল্যান্ডের ভ্রৎস্লাভ-এ (Wroclaw) একদিন সকালে একটি দল অনেকজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করল-- 'আজকে সূর্যাস্তের আগে আপনার একটি স্বপ্ন থাকলে, সেটা কী?' স্বপ্ন - Dream ; এই শব্দটাই তারা ব্যবহার করল - 'What would be one dream before the sunset?' তাতে বালক থেকে বৃদ্ধ অনেকে অনেক রকম প্রতিক্রিয়া দেখালেন। কেউ কেউ ভেবে উঠতে পারলেন না একটি স্বপ্ন কী হ'তে পারে। কেউ কেউ বলল 'দিনের শেষে আমি খুশি থাকতে চাই'। একটি বাচ্চা ছেলে বলল ২০০ Zloty (পোলিশ মূদ্রা Zloty) পাওয়া তার স্বপ্ন; আর অপর একটি বাচ্চা ছেলে বলল এক মিলিয়ন Zloty! একজন মা বললেন তাঁর আজকের স্বপ্ন 'সন্তানের সুস্থ জীবন। কেউ বললেন 'আমার ক্যান্সারটা সেরে যাক', কেউ বললেন 'পৃথিবীতে বড় বেশি বেদনা, সেই বেদনা কমুক', আর একজন ভেজা চোখে, ধরা গলায় বললেন 'আমার সন্তানরা যেন আমাদের থেকে ভালো জীবন পায়।' এটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। এক একজনের উত্তর এবং প্রতিক্রিয়া সত্যিই মনে রাখার মত। 
            কিন্তু কথা হ'ল-- এখানে স্বপ্ন আছে... কিন্তু ঘুম নেই! এই মানুষগুলি স্বপ্ন দেখেন, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেন? বেঁচে থাকার এই কার্নিশের গায় বিন্দু বিন্দু জমে থাকা জলের ফোঁটার মত ইচ্ছে গুলোই কি স্বপ্ন নয়? জীবনের এক তৃতীয়াংশ ঘুমিয়ে কাটানোর যে সমীক্ষা, তা কি শুধুই নিষ্ফল নিদ্রা? নাকি জীবনের এই এক তৃতীয়াংশের মধ্যেই একটা অন্য জগতে বেঁচে থাকার অধ্যায়? কখনও নিজের ইচ্ছে মত, কখনও সেই বিবেকের তাড়া খেতে খেতে?!
কার্ল ইয়াং ঠিক এই জায়গাটাকেই ধরে বলছেন -
"Yet anyone who stops for a moment to recall a dream will be aware of this contrast , which is infact one of the main reasons why the ordinary person finds dreams so hard to understand . They do not make sense in terms of his normal waking experience , and therefore he is inclined either to disregard them or to confess that they baffle him ."
কিন্তু এই ঘুম থেকে উঠে স্বপ্ন মনে করার চেষ্টার থেকেও অনেক বড় পাওয়ার হাউস হয়ে মস্তিষ্কে থাকে-- জেগে থেকে ইচ্ছেগুলো দানা বেঁধে যে স্বপ্নের সৃষ্টি করে। ঠিক যেমন করে স্বপ্ন লালিত হচ্ছে উড়ালপুলের নিচে বসবাস করা তাঁবুর ভেতরে, যেমন স্বপ্ন লালিত হচ্ছে বাস্তারের মানুষগুলোর মনে, যেমন স্বপ্ন লালিত হচ্ছে ক্ষরাবিধ্বস্ত গ্রামের পরিবারগুলোর মনে। আবার সেই একই ভাবে স্বপ্ন বুনতে বুনতে হেঁচে যাচ্ছে পিঠে ব্যাগ নিয়ে একটা বাচ্চা মেয়ে, আর তার হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া তার মা। স্বপ্ন দেখতে দেখতে খবরের কাগজ বিলি করা আব্দুল কালাম। স্বপ্ন দেখতে দেখতে সকলের সমাদর পাওয়া অভিনেতা নওয়াজুদ্দিন সিদ্দকী। কাগজকুরুনির কাজ সেরে বইবাঁধানোর ঘরে স্বপ্ন দেখতে দেখতে গবেষক হয়ে ওঠা মাইকেল ফ্যারাডে।
            এই স্বপ্নের জগৎই কোথাও লুইস ক্যারলের 'Through the Looking-Glass', কোথাও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভূত পতরীর দেশে' ... আবার কোথাও জর্জ অরওয়েলের 'Nineteen Eighty-Four'। ঠিক এই পথেই স্বপ্ন হয়ে যায় নবারুণ ভট্টাচার্যের 'লুব্ধক' ।
পরলোক চর্চার সময় রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় পুত্র শমীন্দ্রনাথকে বার বার ডেকে যে 'শমীর পৃথিবী'র কথা শুনতেন, সেই পারলৌকিক অস্তিত্ব আসলে কী?
স্বপ্ন কোথাও ইউটোপিয়া, স্বপ্ন কোথাও যাদুবাস্তব... স্বপ্নই আসলে ইচ্ছে, ইচ্ছে... সব মনের ইচ্ছে, আর ইঁদুরকল থেকে পালানো।

--- --- ---


'Man and his Symbols' বইটিতে কার্লস ইয়াং এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন -
"The British author Robert Louis Stevenson had spent years looking for a story that would lit his "strong sense of man's double being, " when the plot of Dr. Jekyll and Mr.Hyde was suddenly revealed to him in a dream."

অবাক হওয়ার বোধহয় কিছু নেই, কারণ এমন স্বপ্নে পাওয়া অনুপ্রেরণা বা পরিকল্পনার কথা হয়ত প্রচুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন রসায়নিক যৌগ 'Buckminsterfullerene' আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও এমন স্বপ্নে পাওয়া 'আইডিয়া'র কথা প্রচলিত আছে। আবার এও প্রতিষ্ঠিত জনশ্রুতি-- রাণী রাসমণি স্বপ্নাদেশ পেয়েই দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের কাজ শুরু করেন। এমন অনেক রকম স্বপ্নের গল্প বা স্বপ্নাদেশের কথা কান পাতলে বাংলার জেলায় জেলায় শোনা যাবে (সবটা মিথ্যে বা বুজরুকি বলে উড়িয়ে দেওয়ার মানে দেখি না)। কিন্তু সবটাই কি স্বপ্নের মধ্যে 'ইউরেকা' বা 'ওরাক্‌ল'? নাকি এই মানুষগুলির চিন্তার একটা স্তর থেকে অবচেতন একটা চাদর সরে যায় এই ভাবে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে? হয়ত এই চিন্তাটা মনে ছিলই। ট্রানজিয়েণ্ট ভাবে এসেছিল, তাৎক্ষণিক ভাবে, অথবা অন্য কিছু দেখা বা শোনার মাধ্যমে ঝিনুকের মধ্যে সাগরের জল প্রবেশ করার মত ঢুকে গেছিল। কখন সেটা মুক্ত হয়ে গেছে সে জানেই না। সেই স্বপ্নটা এসে চিনিয়ে দিয়ে গেল, মুক্তটা থেকে গেছে মাথার ভেতরে। তাহ'লে... যে স্বপ্নকে, বা স্বপ্নগুলোকে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আমরা ভুলে যাই, বা মনের কোণে ফেলে রেখে দিই... কখনও ফ্রীজে রেখে দেওয়ার মত, কখনও ভাড়ার ঘর কিংবা চিলেকোঠায় তালাবন্ধ করে দেওয়ার মত, আবার কখনও গুমঘরে বন্ধ করে দেওয়ার মত; সেই স্বপ্নগুলোর মূল্য কী হ'ল? এইখানেই সিগমণ্ড ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণ ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়--
"To begin with, it happens that certain material appears in the dream-content which cannot be subsequently recognized, in the waking state, as being part of one's knowledge and experience. One remembers clearly enough having dreamed of the thing in question, but one cannot recall the actual experience or the time of its occurrence. The dreamer is therefore in the dark as to the source which the dream has tapped, and is even tempted to believe in an independent productive activity on the part of the dream, until, often long afterwards, a fresh episode restores the memory of that former experience, which had been given up for lost, and so reveals the source of the dream. One is therefore forced to admit that in the dream something was known and remembered that cannot be remembered in the waking state."

বিশ্বাস-অবিশ্বাস, গুরুত্ব দেওয়া বা না দেওয়া, অন্বেষণ করা কিংবা বিছানাতেই ফেলে দেওয়া-- এসব থাকেই, সেই অন্য একটা দিক। কিন্তু জেগে থেকে যে স্বপ্নগুলো নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে সেগুলোর সঙ্গেও বোধহয় এইভাবেই বিশ্বাস, গুরুত্ব বা অন্বেষণের একটা যোগসূত্র থাকে। সেই স্বপ্নের মধ্যেও থাকে পবিত্রতা, অথবা চূড়ান্ত অপরাধের বীজ। অনেক তত্ত্ব কথা আর থিওরির বাইরে এই বেঁচে থাকা আর জেগে থাকা স্বপ্নগুলোর স্বয়ম্ভূ অস্তিত্ব। এই নিয়ে চটজলদি কনক্লিউশনে আসা যায় না, আসার কথাও নয়। বরং এই স্বপ্ন ব্যাপারটাই চূড়ান্ত যাদু-বাস্তব উপস্থিতি, যেখানে দালির সৃষ্ট চিত্রর মত সময়কে গলে গলে পড়তে দেখা যায়। কিংবা রাসকিন বন্ডের গল্পে সেই কাটা ঘুড়িটার মত ভেসে বেরিয়ে যাওয়া যায় অন্য অনেকের নাগালের বাইরে। এই ভাসার মধ্যেই একটা রেফারেন্স ফ্রেম যার প্রকৃত শুরু আর শেষ নিজের আয়ত্ত এবং সাধ্যের বাইরে। একেবারেই বাইরে। যেমন আমার নিজেরও মাঝে মাঝেই মনে হয়, অনেকটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎ একদিন ঘুম ভেঙে দেখব বিছানায় মাথা ভারি হয়ে পড়ে আছি, চোখের পাতায় রোদ্দুর... অনেকটা বেলা হয়ে গেছে।


--- --- ---


ধাপে ধাপে অনেকটাই নীচে নেমে গেছে সিঁড়িগুলো, ওপরদিকের সিঁড়িগুলোতে শ্যাওলা, আগাছা... একটা দুটো বট-অশ্বত্থের চাড়াও চোখে পড়ে। আর একদম নীচের দিকের সিঁড়িগুলোতে ফাটল, ভাঙন। যেন নোনা ধরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। তবে জলে গিয়ে শেষ নয়, শেষ কাদা মাটিতে। সেইখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ধূধূ মাঠ। মাঠের ওপারে বেতের বেড়া, কলা গাছ, টিনের চালের ঘর। আর ঘন থেকে আরও ঘন সবুজ হয় যাওয়া গাছগাছালী। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনও মানুষের দেখা পেলাম না। একটা শুকনো হাওয়া বইছে, তার শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আকাশে অনেকটা ওপরে চিল চক্কর কাটছে। হয়ত মেঘগুলো জমাট বাঁধবে এবার। সূর্যের তেজ কেমন কম, অথচ অস্ত যেতে এখনও অনেক দেরি। বাতাসে মাঠের ধূলো উড়ছে। মাঠটা যেন একটু বেশিই বিস্তৃত... যতটা চওড়া, তার থেকে অনেক বেশি লম্বা। অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। যেন একটা বিশাল মাঠ বয়ে চলে গেছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মাঠের বুকে মাটি ফেটে গেছে, ঠিক যেমন কোনও ঝিল কিংবা ভেরির সব জল সুকিয়ে যাওয়ার পর তার কাদা মাটি ফেটে গেলে যেমন হয়। সেই ফাটল থেকেই ধোঁয়ার মত ধূলো উড়ছে, ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। আসতে আসতে যেন বাতাসের গতি বাড়ছে। ধূলোগুলোও মেঘের মত আকাশে উঠছে, সূর্য কে ঢেকে দিচ্ছে। কমে যাচ্ছে আলোর তেজ। আকাশে মেঘ না ধূলো ছেয়ে যাচ্ছে, বোঝা মুশকিল। এবার এখান থেকে যেতে হবে, কিন্তু যাব কোথায়? মাঠ পার হয়ে ওপারে চলে যাব? নাকি ফিরে যাব? সিঁড়ির ধাপে বসে পড়লাম ভাবতে ভাবতে। এই প্রথম মনে হ'ল... এটা ঠিক এমনি সিঁড়ি নয়, কোনও ঘাটের ধাপ। কোন ঘাট? এখানে জল কোথায়? কিছুই তো নেই!

হঠাৎই একটা লোক কোথা থেকে এসে এই সিঁড়ির ধাপে ধাপে নেমে যেতে লাগল মাঠের দিকে। বেশ খানিকটা নীচে নেমে যাওয়ার পর হঠাৎ পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। অচেনা মুখ, সাধারণ চেহারা। ফতুয়া আর লুঙ্গি পরা। মুখে গোঁফ, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হাতে একটা সবুজ-সাদা ডোরাকাটা নাইলনের ব্যাগ। আমাকে জিজ্ঞেস করল 'এখানে কোনও কাজ আছে?' আমি বললাম 'না'। তারপর জিজ্ঞেস করল 'তাইলে কি ওপারে যাবা?' আমি বললাম 'বুঝতে পারছি না'। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল 'আকাশের অবস্থা ভালা না... চলেন'। আমি সিঁড়ির ধাপটা থেকে আসতে আসতে উঠে পড়েছি ওর কথার উত্তর দিতে দিতে। বাতাসে ওর চুল উড়ছে। জিজ্ঞেস করলাম 'আচ্ছা, এই জায়গাটার নাম কি বলতে পারেন? এটা কেমন ঘাটের মত দেখতে... অথচ সামনে এমন ধূ ধূ মাঠ, ফাঁকা জমি...' লোকটা কেমন খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল, তারপর বলল, 'ও যবে ঘাট ছেল, তবে ছেল... এখন জল নাই, ঘাটও নাই।' আমি বললাম, 'জল মানে... নদী ছিল? শুকিয়ে গেছে?' লোকটা আবার খ্যাক খ্যাক করে হাসল, হাসতে হাসতে বসে পড়ল শেষ ধাপে। তারপর বলল, 'ইদিকে নতুন বুঝি? সে দেখেই বুজিচি!... হ্যাঁ, ঘাট ছেল, লোকে বলত 'বাবুঘাট'। নদী ছেল।' 'বাবুঘাট' নামটা শুনেই কেমন বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠল। এ বলে কী? নদি 'ছিলো'? ঘাট 'ছিলো'?
সেই লোকটা বলে চলল-- 'শহর ছেল... নদীর পারে টেরেন চলত, বিরিজ পার করে বড় ইস্টিশন ছেল... ' এই সব বলতে বলতে ডানদিকে হাত তুলে দেখালো। দূরে একটা ভেঙে পড়া ব্রীজের অবশেষ। ওপারে খানিকটা টিকে আছে, এপারে খানিকটা ঝুলছে... মাঝে সিঁদুরে মেঘ আর ধূলোয় ঢেকে থাকা আকাশকে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
শোঁ শোঁ করে তখনও একটানা হাওয়া দিচ্ছে। ধূলো উড়ছে। আকাশের রঙটা টকটকে লাল হয়ে গেল হঠাৎ, সেই রক্তাম্বর আভাতে আশেপাশে সব কিছুই রক্তিম। লোকটা সেই ফুটিফাটা মাঠ... না মাঠ নয়, শুকিয়ে যায় ভাগিরথীর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পলির ধূলোয় মিলিয়ে গেল। সেই দানবের পাঁজরের মত পড়ে থাকা ব্রীজের অবশেষের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনুভব করলাম... ঝড় এসে উড়িয়ে নিয়ে গেলেও, কিছুতেই এখান থেকে নড়া সম্ভব নয়, এক চুলও নড়া সম্ভব নয়।

 

[জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৪]




কোণ

 

চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল

 

একটা কোণ খুঁজে নেওয়া... যে যার মত, একটা নিজস্ব কোণ খুঁজে নেয়... নিতে চায়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও, কেমন সরতে সরতে একটা কোণের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যার পর আর সরা যায় না, দু'টো দেওয়ালের মাঝে একটা কোণ। আমরা, হ্যাঁ আমরাই সব এক একরকমের কোণের কারিগর। যতগুলো আমি, ততগুলো কোণ... হয়ত তার থেকেও বেশি। ঘরের কোণ, সিঁড়ির কোণ, আঁধার কোণ... সর্বত্র কোণ বানিয়ে রাখা। এমন কি মনেরও কোণ। গোপণ, নিবিড়, একলা আপন কোণ। মানসিক বাহ্যিক সব কিছু এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকার অবিনশ্বর রূপক যেন এই কোণ! 

 

     ঊষ্ণায়ণের রাতে, ভেসে চলা এক বিশাল হিমবাহর ওপর গারগয়েলের মত ঘাপটি মেরে বসে যদি চারপাশটা দেখি। তাহ’লে হয়ত চারিদিকে দেখব জল থই থই করছে। ঠিক আমার হিমবাহ’র মতই কাছে দূরে ভেসে থাকা হিমবাহ অল্প অল্প করে গলে যাচ্ছে, একটু একটু করে চিড় ধরছে তাদের এতদিন ধরে টিকে থাকা সাদা শরীরে। ফাটল বাড়তে বাড়তে হঠাৎ করে একটা বরফের চাঙড় ধসে পড়বে জলের ওপর। আরও একটু ওপরে উঠবে লবনাক্ত জলের স্তর। এই সিংহভাগ নিমজ্জিত হিমবাহ, এই দিগন্ত বিস্তৃত উদ্ধত জলরাশি আর অনন্ত রাতের অরোরা বোরিয়োলিসকে কোন জ্যামিতিক আকারে বাঁধা যায়, তা ভাবতে ভাবতেই পায়ের পাতা ছুঁয়ে নিল নোনা জল। এই হিমবাহও পুরোপুরি জলে মিশে যাবে, ফেটে চৌচির হবে তার সহস্রাব্দ প্রাচীন অহংকার, আমিও আবার ঠাঁই নাড়া হব ভেসে ভেসে। 

 

     কিছু কাঠকুটো জ্বালিয়ে হাড়-কাঁপুনি অন্ধকার রাতে আগুন জ্বালিয়েছিলাম। বুনো খরগোশের ঝলসানো দেহ আর আমার দু’টো হাত সেই একই আগুনের তাপে গরম হয়। ওটা মরেছে, আমি খাব বলেই মেরেছি। আর আমি বেঁচে, আমাকে কেউ ঝলসিয়ে খেতে চায়নি বলে। আগুন আছে, জলও আছে... আর সামান্য আত্মরক্ষার ব্যবস্থা... যতটুকু না হ’লেই নয়। শুধু নিজেকে দেখার কোনও উপায় নেই।

     আছে আছে... হাত, পা, পেট, বুক, ঘাড়, মাথা... ছুঁয়ে, টিপে, পরখ করে দেখে নিই... সবই আছে জায়গা মত... শুধু নিজের স্থির প্রতিবিম্বটা দেখতে পাওয়া ভার। তাই খালি মনে হয়... কিছু একটা নেই। সেই সকাল হ’লে কোনও নদীর অস্থির জলে নিজের আঁকাবাঁকা প্রতিবিম্বকে কিছুক্ষণ দেখতে পাব। দৃষ্টি যতই স্থির হোক, সে অবয়ব স্থির হবে না কোনওদিন। তবু, ওইটুকুই ভরসা ওইভাবেই তো আজও দেখতে পাই নিজেকে। অথচ নিজের সব কিছু ভুলে যদি ওই ঝলসানো খরগোশটা (সেও কি নিজেকে ওই একই নদীর জলে দেখতো জল খেতে খেতে?) কিংবা এই আগুনে পোড়া লালচে কাঠ, আর দূরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধিকিধিকি জ্বলা দাবানল রেখার দিকেও তাকিয়ে থাকি... সারা রাত খুঁজেও সেই কাঁটাতারের বেড়া খুঁজে পাব না, যাকে সভ্যতা অভয়ারণ্য বলে ডাকে।

      কিন্তু জানি, ওই পাহাড়েরই গায়ে, বা ওপারে... কোথাও কাঁটাতার ঘেরা সেই অভয়রাণ্য আছে ঠিকই। তার গণ্ডির মধ্যে সুখে বেঁচে আছে তারা, যারা দূরে জঙ্গলের আকাশে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখলেই ‘জল জল’ করে ছুটোছুটি করে। আমারও একটা ঘর আছে সেই গণ্ডির মাঝে, কোনও এক কোণে, যেখানে অনন্তকালব্যাপী হিসেব আর সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মাঝেই কাটিয়ে দেওয়া যায় আজীবন... ‘জল জল’ চেঁচিয়ে ছুটোছুটি করে।

 

     বোরা, চিনুক, কিম্বা হাবুব নয়... নিদেন পক্ষে শহরের লূ বা আঁধি সামলাতেও শরনার্থী হতে হয় স্থিতিশীল বরাভয়ের কাছে। একাধিক ডায়নামিক ফ্রেমের টানাপোড়েনে আমরা তো কেউই স্থবির নই। তাই এই ‘আমি’ আর ‘আমি’-র সৌরজগতে কোনওকিছুর তাত্ত্বিক ফয়সালা করে দেওয়াটা খুব মুশকিল। ঠিক যেমন থিসিস থাকে, তেমনই থাকে অ্যাণ্টি-থিসিস। যেমন ইয়ুফরিয়া আছে, তেমনই আছে ডিসফোরিয়া। যেমন ইউটোপিয়ার রঙধনু ওঠে, তেমনই ঘনিয়ে আসে ডিস্‌টোপিয়ার ক্যাটাসট্রফি।

     এত চেষ্টার পরেও সাধ করে খারাপ থাকতে কি কারও ভা্লো লাগে? হাজার প্রতিকূলতার মাঝেও তেমন কোটি কোটি অভয়ারণ্য, যে গণ্ডির এপারে নিজেকে গুটিয়ে রেখে রাতে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমনোর চেষ্টা করি। প্রকৃতি অথবা প্রাকৃতিক কোণও কিছু নয়, আমাদের প্রকৃতি-বিরোধী বিবর্তনের ধারাই বার বার সব জ্যামিতিকে পালটে পালটে আরও ধারালো, আরও নখর করে তুলেছে। বর্গক্ষেত্র ঘর, বর্গক্ষেত্র দাবার ছক, বর্গক্ষেত্র সাপলুডোর ঘর, বর্গক্ষেত্র খেলার মাঠ... পরিপাটি জ্যামিতির মাঝে কোণ কে একটা আলাদা জায়গা করে দেওয়া।

      ঈষাণ, নৈঋত, অগ্নি, বায়ু... বার বার  কোণ পালটেও গৃহস্থের উন্নত বাস্তুর স্বপ্ন পূরণ হয় না, তবুও হাল ছাড়তে নেই... কোণগুলো আরও ভা্লো করে একবার সাজানো যাক, যতটুকু পারা যায়! কোণ আছে বলেই আমরা কোণ-ঠাসা, কোণ আছে বলেই পিছু হটতে হটতে নিজের অজান্তেই হাতটা শরীরে পেছনে থাকা দু’টো দেওয়ালের সেই অংশকে খোঁজে, যেখানে দু’টো দেওয়াল সমকোণে এসে মেশে... সেই শেষ তারপর আর কিছু নেই।

      ভিড়ের মধ্যে কাঁধে কাঁধ ঘষে এগিয়ে যাওয়া প্রতিটা হৃদস্পন্দনের মধ্যেই এই ভাবে লালিত কোণগুলো রয়ে যায়। সেই কোণে সাজানো নানান রঙ, সেই কোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকা অন্ধকার, সেই কোণ গুপ্তধনের সিন্দুক, সেই কোণ কারও কারও অভয়ারণ্য। আসলে এই কোনটাই যে একমাত্র নিজের তৈরী করা সব থেকে সুরক্ষিত আশ্রয়! সেখান থেকে যে এখনও অভীষ্ট লক্ষ্যকে দেখা যায় (সে আপাতভাবে যত দূরেই থাকুক), পিঠ ঠেকে গেলেও... দেওয়ালে ভর দিয়েই ফিরে আসার চেষ্টা করা যায়।

      নিজস্ব এই কোণটাও যেন আমারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে বসে চুপ করে সবকিছু পর্যবক্ষেণ করা যায়, নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যায়, করা যায় অন্তর্দর্শন । ঠিক যেমন অলডাস্‌ হাক্সলে (Aldous Huxley) বলেছিলেন ‘There's only one corner of the universe you can be certain of improving, and that's your own self. 


[জ্যৈষ্ঠ, ১৪২০]

নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি