দুটি গদ্য -- সুধন্য সরকার


চিত্র -- সুধন্য সরকার



(১)


সোমনাথের মা বলল ; জানিস আমাদের ঘরে না; কোন জানলা নেই-- 

আলো-বাতাস আসে না!

একটা দরজা দিয়ে আসা-যাওয়া। 

একটা জানলা কাইট্যা দিবি? 

মুলিবাঁশের বেড়ার ঘর। টালির চাল। আর সোমনাথ আমার বাল্যবন্ধু। 

ময়া ময়া। একটু তোতলায়। সেবার দোলের সময় মরা মরা খেলতে গিয়ে শয়নদোলা থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে গেল ওর। 

কেউ জিজ্ঞেস করে বললে; হাত ভাঙলি কী করে? 

ও বলতো ; ময়া ময়া খ্যালতে গিয়া হাত ভ্যাইঙ্গা গ্যাছে।

ব্যস, সেই দিন থেকে ওর নাম ময়া ময়া হয়ে গেল।

পাড়ায় অনেক কাঠের কারখানা। আত্মীয় দাদারা কাজ করে সেখানে। আমরা আড্ডা দিই, গল্পগুজব করি।

সোমনাথের মা ভেবেছে আমরাও হয়তো কাঠের কাজ জানি। এবং এই কাজ করার জন্য কয়েকটি টাকাও দেবেন বলে জানালেন। 

আমরা বন্ধুরা তখন টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ক্যাম্বিস বল, রাবার ডিউস, ফুটবল কিনি চাঁদা দিয়ে। 

ম্যাচ খেলতে যাই এপাড়া ওপাড়ায়। 'হিজ মাস্টার' গেঞ্জি কারখানার অফিসে আসা আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ি মেজদার কাছ থেকে নিয়ে। খেলার খবরের সাথে সাথে বইয়ের বিজ্ঞাপনও পড়ি। 

তেমনই এক বিজ্ঞাপনে দেখলাম ' সুভাষ ঘরে ফেরে নাই ' বইটি। অনেক ছবি, অনেক লেখা। 

দাম সামান্য হলেও আমার কাছে অনেক! 

আমি নেতাজীর ভক্ত। মাঝে মাঝে তাঁর কথা, তাঁর বীরত্বের কথায় আমার চোখে জল চলে আসে।

সেদিন সোমনাথের মায়ের প্রস্তাবটা আমি গ্রহণ করেছিলাম।

একটা করাত, বাটালি আর হাতুড়ি নিয়ে এলাম বিমলদার কারখানা থেকে। কয়েকটা পেরেক। 

শুধুমাত্র একটা ইচ্ছার জন্য আমার অনভিজ্ঞ দুই হাত কাঠমিস্ত্রীর কাজ না জানা আমির উপর যেন বিশ্বকর্মা ভর করে ছিল সেদিন।

ঠুক্ ঠুক্ করতে করতে দেখলাম; নেতাজী বলছেন, 'দিল্লী চলো'। আজাদ হিন্দ বাহিনী এগিয়ে চলছে। সাঁজোয়া গাড়ি, কাঁদা পথ, জল-ঝড় ডিঙিয়ে চলছে তো চলছেই। 

একটা বিমান উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে পাখির মতো, কিছুটা গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ল। কারা যেন বলাবলি করতে লাগল; নেতাজী মারা গেলেন বিমান দুর্ঘটনায়!

বিশ্বাস করি না; বিশ্বাস করিনা!

পাখিটাকে যেন দেখি আবার মাথার উপর চক্কর কাটতে।

আমি পেরেছিলাম সোমনাথদের ঘরে আলো-বাতাসের পথ তৈরি করে দিতে। 

অন্ধকার ঘরটার আলো, যা আমি আজও ভুলতে পারিনি।




(২)


গতকাল মনটা এমনই দুঃখী হয়ে ছিল যে, কিছুই ভালো লাগছিল না। 

বিকেলের  দিকে বড় রাস্তাটা পেরিয়ে এক ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

মুখ তেতো। মাথাটা অস্থির। 

একটা শূন্য মানুষ যেন আমি!

মনে হচ্ছে আমাকে যেন কেউ দেখতেই পাচ্ছে না। 

যান-বাহন আর মানুষ, রাস্তার কুকুর সবই যেন আমার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। 

ইচ্ছে না থাকলেও পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে, এক হাতেই লাইটার ধরানোর চেষ্টা করলাম। দমকা এক হাওয়ায় আগুনের শিখাটা সরে এল ডানহাতের বুড়ো আঙুলের নখের নীচে। তীব্র একটা জ্বলুনি। 

অনেকগুলো ভেড়া নিয়ে তিন-চারটে বাচ্চা ছেলে রাস্তাটা পেরিয়ে এল। ট্রাফিক বন্ধ রইল। ভেড়াগুলোর গায়ে চিহ্নিতকরণ রঙের দাগ। 

বুড়ো আঙুলটা মুখের ভিতর ঢুকিয়ে চুষতে থাকলাম। নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। জ্বলুনিটা চলতেই থাকল। আঙুলের কায়দায় টোকা মেরে সিগারেটটাকে অনেক দূরে ছুঁড়ে ফেলেছি। গলাটা শুকিয়ে গেছে। 

জল, জল খেলে কি শান্ত হবে মন? 

ভাবতে ভাবতে কিছুটা এগিয়ে গেছি। ম্যাটাডোরের সাথে এক সাইকেল। হেলান দেওয়া। 

ক্যারিয়ারে বোঝাই ছাড়ানো পশুর চামড়া। চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। চামড়াগুলো যেন নড়ে উঠল। কথা বলে উঠল আমার সাথে।

বুড়ো আঙুলটা আরও তীব্র জ্বলুনিতে জ্বলে যাচ্ছে। 

লিখলাম...


'কীভাবে যেন একটু আগুনের ছোঁয়া গায়ে লাগল 

তীব্র জ্বালা, 

উপায় খুঁজতে গিয়ে 

মুখের লালায় ভিজিয়ে নিলাম শরীর। 

জ্বালা কমল না, যন্ত্রণাও না।


তুই জানিস, 

কত কিছুই তো আমি পারি না! 

ফস্ করে একদিন 

যদি হয়ে যাই অন্ধ,

গলা কেটে কথা বন্ধ।


ইরাবতী জানে 

শহরের পথে, মানুষের মুখে চোখে 


সে-ও কি পারে? 

জ্বালা যদি ধরে তারে;

কাছে এসে, দূরে থাকে। 


'পারব ' বলে ভুলে থাকে 

কী এক যন্ত্ররে...

আমরা! 


শহরের পথে পথে ব্যাধ আর কশাই মিলে

টেনে তোলে চামড়া।' 


                           ------


আমার বেঁচে থাকা যন্ত্রণাময় যেন

ফোন ধরলাম না, দিলাম না মেসেজের উত্তর। 

একি তোকে ভুলে থাকার প্রয়াস, চেষ্টা আর কসরত শুধু?

তুই পারলেও, আমি যে পারি না কিছু...


হে প্রিয়,

ফোন করিস, লিখিস মনের  কথা টুকু...


২৮/৫/২৫


5 comments:

  1. পড়ে খুব আনন্দ পেলাম ভাই জয়দীপ।

    ReplyDelete
  2. ভালো লাগল

    ReplyDelete
  3. সুন্দর...

    ReplyDelete

নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি