সুখমহল

 

Hallucination : Ryan Louder


চোখ খুলে দেখলাম, কোনও শক্ত মেঝেতে শুয়ে আছি চারপাশে তাকিয়ে বোঝা গেল না, ঠিক কোথায় মাথাটা ঝিমঝিম করছিল উঠে বসে চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম মনে একটা বড়ো বাড়ির ভেতর আছি, বাড়ি না বলে অট্টালিকা বলাই ভালো! চারিদিকে বড়ো বড়ো থাম, খড়খড়ি দেওয়া পুরনো কাঠের বড়ো বড়ো জানলা  খস-খস দিয়ে ঢাকা বিশাল লম্বা বারান্দায় শুধুমাত্র খসখসের ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো প্রবেশ করে, পরিমাণে সামান্য সেই আলো ভেতরটা কেমন আঁধারে ঢাকা, তবে চারপাশ দেখা যায় বাড়ির ভেতরের অবস্থা খারাপ না, দেখাশুনো করা হয় দেওয়ালের রঙ, চারিদিকে সব সেকেলে আসবাব ঠিক মত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় বলেই মনে খেয়াল যে তখনও মেঝেতেই বসে আছি, উঠে পড়ে হাঁটতে শুরু করলাম কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না - এই বাড়ির ভেতরে কী করে এলাম জোর করে মনে করার চেষ্টা করলেই মাথার ভেতর কষ্ট হচ্ছিল মনে বাড়ির দোতলা কিংবা তিনতলায় আছি নিজের মনে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দার দিকে এলাম, এই প্রথম লক্ষ করলাম যে বাড়িতে আমি একা নই (আশ্চর্যের বিষয়, এতক্ষণ মাথায় এই প্রশ্নটাই আসেনি যে এই বাড়িতে আর কে আছে!)  দেখলাম চারপাশে কিছু লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কেউ এদিক থেকে ওদিক হেঁটে চলে যাচ্ছে, কোথাও দু-তিনজন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে কথা বলছে

 

    তখন ঠিক টা বাজে বলতে পারি না, হাত ঘড়ি নেই, দেওয়ালেও কোনও ঘড়ি চোখে পড়ল না বাইরের যতটুকু আলো ভেতরে ঢুকছে, তা থেকে আন্দাজ করা যায় বিকেল বলে একজনকে  জিজ্ঞেস করলামটা বাজে?”, মনেই না সে আমাকে শুনতে পেল আমার অস্তিত্ব টের পেয়েছে বলেই মনে না নিজের মনে হেঁটে চলে গেল আর একজনের কাছে জনাতে চাইলামএটা কার বাড়ি বলতে পারেন?” সে এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল যেন খুব অসঙ্গত প্রশ্ন করে ফেলেছি তাদের দিক থেকে সরে এসে আবার চারিদিক ঘুরে দেখতে লাগলাম বারান্দা থেকে ভেতরে সরে এলে একটা সুদীর্ঘ করিডোরের মত জায়গা, একদিক থেকে আর একদিকে চলে গেছে... বিশাল লম্বা আমি সেখানেই পড়েছিলাম কিছুক্ষণ আগে বাইরে থেকে বাড়িটা কতটা বিশাল হতে পারে, তা আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম করিডোরের শুরুতেই একটা চওড়া সিঁড়ি, ওপর তলার দিকে চলে গেছে যেমন সিঁড়ি ওপরে উঠেছে, ঠিক তেমন নিচেও নেমে গেছে আর একটা সিঁড়ি(যেমন হয়ে থাকে, অস্বাভাবিক কিছু না) ওপরে ওঠার সিঁড়ির পর দেওয়াল শুরু... একদিকে একটানা দেওয়াল, অন্য দিকে কিছুটা দূরত্ব অন্তর একটা করে দরজা সামনে যেখানে করিডর শেষ হয়েছে, সে আসল শেষ নয়... সেখান থেকে পথ বাঁদিকে চলে গেছে সেখানেও একই রকম, কিছুটা পর পর একটা করে দরজা ঘরগুলো কোনওটা বন্ধ, কোনওটা খোলা কোনওটার দরজায় পর্দা আছে, কোনওটার নেই যেগুলোতে পর্দা নেই, তার ভেতরে লোক দেখা যায় কেউ পালঙ্কে বসে আছে, কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে, কেউ ইজিচেয়ারে দোল খাচ্ছে কেউই পরিচিত নয়, আর তারা বাইরের দিকেও তাকাচ্ছে না ইতিমধ্যে, যারা করিডোরে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, তাদের মধ্যে একজন বাঁদিকের দেওয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল! দোকানের শাটার পরার মত তার তিন দিকে শাটার পড়ে গেল(চতুর্থ দিকে দেওয়াল) কিছুক্ষণ পর যখন শাটার উঠল, তখন লোকটা নেই! করিডরের ছাদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম না কোথা থেকে শাটার এলো আর কোথায় বা গেল

 

    কী ঘটল বুঝতে পারলাম না, কিন্তু আমিও ওই একইভাবে দেওয়ালের কাছে দিয়ে দাঁড়ালাম এবারেও শাটার পড়ল কিন্তু একটা শাটারও আমার চারপাশে পড়ল না সব এলোমেলো ভাবে দূরে পড়ছিল... এদিক, ওদিক, ডাইনে, বাঁয়, যেখানে কেউ নেই একবারের জন্যও তিনটে শাটার একসাথে আমাকে ঘিরে ফেলল না হঠাৎ মনে এ কী পাগলামো করছি!” তৎক্ষণাৎ ছিটকে সরে এলাম সেখান থেকে সেই লোকটা মিলিয়ে গেল শাটার পড়ার পর, দেখেছিলাম... কিন্তু কোথায় গেলো জানি না... তবু কেন ওর মত করতে গেলাম কে জানে! আমি সরে আসার পরেও আরও তিন-চার জন এরকম করে গায়েব হয়ে গেল… একই কায়দায় চোখের সামনে এরকম তে দেখে আবার কৌতূহল ফিরে এলো একটা লোক দেওয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই আমি ছুটে গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম লোকটা আমাকে ওভাবে ছুটে আসতে দেখেও এতটুকু বিচলিত না এবারে ঠিক তিনটে শাটার নেমে এসে আমাদের ঘিরে ফেলল  দু-তিন সেকন্ড পরেই শাটার উঠে গেল দেখলাম যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি পাশের লোকটা এগিয়ে চলে গেল নির্বিকার ভাবে করিডোরের মাঝামাঝি এসে লোকটাকে আর দেখতে পেলাম না এই করিডোরটার সবকিছু একই রকম মনে হলেও বুঝতে পারলাম এটা আগের করিডোরটা নয়, কারণ এই করিডোরটা শেষ প্রান্তে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বাঁদিকের বদলে ডানদিকে বাঁক নিয়েছে মনে একটা লিফটের মধ্যে ছিলাম, একটা তলা থেকে অন্য তলায় এলাম... কিন্তু উঠলাম? না নামলাম

 

    আবার করিডোর ধরে সোজা হাঁটতে শুরু করলাম করিডোর যেখানে ডানদিকে বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটা ঘর, দরজা খোলা ঘরটায় ঢুকে পড়লাম  ঘরে চারজন বসেছিল... কেউ চেয়ারে, কেউ খাটের ওপর তাদের মধ্যে দুজন বিদেশী, লাল চুল, গোরা চামড়া... ‘পাক্কা সাহিব’! তাদের দিকে তাকিয়ে ইংরেজীতে জিজ্ঞাসা করলাম টা বাজে সাহেবদের মধ্যে একজন বিলিতি কায়দায় বললফোর থার্টি পি এইমঅন্য জন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইংরেজীতে বললকখন যে আবার ভোর বে!” তার সেই স্বগতোক্তির তাৎপর্য কিছু বুঝলাম না ঘরের জানলায় কাচ লাগানো  জানলা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম বাইরে মেঘলা... রোদ নেই, নাকি কাচটাই ওইরকম... কে জানে? সাহেবকে আবার জিজ্ঞেস করলামআপনি এখানেই থাকেন?” সে কেবল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল আবার প্রশ্ন করলামএই বাড়ি কি আপনার?” সে বললনা

-  ‘তাহলে কার?’

-   ‘নিশ্চিত জানি না

-   ‘আপনি কতদিন এখানে আছেন?’

-   ‘তাও খেয়াল নেই

-   ‘বাড়ির বাইরে যাওয়ার রাস্তা কোন দিকে?’

এইবার সে বেশ বিরক্ত হয়ে বললবেরিয়ে করব টা কী?’’

এই প্রথম আমার মনে আমিই বস এখানে এতক্ষণ কী করছি? আমার তো এখনই বেরিয়ে যাওয়া উচিৎ!” আবার প্রশ্ন করলামবাইরে বেরোব কোথা দিয়ে?’

কেউ উত্তর দিল না। অন্য একজন বলল–এখনও রাত তে অনেক দেরি

 

    সেই ঘর থেকে হতাশ হয়ে বেরিয়ে এলাম দেখলাম পাসে আর একটা ঘর, তারও দরজা খোলা ভেতরে পালঙ্কে একজন মহিলা শুয়ে আছেন একটা কালচে সবুজ রঙের শাড়ী; বালিশে হেলান দিয়ে, পাশ ফিরে... দরজার দিকে তাকিয়ে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে বলেও মনে হয় না, যেন পাথর বা মোমের মূর্তি ওঁকে দেখে মনে আগে কোথাও দেখেছি, কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে করতে পারলাম না ঘরের দরজার সামনে এসে ওঁকে ডাকলাম–শুনছেন?” ... তিনবার ডেকেও কোনও সারা পেলাম না পেছন থেকে এক মহিলা কণ্ঠ বলে উঠলউনি সারা দেবেন না... ওনার কথা বন্ধ হয়েছেঘরে ভেতর যাওয়ার জন্য পা বারাতেই আবার সেই মহিলা কণ্ঠ বলে উঠলউঁহু, যাবেন না ! তাহলে আপনিও আর কথা কইতে পারবেন না ওই ঘরে যারা থাকে, তারা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে” 

তাহলে উনি আছেন কেন ওই ঘরে?” বলে পেছন ফিরে তাকাতে কাউকে দেখতে পেলাম না ! গেল কোথায়? এই তো এখানেই ছিল! বেশ খানিকটা দূরে দেখলাম এক নারীমূর্তি, পায়ে নূপুরের শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে মাথায় ঘন কালো চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমেছে, পরনে নীল তাঁতের শাড়ি এতক্ষণ তারই কণ্ঠস্বর শুনছিলাম কিনা বুঝতে পারলাম না আর তাই যদি হয়, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে এত দূর গেল কী করে?

     সেই মহিলা সিঁড়ি ধরে ওপর দিকে উঠে গেল, আমিও পিছু নিলাম নিজের গতি বাড়িয়ে, প্রায় দৌড়ে তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলাম কেউ আমাকে দেখছে কি না, দেখলে কী ভাববে, সেসব মাথায় এলো না সিঁড়ি অবধি এসে দেখলাম সে তখনও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে আমি তার পেছনে চলতে চলতে একটা তলা ওপরে উঠে এলাম তখনও তার চেহারা দেখতে পেলাম না নূপুরের শব্দে সম্মোহিতের মত চলতে লাগলাম যতই দ্রুত চলার চেষ্টা করি, দূরত্ব একই থেকে গেল এমনভাবে একটা তলা ছাড়িয়ে আরও একটা তলায় চলে এলাম... কত ওপরে উঠেছি জানি না তবে সেই নারীমূর্তি আরও ওপরে উঠে চলল হঠাৎই নিজের পা একটা ধাপে রাখতে গিয়ে চমকে উঠলাম যেন এক গোলক-ধাঁধাঁ! সামনের সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গিয়ে ডান দিকে বেঁকেছে, তারপর খানিক দূর গিয়ে আবার নেমে গেছে নীচের তলার দিকে... মিশে গেছে সেই সিঁড়িতে, যে পথে আমি এসেছি এতদূর খুব পরিচিত একটা অপ্টিকাল ইলিউশনের ছবি! দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমি দেখলাম সেই মহিলা ঠিক ওপরতলার বারান্দায় হাঁটছে, কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর কোনও সিঁড়িই নেই! সারা গায়ে একটা শিহরণ অনুভব করলাম, সেই প্রথম মনে ভীতির সঞ্চার যে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠেছিলাম, সেইদিকে ছুটে নীচের দিকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করলাম একবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকানোর সাহস না নিশ্চিত জানি, যা কিছু ওপরে ফেলে এসেছি... এক এক করে সব কিছু শূন্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে! মুছে যাচ্ছে সব কিছু অন্ধকারে… শূন্যে। 

       কোনও ক্রমে আবার একটা করিডোরে এসে থামলাম তখন রীতিমত হাঁফাচ্ছি মনে যেন এখান থেকেই সেই স্ত্রীলোকের পিছু নিয়েছিলাম চারপাশটা আগের থেকে অন্ধকার মনে , যেন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে করিডোরে ফেরার পর কিছুটা ধাতস্থ লাগছে, তখন নিঃশ্বাস জোরেই পড়ছে কিন্তু ভয়ের ভাব কমেছে কিছুটা পেছন ফিরে দেখলাম সিঁড়িটাও আছে ঠিক আগের মতই। কিন্তু যে অবাস্তবতা, আবার সেই করিডোরের শেষের দিকে চলা শুরু করলাম সেই সাহেবদের ঘরের সামনে এলাম, ঘরে কেউ নেই সিলিং ফ্যান এক ঘেয়ে শব্দ করে ঘুরে চলেছে একা একা হঠাৎ মনে পড়ল সেই মহিলার কথা, যিনি পালঙ্কে শুয়ে ছিলেন স্থবির হয়ে তার ঘরের দিকে তাকাতে দেখি সেখানে কোনও দরজা নেই... খালি দেওয়াল! চারপাশে যত দরজা সব হাট করে খোলা, কোনটাই সেই ঘরটা নয় কিছুতেই সেই ঘরটা খুঁজে পেলাম না... যে ঘরে গেলে মানুষ বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে!

 

    দেওয়ালের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠল সব হাল-আমলের আলো, তবে ছোট বড় নানা-মাপের ঝাড়বাতিও চোখে পড়ল কিছু কোথাও আলোর চমক তাক লাগিয়ে দেখে, আবার কোথাও কোনও রোশনাই নেই  আমি আবার আসতে আসতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম তবে আর ওপরে না উঠে নিচে নামার পথ ধরলাম মনে নিচে নামতে থাকলে হয়ত একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে গিয়ে পৌঁছব সেখান থেকেই আবার বাইরে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে নিচের তলায় এসে দেখলাম সেখানেও আলো জ্বলছে, তবে লোকজনের ভিড় আগের থেকে বেড়েছে মনে যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই ফিরে এসেছি এত লোক, কেউ না কেউ নিশ্চয় বাইরে যাবে, তার সাথেই রাস্তা খুঁজে নিতে পারব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে করিডোর ধরে চলে গেলাম সেই দিকে... যেখানে পথ বাঁদিকে  বাঁক খেয়েছে চারিদিকে লোকজনের ভিড় ক্রমবর্ধমান, অনেকে একসাথে কিছু বলছে... সুর করে দেখলাম দূরে কিছু মেয়ে ঝলমলে পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে  দূর থেকে সুন্দরী বলেই মনে সেই একটানা ধ্বনি সেদিক থেকেই ভেসে আসছে ক্রমে তাদের দিকে যত এগিয়ে যেতে যেতে, স্পষ্ট হয়ে উঠল তারা কী বলছে; তারা এক সাথে বলছেসুখ লে লে... সুখ লে লে’... একই কথা, বার বার কখনও এক সুরে, কখনও সুর পরিবর্তন করে, কখনও বিকৃত সুরে... অবিরাম বলে চলেছে তাদের কাছাকাছি এসে, তাদের হাসি হাসি মুখগুলোর দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, দূর থেকে কতটা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে এসেছি এত চড়া মেকআপ আর প্রসাধনীতেও জোর করে সুন্দরী বলতে হয় মানুষকে কুৎসিত ভাবতে নেই... কিন্তু এদের কিছুতেই সুন্দরী ভাবতে পারছি না কেন? সেখানে দাঁড়িয়ে বহুদিনের পরিচিত একটা দৃশ্য মনে পড়ে গেল এমনই ঝলমলে পোশাক পরে তারাও হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। এদের অতিক্রম করে কোথায় পৌঁছনো সম্ভব– মুহূর্তের এই চিন্তার মাঝেই সেখান থেকে কেউ বা কিছু একটা ঠেলে সরিয়ে দিল আমাকে  দেখলাম তখন সব ঘরের দরজাগুলো খুলে গেছে কোনও কোনও ঘরে কেউ দাঁড়ি-পাল্লা নিয়ে বসে আছে ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলল এটা সুখের বাজার মশায়... সুখ বিক্রি হয়... রাত বাড়বে, বেচা-কেনা বাড়বে... মাল ফেলুন, সুখ নিয়ে যান

 

    করিডোরের দরজাগুলো ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল... এক নম্বর দরজার জায়গায় দুনম্বর দরজা, দুনম্বর দরজার জায়গায় তিন নম্বর... এই ভাবে তারা ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে চলল চারপাশের লোকজন ব্যস্ত ভাবে হাঁটাচলা শুরু করেছে গলা উঁচিয়ে চিৎকার করছে কেউ কেউ আমাকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে গেল আমি অবাক হয়ে তখনও চলন্ত দরজার খেলা দেখছি ঘর সমেত, ঘরের বাসিন্দা সমেত দরজা চলে যাচ্ছে... অন্য দরজা, অন্য ঘর, অন্য বাসিন্দা তার জায়গা নিয়ে নিচ্ছে এরকম দরজা পালটাতে পালটাতে হঠাৎ সেই ঘর আমার সামনে এলো সেই নারী! তখনও একই ভাবে শুয়ে আছে পালঙ্কে... নির্নিমেষ করুণ দৃষ্টি, চেয়ে আছেন আমার দিকে চোখের পাতা যেন অল্প কেঁপে উঠল, এক বিন্দু অশ্রু চোখ থেকে গড়িয়ে তার গালে এসে পড়ল আর বেরিয়ে এলো এক গভীর দীর্ঘশ্বাস সেই দীর্ঘশ্বাস ঝড়ের মত সোঁ সোঁ শব্দ তুলে আমার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল তার সাথে কানে এলো নূপুরের শব্দ, এক পা এক পা করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে... আর এক টানা সুর করে কারা বলে চলেছেসুখ লে লে... সুখ লে লে...’ 

নিজের কানে হাত চাপা দিয়ে বসে পড়লাম মাটিতে বন্ধ করে নিলাম ঝাড়বাতির আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ! পরিস্থিতি ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠল... দুটো আঙুলের চাপে একটা পিঁপড়েকে পিষে ফেললে তার যেমন কষ্ট হয়

নতজানু হয়ে ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছি চোখ বন্ধ করে, দুহাতে কান চেপে…  অসহনীয় পীড়ায় কুঁকড়ে যাচ্ছি। তাও চাপা গুঞ্জনের মতো ভেসে আসছে, সমবেত নারীকণ্ঠের এক নির্দিষ্ট অসহ্য সুরে গেয়ে চলা– সুখ লে লে… সুখ লে লে… সুখ লে লে। 



[জ্যৈষ্ঠ, ১৪১৮]


নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি