| [Melancholy : Edvard Munch] |
নৈঃশব্দ্য আমার ভালো লাগেনি কোনওদিন। যখন ভিড়ে বিরক্ত হয়েছি, ভুঁইফোঁড় হিতৈষীরা কান ঝালাপালা করেছে... চেঁচিয়ে বলেছি একা থাকতে দে। না হ’লে পালিয়ে এসেছি ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কখনও কোনও বট বা অশ্বত্থর ছায়ায়... অথবা পরিত্যক্ত শ্মশানে, যেখানে আগে সতীদাহ হ’ত। সহমরণে মানুষ এখনও যায়, সব দহন কি আইন করে বন্ধ করা স্বম্ভব? সেই বট-অশ্বত্থর তলায়, বা শ্মশানের নিম গাছের নীচে বাস করে গভীর নির্জনতা। কিন্তু সেই নির্জনতা একাকিত্ব নয়... নৈঃশব্দ্য নয়। আমি আর আমার ছায়া, শুনেছি দূর থেকে ভেসে আসে ভবতারিনী কালী মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি। শুনেছি বটফল ঠোঁটে তিতির আর বটেরের কথোকথা। শুনেছি ঝিমনো দুপুরে ঘুঘু পাখির ডাক। আর যখন তাও নেই, তখন শুনেছি সেই পরিচিত শব্দ... ঢিপঢিপ, ঢিপঢিপ, ঢিপঢিপ। কিন্তু নৈঃশব্দ্য নয়, তা আমার ভালো লাগেনি কোনওদিন।
যে বটগাছ ছায়া দিত, তার খানিক দূর দিয়ে যেত একটা নদী, তার নাম জিজ্ঞেস করা আর হয়ে ওঠেনি। মানুষেরই দেওয়া কোনও নাম। সেই নদীর ঘাট একলা পড়ে থাকত, ওপারের দিকে চেয়ে। না, সারাদিন একলা নয়। খেয়া এসে ভিড়ত সকালে-সন্ধ্যায়। পড়ে পড়ে ঘুমোনো ধাপগুলোকে যেন হঠাৎ করেই দিনে দু’বার দাড়ি-মাঝিরা ঠ্যালা মেরে জাগিয়ে দিয়ে যেত। এপার থেকেই লোক যেত বেশি, ওপার হ’তে আর ক’জনই বা আসে। পারাপার করত গঞ্জের হাটে যাওয়া দোকানী, মন্দিরের ভক্ত, জেলেদের পরিবার... রহিম শেখ, হরে নাপ্তে, মন্দিরের বড়ো ভচ্চায্... আমিও পার হয়েছি কতবার। ঘাট ছেড়ে নৌকো এগিয়ে চললে... পেছনে পড়ে থাকা ঘাটের মানুষগুলো, পাড়ের গাছপালা, দোকানের ছাউনি, জেগে ওঠা সিঁড়ির ধাপগুলো, সব আসতে আসতে ছোটো হয়ে আসত... ছোটো, ছোটো... ক্রমে আরও ছোটো। শেষকালে এত ছোটো হয়ে যেত যে পেছনে তাকিয়ে থাকতে আর ইচ্ছে করত না, মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকাতাম। সেদিকটা চেনা নয়... চেনা লাগেনি কখনও। একই নদী পথে, একই চেনা বাঁকে... বার বার নতুন করে দেখেছি সামনের দিকে। সব দেখাই যেন প্রথম দেখা। এই দেখার মধ্যে কখন যে নৌকো একটা বাঁক নিয়ে ফেলত খেয়াল করতাম না। হঠাৎ পেছন ফিরে দেখতাম সেই পরিচিত ঘাট আর নেই, চোখের আড়ালে চলে গেছে। তবে, ওই চোখের আড়াল হওয়া নিয়ে বেশি ভাবিনি... ফিরে তো আসবই... অন্য কোনও নৌকোয়।
এই যাত্রারও একটা মজা আছে। আমি বসে আছি, আমার মতো আশেপাশে আরও অনেকে বসে আছে। কেউ নিজে থেকে এগিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু সব কটা বসে থাকা জড়বৎ জীবকে নিয়ে নৌকোটা এগিয়ে যাচ্ছে, একদিক থেকে আর একদিকে। আমরা স্থবির, তবুও আমরা যাত্রি... আমরা গন্তব্যের অপেক্ষা করি। ভালো লাগুক আর না লাগুক, বসে থাকতেই হবে। মাঝ দরিয়ায় নামাও যায় না, আর সকলে সাঁতারও জানে না। আর সাঁতার জানলেই বা ছাই কী উপকার হবে?... কতদূর যাবে সাঁতরে? সবসময় স্রোত অনুকূল হয় না। তবুও দেখেছি... মাঝে মাঝে এক-আধজন হঠাৎ নদীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ সাঁতরে যায়, কেউ ভেসে যায়... কেউ ডুবে যায়। কোনও সহযাত্রী গেল গেল করে ওঠে... কেউ বলে আপদ গেছে। যে স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায়, তার কথা ভেবে যাত্রায় বিলম্ব কেন? এই নৌকো হয়ত তার ভালো লাগেনি, এই সহযাত্রীদের হয়ত তার ভালো লাগেনি... সে হয়ত বুঝেছিল এই নৌকোর গন্তব্য আর তার গন্তব্য এক নয়। যদি পারে, সে নিজেই নিজের গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করুক... না হ’লে ভেসে যাক। আমরা বসে থাকব, অপেক্ষা করব... যে কূল কাছে মনে হবে, সেই দিকে চেয়ে বসে থাকব সবাই। ওই দাঁড়ি মাঝি দাঁড়ে একটা শেষ টান দিয়ে কাঠের তক্তাটা ঘাটের সিঁড়িতে না ফেলা অবধি ওই ভাবে বসে থাকবে সবাই। হয়ত কিছুক্ষণ... অথবা কয়েক ঘণ্টা... অথবা আরও বেশি... সকলের হাতে কি ঘড়ি থাকে?
আমারও এমন অনেকবার হয়েছে... এক জায়গায় যাব বলে উঠেছি, আর নৌকো নিয়ে গেছে অন্য কোথাও। খানিক দূর যাওয়ার পরেই বুজেছি, এ পথ আমার নয়। কিন্তু মাঝ দরিয়ায় ঝাঁপ দেওয়ার সাহস হয়নি কোনওদিন। অন্যদের লাফ দিতে দেখে মনে হয়েছে... আমিও চলে যাই ওদের সাথে... পেরে উঠিনি। আসলে আমি তো ওদের সাথে নয়। ওদের গন্তব্য আর আমার গন্তব্য যে এক হবে, এমনও তো কোনও কথা নেই। মাঝ দরিয়ায় হাবুডুবু খেলে, কেউ কারও ভরসা হয় না। তাই বসে থেকেছি, যে দিকে যাচ্ছি সে দিকে আমার যাওয়ার কথা ছিল না জেনেও বসে থেকেছি। সেখানে গেছি... থেকেছি, ফিরে এসেছি... আবার পারি দিয়েছি। কিন্তু মাঝপথে যাত্রা ত্যাগ করিনি... প্রতিকূল স্রোতে যখন ওই ঝাঁপ দেওয়া প্রাণগুলোকে হাবুডুবু খেতে দেখেছি, মোটেই ভালো লাগেনি। তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ত্যাগ করে ওই অনিশ্চয়তার ডাকে কেনই বা সারা দেব? অনিশ্চয়তা কি সেই ভাবে ডেকেছে?... অতল জলের আহ্বান কি চেয়েছে আমাকে বুকের মাঝে?
আমি নিজেই মাঝে মাঝে জলের কাছে ধরা দিয়েছি... তবে সে ঘাটের কাছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে... এক পা এক পা করে নীচে। প্রথমে পায়ের পাতায় জল ঠেকে... তারপর গোড়ালি ডুবে যায়, তারপর হাঁটু, কোমর... বুক... গলা। এক গলা জলে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন কেবল এই মাথাটাই আছে... বাঁকিটা মিশে গেছে নদীর জলে, জলে রঙ মেশার মত। ওই মাথাটাও নদীকে দিতে চেয়েছিলাম... মিশে যেতে চেয়েছিলাম নদীর রঙে। কিন্তু জলের নীচে মেঘ নেই, আকাশ নেই, কথা নেই, সুর নেই, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি নেই, পাখির ডাক নেই... এমনকি সেই চিরপরিচিত ঢিপঢিপ শব্দও ক্রমে নিস্তেজ হয়ে যায়। আভ্যন্তরীন পূর্ণ প্রতিফলন সকলের সহ্য হয়ে না... আভ্যন্তরীন অনেক কিছুই অসহ্য। আকাশ আবার মাথাটাকে টেনে বাইরে নিয়ে এসেছে... জলের ওপরে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে দেখেছি... দু’চোখ ভরে দেখেছি মাথার ওপর সব কিছু। পুরোটা মিশে যাওয়া হবে না। তবে ঘাটে যখন কেউ থাকে না, দুপুর নির্জনে, বা রাতের আঁধারে... তখন নদীর আদরে মিশে গেছি, কেবল মাথা জেগে থেকেছে... দেখেছে উড়ে যাওয়া সাদা বকের দল, সিঁদুরে মেঘ, অমল-ধবল পাল... সপ্তর্ষি মণ্ডল, সন্ধ্যার ধ্রুব তারা, শরতের জ্যোৎসনা... মেঘে ঢাকা তারা, তারা ঢাকা মেঘ। গভীর জলের মাছ হতে পারিনি... আমি যে পাখি হ’তে চেয়েছিলাম!
যখন ইচ্ছে হ’ল পাখি হওয়ার, ভাবলাম কোথায় উড়ব? মাটির কাছাকাছি... না আকাশের বুকে? বড়ো ডানায় ভর দিয়ে অনেকটা ওপর দিয়ে উড়তে পারলে, নীচের সব কিছু কত ছোটো দেখায়। আকাশের কাছে সবকিছুই ক্ষুদ্র, চিরকাল... আকাশের চোখে আমি সমস্ত কিছু ছোটো ছোটো হয়ে যেতে দেখব, দেখতে দেখতে আমিও আকাশ হব। আবার মনে হ’ত অত বড়ো আকাশে যত ওপরে উঠব, নীচ থেকে আমাকেও যে ততটাই ছোটো মনে হবে আকাশের বুকে... এক সময় ছোটো হতে হতে কেবল আকাশ থাকবে, আমি থাকব না। এভাবে হারিয়ে যাওয়া আমার পছন্দ নয়। ফিরে এসেছি মাটির কাছাকাছি, মাটিকে ছেড়ে আর যাইনি কখনও। আকাশ আকাশের বিশালতা নিয়ে থাকুক, আমি মন্দিরের চূড়োয় বসে সেই বিশালতা মাপব আজীবন। আবার মনে হয়েছে, যদি পাখি হই তাহলে কী রঙ বেছে নেব? পাখিরা কি রঙ চেনে? তাদের কি রঙ পছন্দ করে নেওয়ার অধিকার থাকে? নিজের রঙ তারা নিজেরা ঠিক করতে পারে? জন্মসূত্রে পাওয়া রঙই মেনে নিতে হবে। আমার পূর্বসূরীর রেখে যাওয়া রঙে আমি হ’ব নীল, সবুজ, ধূসর, সাদা কিংবা কালো... তাহলে আমার ইচ্ছের রঙের কি হ’ল? যদি সেই ইচ্ছেটার স্থান না থাকে, তা’হলে এই পাখি হওয়ার ইচ্ছেকেই বা মূল্য দেবে কে? মানুষ হয়ে জন্মেছি, সংস্কারের অস্থি-মজ্জায় সংশয় প্রবেশ করেছে কোন আদিম ক্ষণে। এই সংশয় নিয়ে পড়ে থেকেছি... বসে থেকেছি, চেয়ে থেকেছি। খেয়াল করিনি পাখি হওয়ার ইচ্ছেটাকে তা দিতে দিতে কখন দু’টো ডানা এসে গেছে পিঠে। যখন জানতে পারলাম, তখন আর ওড়ার সেই শক্তি নেই। কেবল গাছের ডালে ডালে, বা ওই মন্দিরের চূড়ো অবধি উঠতে পারি, সে তোমাদের নজরও ওই অবধি উঠতে পারে... তার জন্য কি ডানা লাগে?
এই দুর্বল জীর্ণ ডানা দু’টো একটা পরিহাস হয়ে রয়ে গেছে... এখন নদী ডাকে – “আয়... আয়”, আকাশ ডাকে – “আয়... আয়”, পাল তোলা নৌকোগুলো ডাক দিয়ে যায়। যদি মাঞ্জা বাঁধা ঘুঁড়ি হ’তাম তাহলে কেউ ধরে ভাসিয়ে দিতে পারত আকাশে, তার সুতোর টানে বাতাসে ভেসে থাকতাম কিছুক্ষণ, যতদূর সুতো যায় উঠে যেতাম। কিন্তু এখন কেউ যদি ধরে আকাশে উড়িয়ে দিতে চায় ... মুখ থুবরে পড়ব। আরও একটা আঘাত বাড়বে। আমি শুধু চেয়ে দেখি, ডানায় হাত বুলিয়ে নিজেকে শান্তনা দিই... একদিন উড়তে চেয়েছিলাম, ডানা ছিল না বলে পারিনি... আজ ডানা আছে, তাও উড়িব সে শকতি নাই...
* * *
‘ওহ! তুমি এখানে বসে আছ... আর সবাই তোমার জন্য ওদিকে অপেক্ষা করছে!’ আচমকা ধীরেনদার গলা শুনে চমকে উঠলাম। মনে হ’ল কেউ যেন টেনে নামিয়ে আনল আমায়। ধীরেনদা আমাকে প্রায় হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললেন ফেরি ঘাটের দিকে। গজগজ করতে লাগলেন ‘তুমি আর কথা বলার লোক পেলে না প্রমথেশ, শেষকালে ও-ই জুটল?’ আমি ওঁর সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে এগোতে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টায় বললাম ‘না... উনিই নিজে থেকেই একের পর এক... আপনি চেনেন বুঝি?’ ধীরেনদা একই ভাবে হনহন করে এগিয়ে যেতে যেতে বিরক্তি মেশানো গলায় বললেন ‘যত্তসব পাগলের আরত... ও ওইখানেই বসে থাকে... চেনা লোক কেউ কাছে ঘেঁষে না... অচেনা লোক পেলেই…’ পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখলাম, সেই মাঝবয়সী লোকটা গাছতলায় বসে তখনও আমাদের দিকেই চেয়ে আছে... পা দোলাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট তালে। দূর থেকেও তার ঠোঁটের কোনে একটা হাসি দেখতে পেলাম, যেন বলছে ‘আবার এসো’। আর পেছন ফিরে না তাকিয়ে সোজা ফেরি ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলাম, সেখানে সহানুভূতি আর সান্ত্বনা নিয়ে জীবনের অনেকটা পড়ে আছে।
No comments:
Post a Comment