খোঁজ -- শৈবাল চক্রবর্তী


চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল



"Life is a meandering journey and knowing, unknowingly we walk the eternal search for our subconscious - unfulfilled dream.


লোকটা রোজ সজলকে জ্বালাতে আসে। সন্ধ্যা ফুরিয়ে রাতের শাখা প্রশাখা বিস্তার শুরু হলেই সে আসে। ঘাড়ের উপর এসে নিঃশ্বাস ফেলে অথচ ওকে দেখা যায় না। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বকবক করে। মাথা খারাপ করে ছাড়ে। 

আসলে একটা পার্সেলের খোঁজ নিতে সে আসে। ওটা কাউকে পৌঁছে দেবার কথা ছিল কিন্তু সজল পারেনি। চেষ্টা যে করেনি তেমন নয় কিন্তু একটা পাকাপোক্ত ঠিকানা তো চাই। একটা ছাউনি বলা থাকলে খুঁজে নেওয়া যায় কিন্তু তেমন কিছু না থাকলে… তবু চেষ্টার ত্রুটি করেনি সে। গোড়াতে পার্সেলটায় একটা ঠিকানা ছিল। সেখানে ডেলিভারি করে দিয়েছিল কিন্তু সেই লোকটা তাকে এমনভাবে ধরল… না বলতে পারল না। ডেলিভারির রসিদে সই করে দিয়েই অদ্ভুত ফ্যাসফ্যাসে গলায় থমকে থমকে লোকটা বলেছিল, “আমার একটা কাজ করে দেবে ভাই? …শরীরটা ঠিক যাচ্ছে না… পার্সেলটা একজনের হাতে পৌঁছে দিতে হবে… আমার বোন।" সজল অবাক হয়। অদ্ভুত আবদার! লোকটা  থামেনি। ফের বলেছিল, "একটু খুঁজতে হবে হয়ত, অসুবিধা  ও’টুকুই… পারবে?” তারপর হাজার পাঁচেক টাকা আর একটুকরো কাগজ সজলের পকেটে গুঁজে দিয়ে তার ফের কিছু কথা, “কাগজে সব লেখা আছে… সময় সুযোগ মতো কাজটা কোরো, তাড়া নেই…” মরা মাছের মতো চোখ তুলে সজলের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠেছিল, “তুমি পারবে…ঠিক পারবে!”

স্বল্প আয়ের একটা ক্যুরিয়র সার্ভিসের চাকরি।   রাজি হওয়া ছাড়া আর কী বা করার ছিল? সেই যে পার্সেলটা গলায় ঝুলে গেল, আজও তার থেকে রেহাই মিলল না।  কিন্তু আর পারা যাচ্ছে না! আজ হোক বা কাল, যতদিন লাগে…এর একটা বিহিত করতেই হবে! কিছুদিন আগে লোকটার ঠিকানায় সে বলতে গিয়েছিল যে তারপক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয় কিন্তু গিয়ে দেখল দরজায় তালাচাবি। কেউ কিছু বলতে পারল না।  অথচ নিত্যদিন নালীছেঁদা স্বরের এই ঘ্যানঘ্যানানি আর সহ্য হচ্ছে না। তার নিজের তো কোনো বাঁধন নেই আর সে সবের আগুপিছু নিয়ে কোনো আফসোস মনে ঠাঁইও দেয় না। তবু কোনো কোনো দিন সত্যিই খুব একা লাগে। ওই ঘ্যানঘ্যানে স্বরটা  যেন সেইদিনগুলোতে আরও বেশি করে যেন পেয়ে বসে। 

ঘুম আর ঠিকঠাক হবে না তাই খানিকটা রাত বাকি থাকতেই সজল ওঠে, বেরিয়ে পড়ে। ফুরিয়ে আসা রাতের সড়ক ধরে হাঁটতে থাকে। এভাবে লাখো পা হেঁটে অনেক দূর চলে যেতে পারে সে কিন্তু এখন চলেছে রেলস্টেশনের পথে। চটকলপাড়া জুড়ে খুঁজে বেড়াবে একজনকে যার বাম কানের লতির পিছনে তিল, কপালের দু’পাশে ঝুমকোলতার মতো চুল, যে একদিন মোতি নামে এক ছোকরার সাথে ঘর ছেড়েছিল- যার ডাকনাম মনুয়া। এভাবে কি একটা কাঁচাবয়সের মেয়েকে খুঁজে বার করা যায়? এর আগেও তো গেছে তার খোঁজে। বজবজ, উলবেড়িয়া, সাঁকরাইল, ভদ্রেশ্বর, টিটাগড়, কোথায় নয়। আজ যেমন চলেছে কাঁকিনাড়া হয়ে নৈহাটি।  

আবার একটা নিষ্ফলা দিন পার হলো। ভোরের আগে বেরিয়ে সজল যখন হাঁটতে শুরু করেছিল, তখন হাওয়ায় একটা ঠান্ডা, জোলোভাব। যখন ট্রেনে চাপল, তখন মিহি জলকণারা বাতাস ভাসাচ্ছে। তারপর সারাদিন বৃষ্টি; কখনো হাল্কা, কখনো ঘন, অবিরাম একঘেয়ে কান্নার মতো। তারমধ্যে শহরতলির কাঁচা গলিপথ, বস্তির আনাচকানাচ ঘুরে খোঁজ করে যাওয়া, স্যাঁতস্যাতে শরীরটা যেন ঠাণ্ডা মেরে যেতে চায়। গিজগিজে চটকল এলাকাগুলো ঝিমিয়ে ন্যাতা। রাস্তার কুকুর বেড়ালগুলোও নিখোঁজ। 

সারাদিন যা হোক করে একটু চা-বিস্কুট, ঘুঘনি-রুটি পেটে পড়েছে। ভাত পেলে ভালো হতো কিন্তু ঝুপড়ি দোকানগুলোর ঝাঁপ ফেলা। চলার সাথে বেলা গড়ায়। দিনের আলো মরে গিয়ে ক্রমশ মজুরবস্তি, চুল্লুর ঠেক, পাশের বেশ্যাপল্লী আর গৃহস্থের বাসা, সব ব্রাশের একটা রঙের টানে যখন মিলেমিশে একাকার- ধূসর আঁধার, তখনও চলার শেষ নেই। এমন দিনে সন্ধ্যা হয় না। অন্ধকার, নির্জনতা আর ভিজে হাওয়া নিয়ে ঝুপ করে রাত নেমে আসে। 

ডাউন নৈহাটি-শিয়ালদা লোকালটা এবার ছেড়ে যাবে। এটা শেষ গাড়ি নয়, এরপর দুটো, শেষে শান্তিপুর লোকাল আছে। ক্লান্ত শরীরটাকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো কামরায় এনে আছড়ে ফেলল সজল। এলিয়ে বসল বটে কিন্তু বসার জায়গাগুলো সব সপসপে ভিজে। ফ্লুরোসেন্টের উজ্জ্বলতায় কামরাতে তখন মাত্র তিনজন যাত্রী। রাত কত কে জানে? সজলের হাতে ঘড়ি নেই। খিদে পেয়ে হারিয়ে গেছে। এবার ট্রেন ছাড়ার জন্য বসে থাকতে থাকতে হারানো খিদে আবার চাগিয়ে উঠতে চাইছে। পকেটে একটা কেক আর বিস্কুটের প্যাকেট আছে। এটুকুই জোগাড় করতে পেরেছিল। বিস্কুটের প্যাকেটটা বার করে ছিঁড়তে গিয়ে মনে হলো কেউ তাকে দেখছে। কামরায় তিনটে প্রাণী মধ্যে একজন সে নিজে। আর একজন তার দৃষ্টিপথের প্রায় বাইরে, পার্টিশন দেয়ালের দিকে, মাথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ওখানে সম্ভবত জল নেই। আর তৃতীয়জন এক মেয়ে। সামনের দুটো সারি পরে, বন্ধ জানালার ধারে সীটটায় ঈষৎ কোনাচেভাবে বসে আছে। তাই তো! মেয়েটি তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। এভাবে একজনের সপাট চাউনির সামনে অচেনা হলেও খাওয়া যায় না। সজল পারল না। অকপট, সোজা দৃষ্টি!  সজলের অস্বস্তি হয়। চোখ নামিয়ে নেয়। প্যাকেটটা ছেঁড়া হয়ে গেছে। কী করবে? মুখ তুলে আড়ষ্টভাবে তাকায়। মেয়েটা হাসে। সজল হাসিটা চেনে। খিদের ভাষা বোঝে। ছোট্ট শ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে বিস্কুটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দেয় আর অমনি ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে মেয়েটা খেতে শুরু করে। সামান্য সময় দাঁড়িয়ে সজল তার সীটের দিকে ফিরতেই মেয়েটা মুখ ভরতি বিস্কুট নিয়ে উঁ ঊঁ ঊঁ  আওয়াজ তোলে। পাশে বসতে ইশারা করে। সজলের ইতস্ততঃ ভাব দেখে হাত ধরে টেনে বসিয়ে দেয়…যেন অনেকদিনের চেনা। গলায় তার বিষ্কুট শুকিয়ে জমে। জলের বোতল বার করে। দু’ঢোক জল খায়। তারপর বিস্কুটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরে সজলকে বলে, “খাও… আরে নাও না, তোমারই তো জিনিস!” সজল চুপচাপ দুটো বিস্কুট তুলে নেয়। মেয়েটা জলের বোতলটাও এগিয়ে দেয়। এইসব কিছুর ফাঁকে ট্রেনটা নড়েচড়ে ওঠে। গন্তব্যে রওনা হয়ে যায়।

মেয়েটিকে দেখে সজল ভাবে, যে মনুয়াকে সে খুঁজে বেড়াচ্ছে, এ’ যদি সেই মেয়ে হয়, তাহলে কী ভালোই না হয়। এমন অবাককাণ্ড কতই তো হয়। এরও কাঁচা বয়েস। ছিপছিপে ধারালো চেহারা, যেমনটা নাকি মনুয়ার ছিল। ওর হাল্কা খয়েরি চোখ, কপালের দু’পাশে ঝুমকোলতার মতো কোঁকড়ানো চুল, ঈষৎ ফোলানো ঠোঁটের সাথে মনুয়ার কতটা মিল? ওর বাম কানের লতির পিছনে তিলটা আছে কি? 

ট্রেনটা দুটো স্টেশন পার হয়ে যায়। কেউ ওঠে না। দুর্যোগ ঘাড়ে নিয়ে এত রাতে জরুরি কারণ ছাড়া কেউ বেরুবে না, এটা জানা কথা। সজল ভাবে এবার সে কী করবে? 

“এই যে, থ্যাংকু!” মেয়েটা হাসছে। হাসিটা এখন উজ্জ্বল। সেও হাসার চেষ্টা করে। বাইরে হাওয়া আর বৃষ্টির দাপট বাড়ে। জানালা বন্ধ কিন্তু লোকাল  ট্রেনের আংশিক খোলা দরজা দিয়ে কাঁপন ধরানো হাওয়া ভিতরে এসে সশব্দে দাপাদাপি করতে থাকে। 

মেয়েটা আবার বলে, “সত্যি খুব খিদে পেয়েছিল।” সজল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে- চোখ আর গাল হাল্কা বসা, সিঁথির গোড়ায় কাটা চিহ্ন… সিঁদুরে দিব্বি ঢেকে যাবে আর কপালে কাচপোকা টিপ। 

উত্তরে বলে, “আমারও পেয়েছিল।”

 “তোমার কাছে আর কিছু নেই?”

সজল ডান পকেটে হাত গলিয়ে কেকটা বার করে আনে। চাপে খানিক চটকে গেছে। মেয়েটার চোখে আলো। হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নেয়। খুলে মুঠোয় ডেলা করে খানিকটা, বাকিটা ফেরত দিয়ে খেয়ে নেবার ইশারা করে। গাড়ি ছোটে। সজল ভাবে, নাম জিজ্ঞাসা করলে গায়ে পড়া ভাবতে পারে কিন্তু ওর নাম মনুয়া যদি হয়! 

মেয়েটা বলে ওঠে, “তুমি খেলে না?”

সজল মাথা নাড়ে, “নাহ, বিস্কুটে হয়ে গেছে… তুমি নাও।”

মেয়েটা নিঃসংকোচে হাত বাড়ায়। কিসমিসের দুটো টুকরো আলাদা করে তুলে নিয়ে চোখ বুজে খায়। সজল দেখে। কটকটে বেগুনী রঙের সিন্থেটিক সস্তার শাড়ি, কমলা রঙের ছোটো হাতা ব্লাউজ, হাতে প্লাস্টিকের চুড়ি, পায়ে রাবারের চটি, একটা শাড়ি দিয়ে বানানো ঝোলা কিংবা বোঁচকাও বলা যায়, সাথে নিয়ে এই মেয়ে এমন দুর্যোগে একা একা কোথায় চলেছে? ভাবনাগুলো ইতিউতি ছোটাছুটি করে। ট্রেনও তার গতিপথে ছুটতে থাকে স্টেশন ছাড়িয়ে আরেক স্টেশনে।

“তোমার নাম কী?”

সজল প্রথমে খেয়াল করেনি। ট্রেনের আওয়াজ আর ভাবনায় আটকে ছিল। মেয়েটি ওর হাঁটুতে হাত দিয়ে নাড়িয়ে দেয়।

“নাম?”

““আমি সজল। তুমি?”

“মনুয়া।! ওই নৈহাটি চটকল বস্তি আছে না? পাশেই থাকি।”

“তুমি মনুয়া!” সজল হাঁ করে থাকে। “তোমার নাম মনুয়া?  ঠিক বলছ?” একটু সামলে নিয়ে প্রশ্ন করে।

“অজীব লোক তো! নিজের নাম ভুল বলব? এত্ত অবাক হবার কী আছে? এই! …চেনো নাকি আমায়? এসেছ আমার কাছে আগে… ওই চটকল লাইনে?” একটু ডানদিকে, সজলের কাছের দিকে ঝুঁকে মেয়েটা কথাগুলো বলে। ট্রেনের শব্দ, হাওয়ার শব্দ এড়িয়ে শুনবে, শোনাবে বলে। 

সজলের অপ্রস্তুত লাগে, “নাহ আমি এক মনুয়ার কথা জানি তাকে খুঁজছি।”

“হাহ! সেই ভাবি, তুমি লোকটা একটু অন্য টাইপ আছো। সহী বাত! তুমি আমায় চিনবে কী করে?”

সজল কথা বলে না।

 “এ’ মনুয়া তোমার কে? গালফেরেণ্ড?”

এবার সজল না বোঝাতে মাথা নাড়ে। ভাবে মেয়েটাকে মোতির কথা জিজ্ঞাসা করবে কিনা। ও চটকল লাইনের কথা বলছিল না? মোতি তো চটকলে কাজ করত। মোতির সাথেই তো মনুয়া পালিয়েছিল। ফ্যাসফ্যাসে গলার লোকটা চিরকুটে মোতির কথা লিখে রেখেছে। মনস্থির করে উত্তর দেয়, “না না, সেসব কিছু না। কোনো মনুয়াকে আমি চিনি না। একজন দায়িত্ব দিয়েছে, ওকে খুঁজে একটা পার্সেল দেবার জন্য।” একটু থমকায় সজল, তারপর বলে, “তুমি কি মোতি বলে কাউকে চেনো?”

“আহ! এ’ মোতিটা আবার কে?”

“এই মোতির সাথে মনুয়া পালিয়েছিল। আমি অনেক  খুঁজেছি, পাইনি। আজ অন্তত মনুয়া নামে কাউকে পেলাম।” সজল ম্লান হাসে।

“অচ্ছা, তো ইয়ে হ্যায় স্টোরি! … হাঁ, মিল তো আছে। আমিও একজনের হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলাম… কিন্তু সে হারামি কোনো চটকলে কাজ করত না। ওর নাম মোতি  না।”

এই মেয়েটা সেই মনুয়া হতে পারে, নাও হতে পারে কিন্তু সজলের ওর ব্যাপার কেমন ধাঁধার মতো লাগে।

“আমি সেই মনুয়া? তোমার কী লাগছে?”

“জানি না!”

“অচ্ছা কী আছে পার্সেলে?”

“তাও জানি না।”

“তোমার কী লাভ?”

“কুরিয়ার ডেলিভারি করি। এক ক্লায়েন্টকে পার্সেলটা দিতে গেছিলাম। অনেক করে বলল তার বোনের হাতে পৌঁছে দিতে। কথা দিয়ে ফেলেছি।  কিছু টাকাও  দিয়েছে।”

“আরে বাহ! তাহলে এখন কী করবে?”

“তোমার কোনো দাদা আছে?”

“আছে।“

“সে কোথায় থাকে…কী করে… মানে…”

মেয়েটা মাথা নাড়ে। “জানি না! পাঁচ বছর আগে ঘর ছেড়েছি। শুয়োরের বাচ্চাটা আমাকে চুষে ছিবড়ে করে দিয়েছে! আমি ভাড়া খাটি আর ও পা নাচিয়ে হারামের পয়সায় খায়। ছোড়ো! এসব কথা শুনে কোনো লাভ নেই।”

“এই ঝড়জলের রাতে তুমি কী তাহলে…”

মেয়েটা বিষন্ন হাসে, “হাঁ গো জলবাবু, আমি পালাচ্ছি! যার সাথে পালিয়ে ছিলাম, তার থেকে পালাচ্ছি। আগেও চেষ্টা করেছি। হারামির বাচ্চাটা ঠিক ধরে এনেছে। চোরের মার দিয়েছে… এই দেখো!” সিঁথির কাটা দাগ দেখায়। “যার সিঁদুর দেবার কথা ছিল, বোতল দিয়ে…তবে মাল খেয়ে ছিল, ঠিক মতো মারতে পারেনি, হাল্কার উপর গেছে। আমিও শ্লা মেরেছি তলপেটে এক লাথি! ফেলাট একেবারে!” এক নি:শ্বাসে কথা বলে মেয়েটা হাঁফায়। চোখ ধ্বকধ্বক জ্বলে।

এরপর ওরা চুপ। ট্রেন চলার ধাতব আওয়াজ ওঠে শুধু। 

"কোথায় যাবে?" সজল একটু সহজ হবার চেষ্টা করে।

সজলের দিকে না তাকিয়েই মেয়ে মাথা নাড়ে। 

"শিয়ালদা পর্যন্ত না আগেই…?" সজল ফের জিজ্ঞাসা করে।

"জানি না! পালাতে পেরেছি, এটাই অনেক। লাস্ট স্টেশনে যাই, ফির দেখা যাবে।"

সজল অবাক হয় না। অনিশ্চিত জীবন মানুষকে কতটা বেপরোয়া করে তোলে, সে জানে। আরও অনিশ্চিতে ঝাঁপ দেওয়াটা একধরনের জুয়া খেলার মতো। এক-আধজনের বাজিমাত হয় ঠিকই কিন্তু  বাকিদের জন্য অপেক্ষা করে ঘেয়ো-কুকুরের জীবন। 

মেয়েটা তখন বাইরের দিকে তাকিয়ে। সেখানে আলো আর অন্ধকারের মধ্যে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা কিন্তু ওর মনের অন্ধকারে একটাই রঙ।

ওরা আবার কথা বলে। সে সব কথা ভিজে হাওয়ায় আরও নরম হয়ে যায়। সে কথা মামুলি হয়ত, কিছু বা জরুরি, কিছু কখনও কোথাও অব্যক্ত ছিল, কিছু কথা বলি বলি করে অনুচ্চারিতই থাকে। ওরা আবার চুপ করে। ট্রেনটা গতি বাড়িয়ে অনেকগুলো স্টেশন পার হয়ে যায়। মনুয়াকে খুঁজে পাওয়া গেলো কিনা সেটা এখন যতটা সজলকে দোলায়, তার চেয়ে বেশি ভাবায় মেয়েটার অনিশ্চয়তার কথা।

রাত কত, শিয়ালদা স্টেশনের ঘড়িতে দেখে না সজল। মনের ভিতর তার কাটাকুটি খেলা। দ্রুত পা চালায় আর মেয়েটাও পায়ে পায়ে এগোয় তার সাথে। স্টেশনের ভিতরটা ফাঁকা কিন্তু কংক্রিটের গাঁথনি, ছাদ, থাম, ডিসপ্লে-বোর্ড, আলো আর বিজ্ঞাপনের বাহার নির্জনতাকে কিছুটা সরিয়ে রাখে কিন্তু বাইরেটা তো তেমন নয়। খোলা আকাশ, ভাসতে থাকা গুঁড়ো জলের কণা আর সার দিয়ে ঝাঁপ ফেলা দোকান, সাথে বাড়ির বন্ধ দরজা-জানালা, নির্জনতা ছড়ায় পথের আঁকেবাঁকে। হাওয়া চলার শব্দ ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই। ওরাও কেউ কথা বলে না। বৈঠকখানা বাজারের রাস্তা ধরে সজল এগোয়। দিনেরবেলা মানুষের গা বাঁচিয়ে চলা যে পথে  মুশকিল, এই ভেজা ভারি রাতে সেই পথ তখন কল্পনাতীত নি:স্ব।

বাঁদিক ডানদিক পথ ঘুরে, টানা সোজা রাস্তা ধরে যখন একটা হাসপাতালকে ছাড়িয়ে ওরা আড়াআড়ি বড় রাস্তা পার হয়ে গলিপথে ঢোকে, তখন সজল কথা বলে।

"আমরা প্রায় এসে গেছি।" 

"রাতটুকু নিশ্চিন্তে কাটানো যাবে! বাইরে কোথাও পড়ে থাকলে কোনো হারামী এসে মাগনায় গায়ে হাত দিয়ে দিত!" মেয়েটা হাসে।

এবার যে গলিপথ বেয়ে ওদের চলা, প্রতিনিয়ত অন্তহীন মানুষের সেই পথে চলাচল। অসংখ্য সন্দিগ্ধ চোখের কৌতূহলী দৃষ্টির এদিক ওদিক উঁকিঝুঁকি আর দ্রুত পায়ে এলাকা পেরিয়ে যাবার প্রবণতা। সেকেলে বাড়ির নীচে সার দিয়ে দোকান, অবিরাম সাইকেল, স্কুটার, রিকশা আর মানুষের ছোটাছুটি। বাড়তে থাকা গয়নার কারবার জড়িয়ে, ছড়িয়ে পড়া এসিডের ঝাঁঝালো গন্ধ। সন্ধ্যা নামলে, আনাগোনা করা লোকজনের চেহারা এখানে পালটাতে থাকে। তখন অন্য গন্ধ, অন্য রূপ; দরজায় দরজায় লাস্যময়ী আহ্বান। রাত যত গড়ায় তত ঘন হয় মজলিস, বিবিধ গন্ধের মিশ্রণে ভারি হয়ে ওঠে বাতাস।

আজ এমন একটা রাত, এ'পথও শুনশান।  কিন্তু যারা অপেক্ষা করে, তাদের ক’জন এখনও দরজার আড়ালে কিম্বা জানালায় বসে। সজলদের দেখে কৌতূহলে কেউ কেউ আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আর ঠিক তখনই মেয়েটার গলার স্বর তীক্ষ্ণ হয়ে সজলের কানে বাজে, "এ কোথায় আনলে জলবাবু!" 

ওই প্রতিক্রিয়ায় সজল হকচকিয়ে যায় কিন্তু সামলে নেয়। "সব ঠিক আছে মনুয়া, ঘাবড়িও না,  চলে এসো… আমি…আমি  এ'পাড়াতেই থাকি।" 

কিন্তু মেয়েটা তখন ফুঁসছে- "নাহ! মরদ জাতটাই হারামি! তুমিও শ্লা একটা দালাল…তোমায় চিনতে বড় ভুল হয়ে গেছে!" ওই আলো আঁধারিতেও বোঝা যায়, মেয়েটার চোখজোড়া জ্বলছে।

যারা আড়াল ছেড়ে কাছে এগিয়ে এলো, ওদের তখন ভারি কৌতুহল। ওরা সজলকে চেনে। কারও রাগ বা অভিমান আছে ওর ওপর, কারও দুর্বলতা, কারও বা  মায়া, কারও স্নেহ। ওরা কেউ চায় রগড় দেখতে, কেউ চায় বুঝতে আর কেউ বা বুঝিয়ে সুজিয়ে সজলদের ঘরে পাঠাতে। এই বোঝাবুঝি পর্ব অবশেষে মিটলে সজল মেয়েটাকে নিয়ে তার বাসায় গেলো। বাসা মানে মাঝ উঠোনের চারদিক ঘেরা, পুরনো তিনবাড়ির নিচতলায়, বারো-দশ মাপের একটা ঘর।

"খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম"

"জানি"

"এমন একটা জায়গায় তোমার বাসা হবে…ভাবতে পারিনি।”

সজল হাসে, "বাপ কে ছিল জানি না তবে আমার মা এই ঘরে ভাড়া থাকত, ভাড়া খাটত! অকালে মরে যাবার পর এখন এই বাসাটুকু আছে।"

মেয়েটা মাথা নামিয়ে নেয়। সজল বলতে থাকে, "তুমি ঠিক ভেবেছ। ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। এখানে আমার মতো ছেলেরা হয় দালাল হয় নয় মস্তান কিম্বা দুটোই। আমি এই নিয়মের বাইরে গেলাম কিভাবে, জানি না। মা মরতে এরাই সব আমায় আগলে রেখেছে আর এই ঘরটার একটা টান! কেমন যেন শিকড় জন্মে গেছে।"

রাত আরও খানিক গড়িয়ে যায়। ঘরের শুকনো খাবার আর চৌকিতে পিঠটাকে টান করতে পারা, দুটোই ওদের কাছে বড়সড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে। কী অদ্ভুত! দু'জন অপরিচিত মানুষ, জীবনের আলাদা অভিকর্ষে যাদের যাপন, আজ একই বৃত্তে এসে পরিক্রমা করতে চায়। ওদের চোখে তাই ঘুম নেই কিন্তু মুখে কথা আছে। এই সময়ের ব্যপ্তিটুকু যে নির্দিষ্ট, সেটা ওরা হয়ত বুঝতে পারে।

"তুমি শেষপর্যন্ত কোথায় যাবে ভেবেছ?"

"হুঁউ"

"কোথায়?"

"সোনাগাছি"

লাফিয়ে উঠে বসে সজল। থমকায়। অসহিষ্ণু ভাবে জিজ্ঞেস করে "তাই যদি যাবে, এখানে অমন চেঁচিয়ে উঠলে কেন?"

মেয়েটা ফোঁস করে ওঠে, "আমি কোথায় যাবো, কী করব, সেটা আমার ইচ্ছে। অন্য কেউ সেটা ঠিক করবে নাকি?"

সজল বিড়বিড় করে, "নরক থেকে পালিয়ে নরকে যাবে?"

মেয়েটা এ'কথায় ভারি মজা পেল। একটু জোরেই হেসে উঠল- "এই শোয়াটুকু ছাড়া আর কিছুই পারি না গো। তবে এবার ভালোমন্দ যা কিছু, সব নিজের ইচ্ছেমত করতে চাই!

সজল চুপ করে থাকে। কী আর বলা যায়! 

"ফিল্মি ভেবে লাভ নেই গো জলবাবু। ওই চটকল লাইনে…সব শিয়াল কুকুরের মতো মুখ দিত। তার চেয়ে এটা ভালো। ওখানে আমার চেনা লোক আছে। ব্যবস্থা করে দেবে।" মেয়েটা বলতেই থাকে। ওর কেমন জোশ এসে গেছে। শরীরের উপর নিজের অধিকার নিয়ে, আপন শর্তে ভালো থাকা নিয়ে অঝোরে কথা বলতে থাকে। কিন্তু সজল আর শুনতে চায় না। মেয়েটা কি বোঝে না, শরীরের পুঁজিটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। বিয়োগের খেলা শুরু হবার আগেই সব যোগ সেরে ফেলতে পারে ক’'জন? ও কি পারবে?

রাতের অবশিষ্টটুকু ক্রমশঃ ফুরিয়ে আসতে থাকে। 

 সকালে এখন শুধু মেঘের সামিয়ানা। বৃষ্টি থেমে আছে। থমকে আছে সজল, নৈহাটির বেশ্যালয় থেকে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট হয়ে সোনাগাছি পর্যন্ত একটা ত্রিভুজের ঠিক মাঝখানে। এই মুহূর্তের সত্যিটা হলো ওরা দু'জনেই আবার পথে। আর একটু বাকি। তারপর মেয়েটি যে পথে যাবে, সজল ফিরবে তার বিপরীতে।

"আসি তাহলে?"

"সাবধানে যেও…"

"হুঁউ"

"যাহ!  ভুল হয়ে গেল!"

"কী হলো?"

"পার্সেলটা দেওয়া হলো না যে!"

"থাক ওটা! মনুয়াকে খোঁজাটা চলবে তাহলে।"

"আর খুঁজব না!"

"কেন? সেভাবে খুঁজলে  ভগওয়ানকেও পাওয়া যায়।"

"থাক!"

"হাল ছেড়ো না জলবাবু। কোনোদিন এভাবেই…  আমাদের দেখা হয়ে যাবে।"

মেয়েটাকে বাসে তুলে দেয় সজল। ধীরে হাত নাড়ে। বিনবিন করে কানের কাছে বাজে- “...দেখা হয়ে যাবে”। বাসের চাকা গড়ায়। দু'টি বৃত্তের মিশে যাওয়া আবর্তে চ্যুতিরেখা দৃশ্যমান হয়। সজলের আর জানা হয় না, মেয়েটার বাম কানের লতির পিছনে তিল আছে কিনা কিন্তু নিশ্চিতভাবে বোঝা হয়ে যায়, খোঁজাটাই তার কাজ। সেটাকে জারি রাখতে হবে।


['বৈঠকী কলম' এর ১৪৩০ পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত ]




ঔরঙ্গজেব সিরিজের কবিতাগুচ্ছ

   
 Summer Night by the Beach : Edvard Munch



ঔরঙ্গজেব - ১


আক্রান্ত বলেই হয়ত, এইভাবে

           পরাক্রম শান দিয়ে যাই

ক্ষতগুলোই পাথর, অমসৃণ নদীতট

ঘষে ঘষে ধারালো হয়--

ছায়ানট

সম্মুখে আরও ক'টা ধাপ;

কিস্‌মৎ।


আক্রান্ত বলেই হয়ত

       হাঁত কাপে না, যেমন কাঁপত আগে।

ছুটতে ছুটতে সেই

প্রান্তর থেকে অনেকটা দূরে চলে যাই

বিস্মৃত হই, সরে সরে সেই গিরি কন্দরে

              শরনার্থী শিবির আমার নয়।


পাঁজরে খোঁচা দেয় নিজেরই খোলা তলোয়ার

আত্মসমর্পণ করো-- নিঃশর্ত

আমি নিঃশর্তকে নিঃস্বার্থ শুনি বার বার

হাসি... আরও সশব্দে হাসি।





ঔরঙ্গজেব - ২


বর্মটা নিরেট ইস্পাত

কিংবা কালো পাথরের মতই দেখায়

নিরাপদ দূরত্ব থেকে

দীর্ঘ ব্যবধানের অসদ স্পর্শ

তা কি যথেষ্ট হতে পারে?


কাঁটার ফলাগুলো ভেতরেও বিঁধে বিঁধে থাকে।

ক্ষতদান, তাকেও যে শিল্প

জেনেছি 

একাধিক  যুদ্ধে, সে রণনীতি অন্যরকম

আজও ক্লান্ত হয়ে ক্ষতগুলোকে দেখতে দেখতে

পাশ ফিরে চোখ বুঁজি

ক্ষতগুলো সারা রাত চোখ মেলে দেখে। 







ঔরঙ্গজেব - ৩ 


জাফরির এপার থেকেই

সূর্য দেখতে শিখেছি দু'বেলা 


নতজানু হয়ে 

নিয়মের প্রার্থনাকাল

আমার বন্ধ চোখ, বিহ্বল হাত দু'টো 

দেখো 


মুষ্টিবদ্ধ দৃঢ়তা, যে মুহূর্তে শিথীল

সেই মুহূর্ত তোমার 

বাকি উপশিরায় স্রোত, লবনাক্ত

সে ভাবেই চিনে নিক লোকে

যেইভাবে চিনেছে কৃপাণ


রাত-রেখা উত্তাল হাওয়া 

রেত শিরশির 

বঞ্জর জমিন ছুঁয়ে যাওয়া আঁধির মতো

যেমন দেখেছি তাঁবুতে তাঁবুতে

যেমন কেঁপেছি শৈত্যে

বর্মটা খুলে রেখে পাশে

ক্রমশ সে কাঁপুনিও

ঘুমিয়েছে হয়ে অচেতন,

অসম যুদ্ধের পর; আমারই মতন


আবার সেই, 

রোদ্দুর মাখব বলেই আঁকড়ে থেকেছি

দু মু'ঠো বালি

সূর্য দেখেছি রোজ 

ঈশায় ফজরে 

সূর্য দেখেছি রোজ

দাহগ্রস্ত দুর্গের ছাদে 

চোখের সে জ্বালাতেই 

তুমি আছো জেনে

পলক ফেলিনি কোনওদিন।


[পৌষ, ১৪২০]





বান্ধবী সিরিজের কবিতাগুচ্ছ




Painting -- Edvard Munch





বান্ধবী ১

একটা পাসওয়ার্ড দখলের পর
ঝাঁপিয়ে পড়বে মুছে ফেলতে!
মুছেই চলবে রোজ—
রেসের ঘোড়ার মত দাঁত বের করে
হাঁফাতে হাঁফাতে মুছতে চাইবে
ভয়ের টুকরোগুলো।
কৃপণ বৃদ্ধের মত সন্দেহের চোখে
দেখবে প্রতিটা গোলাপের পাপড়ি।

অথচ নাগালের বাইরেও কত পাসওয়ার্ড
ঘুড়ি হয়ে আছে
উড়ছে, ভাসছে, দুলছে—
আকাশে, তারে, গাছের ডালে।

ওড়ার স্বাদ পেলে,
পাসওয়ার্ডও আর তুচ্ছ থাকে না।





বান্ধবী ২

কখনও ছাদ, কখনও বারান্দা;
হয়ত এমনই আরও অনেক কিছুর—
তিন ভাগ জল।
এও এক পৃথিবী চেনা!

শিশুর বিস্ময় আর বালিকার কৌতূহল;
দুলেছি ক্যালেন্ডারের মত।
খোলা জানলা, আর সিলিং ফ্যান
না থাকলে যে কী হত!

তারপর, কী ঠিক করলে?
অবশিষ্ট এক ভাগ—
সবটুকুই কি রুপোর সিঁদুর কৌটো হয়ে যাবে?






বান্ধবী ৩

নীল কাগজ,
খাম
অথবা কালি
এভাবেই ঈথার সমুদ্রে আসা যাওয়া।

প্রিয় ফুল অথবা রঙের প্রসঙ্গ ছাপিয়ে
বাড়ানো আঙুল, পেল নিমগ্ন চোখ।

খুচরো মুহূর্ত বিলিয়ে দাও—
বহুবর্ণ জল, ঢালো অসম পাত্রে।
অনুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখে রাখো—
একটা গভীর 'হয়ত'র ভেতর ডুবে যাক
আমার খামোখা আঁকিবুঁকি।

উদাসীন
প্রতিটা বীতশোক মেঘ—
তোমাকে দেখাল শুষ্ক পল্লব,
আর আমাকে ছোঁয়াল নিম শিশির।






বান্ধবী ৪

মায়াজাল
বাসন্তী অথবা কাঁচা হলুদ;
এটুকুই এনেছিল খিলখিল স্রোত
তার ওপর মায়াকাজল...
তিন ধাপের দীঘিও যে কত গভীর
গলা না জড়ালে
বিশ্বাসই হ'ত না কোনও দিন!

শ্যাওলা ধরা সিমেন্ট খসতে খসতে
তিনটে ধাপই মুছে গেল।
ফ্ল্যাট দেখতে আসা তোমার কাছের মানুষ
জানলই না—
তোমারই সেই ডুবতে চাওয়া নূপুর
ভিতের নীচে এখনো অপেক্ষায় আছে।






বান্ধবী ৫

একটা কাচের বয়াম ভাঙার স্মৃতি
আচারের মতই রোদে শুকিয়েছিল
অনেকগুলো দুপুর।
কারও জিভ ছোঁয়ার আগেই
ফেলে দিতে হ'ল;
কাচগুঁড়ো মিশেছিল, স্মৃতির শিরায়।
আপন ভালো বোঝা পাগল
অতটাও আপন ভোলা হবে কী করে?

ঘুমচোখে অবহেলা রোদ
স্বপ্নের কাচগুঁড়ো কড়কড় করে।
আর কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মৃতদেহ
ঝাঁট দিতে দিতে তুমি ভাবো—
এরাও কি জিভ ছুঁতে চেয়েছিল কোনওদিন...
আমারই মতন?

বেঁধা কাচ পিঠে নিয়ে
চিৎ হয়ে শুতে নেই সাজানো খাঁচায়,
ভালো থাকা, তুমি এভাবেই পাশ ফিরে শোও।




[মাঘ, ১৪২৫]




সুখমহল

 

Hallucination : Ryan Louder


চোখ খুলে দেখলাম, কোনও শক্ত মেঝেতে শুয়ে আছি চারপাশে তাকিয়ে বোঝা গেল না, ঠিক কোথায় মাথাটা ঝিমঝিম করছিল উঠে বসে চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম মনে একটা বড়ো বাড়ির ভেতর আছি, বাড়ি না বলে অট্টালিকা বলাই ভালো! চারিদিকে বড়ো বড়ো থাম, খড়খড়ি দেওয়া পুরনো কাঠের বড়ো বড়ো জানলা  খস-খস দিয়ে ঢাকা বিশাল লম্বা বারান্দায় শুধুমাত্র খসখসের ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো প্রবেশ করে, পরিমাণে সামান্য সেই আলো ভেতরটা কেমন আঁধারে ঢাকা, তবে চারপাশ দেখা যায় বাড়ির ভেতরের অবস্থা খারাপ না, দেখাশুনো করা হয় দেওয়ালের রঙ, চারিদিকে সব সেকেলে আসবাব ঠিক মত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় বলেই মনে খেয়াল যে তখনও মেঝেতেই বসে আছি, উঠে পড়ে হাঁটতে শুরু করলাম কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না - এই বাড়ির ভেতরে কী করে এলাম জোর করে মনে করার চেষ্টা করলেই মাথার ভেতর কষ্ট হচ্ছিল মনে বাড়ির দোতলা কিংবা তিনতলায় আছি নিজের মনে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দার দিকে এলাম, এই প্রথম লক্ষ করলাম যে বাড়িতে আমি একা নই (আশ্চর্যের বিষয়, এতক্ষণ মাথায় এই প্রশ্নটাই আসেনি যে এই বাড়িতে আর কে আছে!)  দেখলাম চারপাশে কিছু লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কেউ এদিক থেকে ওদিক হেঁটে চলে যাচ্ছে, কোথাও দু-তিনজন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে কথা বলছে

 

    তখন ঠিক টা বাজে বলতে পারি না, হাত ঘড়ি নেই, দেওয়ালেও কোনও ঘড়ি চোখে পড়ল না বাইরের যতটুকু আলো ভেতরে ঢুকছে, তা থেকে আন্দাজ করা যায় বিকেল বলে একজনকে  জিজ্ঞেস করলামটা বাজে?”, মনেই না সে আমাকে শুনতে পেল আমার অস্তিত্ব টের পেয়েছে বলেই মনে না নিজের মনে হেঁটে চলে গেল আর একজনের কাছে জনাতে চাইলামএটা কার বাড়ি বলতে পারেন?” সে এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল যেন খুব অসঙ্গত প্রশ্ন করে ফেলেছি তাদের দিক থেকে সরে এসে আবার চারিদিক ঘুরে দেখতে লাগলাম বারান্দা থেকে ভেতরে সরে এলে একটা সুদীর্ঘ করিডোরের মত জায়গা, একদিক থেকে আর একদিকে চলে গেছে... বিশাল লম্বা আমি সেখানেই পড়েছিলাম কিছুক্ষণ আগে বাইরে থেকে বাড়িটা কতটা বিশাল হতে পারে, তা আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম করিডোরের শুরুতেই একটা চওড়া সিঁড়ি, ওপর তলার দিকে চলে গেছে যেমন সিঁড়ি ওপরে উঠেছে, ঠিক তেমন নিচেও নেমে গেছে আর একটা সিঁড়ি(যেমন হয়ে থাকে, অস্বাভাবিক কিছু না) ওপরে ওঠার সিঁড়ির পর দেওয়াল শুরু... একদিকে একটানা দেওয়াল, অন্য দিকে কিছুটা দূরত্ব অন্তর একটা করে দরজা সামনে যেখানে করিডর শেষ হয়েছে, সে আসল শেষ নয়... সেখান থেকে পথ বাঁদিকে চলে গেছে সেখানেও একই রকম, কিছুটা পর পর একটা করে দরজা ঘরগুলো কোনওটা বন্ধ, কোনওটা খোলা কোনওটার দরজায় পর্দা আছে, কোনওটার নেই যেগুলোতে পর্দা নেই, তার ভেতরে লোক দেখা যায় কেউ পালঙ্কে বসে আছে, কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে, কেউ ইজিচেয়ারে দোল খাচ্ছে কেউই পরিচিত নয়, আর তারা বাইরের দিকেও তাকাচ্ছে না ইতিমধ্যে, যারা করিডোরে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, তাদের মধ্যে একজন বাঁদিকের দেওয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল! দোকানের শাটার পরার মত তার তিন দিকে শাটার পড়ে গেল(চতুর্থ দিকে দেওয়াল) কিছুক্ষণ পর যখন শাটার উঠল, তখন লোকটা নেই! করিডরের ছাদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম না কোথা থেকে শাটার এলো আর কোথায় বা গেল

 

    কী ঘটল বুঝতে পারলাম না, কিন্তু আমিও ওই একইভাবে দেওয়ালের কাছে দিয়ে দাঁড়ালাম এবারেও শাটার পড়ল কিন্তু একটা শাটারও আমার চারপাশে পড়ল না সব এলোমেলো ভাবে দূরে পড়ছিল... এদিক, ওদিক, ডাইনে, বাঁয়, যেখানে কেউ নেই একবারের জন্যও তিনটে শাটার একসাথে আমাকে ঘিরে ফেলল না হঠাৎ মনে এ কী পাগলামো করছি!” তৎক্ষণাৎ ছিটকে সরে এলাম সেখান থেকে সেই লোকটা মিলিয়ে গেল শাটার পড়ার পর, দেখেছিলাম... কিন্তু কোথায় গেলো জানি না... তবু কেন ওর মত করতে গেলাম কে জানে! আমি সরে আসার পরেও আরও তিন-চার জন এরকম করে গায়েব হয়ে গেল… একই কায়দায় চোখের সামনে এরকম তে দেখে আবার কৌতূহল ফিরে এলো একটা লোক দেওয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই আমি ছুটে গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম লোকটা আমাকে ওভাবে ছুটে আসতে দেখেও এতটুকু বিচলিত না এবারে ঠিক তিনটে শাটার নেমে এসে আমাদের ঘিরে ফেলল  দু-তিন সেকন্ড পরেই শাটার উঠে গেল দেখলাম যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি পাশের লোকটা এগিয়ে চলে গেল নির্বিকার ভাবে করিডোরের মাঝামাঝি এসে লোকটাকে আর দেখতে পেলাম না এই করিডোরটার সবকিছু একই রকম মনে হলেও বুঝতে পারলাম এটা আগের করিডোরটা নয়, কারণ এই করিডোরটা শেষ প্রান্তে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বাঁদিকের বদলে ডানদিকে বাঁক নিয়েছে মনে একটা লিফটের মধ্যে ছিলাম, একটা তলা থেকে অন্য তলায় এলাম... কিন্তু উঠলাম? না নামলাম

 

    আবার করিডোর ধরে সোজা হাঁটতে শুরু করলাম করিডোর যেখানে ডানদিকে বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটা ঘর, দরজা খোলা ঘরটায় ঢুকে পড়লাম  ঘরে চারজন বসেছিল... কেউ চেয়ারে, কেউ খাটের ওপর তাদের মধ্যে দুজন বিদেশী, লাল চুল, গোরা চামড়া... ‘পাক্কা সাহিব’! তাদের দিকে তাকিয়ে ইংরেজীতে জিজ্ঞাসা করলাম টা বাজে সাহেবদের মধ্যে একজন বিলিতি কায়দায় বললফোর থার্টি পি এইমঅন্য জন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইংরেজীতে বললকখন যে আবার ভোর বে!” তার সেই স্বগতোক্তির তাৎপর্য কিছু বুঝলাম না ঘরের জানলায় কাচ লাগানো  জানলা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম বাইরে মেঘলা... রোদ নেই, নাকি কাচটাই ওইরকম... কে জানে? সাহেবকে আবার জিজ্ঞেস করলামআপনি এখানেই থাকেন?” সে কেবল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল আবার প্রশ্ন করলামএই বাড়ি কি আপনার?” সে বললনা

-  ‘তাহলে কার?’

-   ‘নিশ্চিত জানি না

-   ‘আপনি কতদিন এখানে আছেন?’

-   ‘তাও খেয়াল নেই

-   ‘বাড়ির বাইরে যাওয়ার রাস্তা কোন দিকে?’

এইবার সে বেশ বিরক্ত হয়ে বললবেরিয়ে করব টা কী?’’

এই প্রথম আমার মনে আমিই বস এখানে এতক্ষণ কী করছি? আমার তো এখনই বেরিয়ে যাওয়া উচিৎ!” আবার প্রশ্ন করলামবাইরে বেরোব কোথা দিয়ে?’

কেউ উত্তর দিল না। অন্য একজন বলল–এখনও রাত তে অনেক দেরি

 

    সেই ঘর থেকে হতাশ হয়ে বেরিয়ে এলাম দেখলাম পাসে আর একটা ঘর, তারও দরজা খোলা ভেতরে পালঙ্কে একজন মহিলা শুয়ে আছেন একটা কালচে সবুজ রঙের শাড়ী; বালিশে হেলান দিয়ে, পাশ ফিরে... দরজার দিকে তাকিয়ে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে বলেও মনে হয় না, যেন পাথর বা মোমের মূর্তি ওঁকে দেখে মনে আগে কোথাও দেখেছি, কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে করতে পারলাম না ঘরের দরজার সামনে এসে ওঁকে ডাকলাম–শুনছেন?” ... তিনবার ডেকেও কোনও সারা পেলাম না পেছন থেকে এক মহিলা কণ্ঠ বলে উঠলউনি সারা দেবেন না... ওনার কথা বন্ধ হয়েছেঘরে ভেতর যাওয়ার জন্য পা বারাতেই আবার সেই মহিলা কণ্ঠ বলে উঠলউঁহু, যাবেন না ! তাহলে আপনিও আর কথা কইতে পারবেন না ওই ঘরে যারা থাকে, তারা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে” 

তাহলে উনি আছেন কেন ওই ঘরে?” বলে পেছন ফিরে তাকাতে কাউকে দেখতে পেলাম না ! গেল কোথায়? এই তো এখানেই ছিল! বেশ খানিকটা দূরে দেখলাম এক নারীমূর্তি, পায়ে নূপুরের শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে মাথায় ঘন কালো চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমেছে, পরনে নীল তাঁতের শাড়ি এতক্ষণ তারই কণ্ঠস্বর শুনছিলাম কিনা বুঝতে পারলাম না আর তাই যদি হয়, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে এত দূর গেল কী করে?

     সেই মহিলা সিঁড়ি ধরে ওপর দিকে উঠে গেল, আমিও পিছু নিলাম নিজের গতি বাড়িয়ে, প্রায় দৌড়ে তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলাম কেউ আমাকে দেখছে কি না, দেখলে কী ভাববে, সেসব মাথায় এলো না সিঁড়ি অবধি এসে দেখলাম সে তখনও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে আমি তার পেছনে চলতে চলতে একটা তলা ওপরে উঠে এলাম তখনও তার চেহারা দেখতে পেলাম না নূপুরের শব্দে সম্মোহিতের মত চলতে লাগলাম যতই দ্রুত চলার চেষ্টা করি, দূরত্ব একই থেকে গেল এমনভাবে একটা তলা ছাড়িয়ে আরও একটা তলায় চলে এলাম... কত ওপরে উঠেছি জানি না তবে সেই নারীমূর্তি আরও ওপরে উঠে চলল হঠাৎই নিজের পা একটা ধাপে রাখতে গিয়ে চমকে উঠলাম যেন এক গোলক-ধাঁধাঁ! সামনের সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গিয়ে ডান দিকে বেঁকেছে, তারপর খানিক দূর গিয়ে আবার নেমে গেছে নীচের তলার দিকে... মিশে গেছে সেই সিঁড়িতে, যে পথে আমি এসেছি এতদূর খুব পরিচিত একটা অপ্টিকাল ইলিউশনের ছবি! দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমি দেখলাম সেই মহিলা ঠিক ওপরতলার বারান্দায় হাঁটছে, কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর কোনও সিঁড়িই নেই! সারা গায়ে একটা শিহরণ অনুভব করলাম, সেই প্রথম মনে ভীতির সঞ্চার যে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠেছিলাম, সেইদিকে ছুটে নীচের দিকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করলাম একবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকানোর সাহস না নিশ্চিত জানি, যা কিছু ওপরে ফেলে এসেছি... এক এক করে সব কিছু শূন্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে! মুছে যাচ্ছে সব কিছু অন্ধকারে… শূন্যে। 

       কোনও ক্রমে আবার একটা করিডোরে এসে থামলাম তখন রীতিমত হাঁফাচ্ছি মনে যেন এখান থেকেই সেই স্ত্রীলোকের পিছু নিয়েছিলাম চারপাশটা আগের থেকে অন্ধকার মনে , যেন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে করিডোরে ফেরার পর কিছুটা ধাতস্থ লাগছে, তখন নিঃশ্বাস জোরেই পড়ছে কিন্তু ভয়ের ভাব কমেছে কিছুটা পেছন ফিরে দেখলাম সিঁড়িটাও আছে ঠিক আগের মতই। কিন্তু যে অবাস্তবতা, আবার সেই করিডোরের শেষের দিকে চলা শুরু করলাম সেই সাহেবদের ঘরের সামনে এলাম, ঘরে কেউ নেই সিলিং ফ্যান এক ঘেয়ে শব্দ করে ঘুরে চলেছে একা একা হঠাৎ মনে পড়ল সেই মহিলার কথা, যিনি পালঙ্কে শুয়ে ছিলেন স্থবির হয়ে তার ঘরের দিকে তাকাতে দেখি সেখানে কোনও দরজা নেই... খালি দেওয়াল! চারপাশে যত দরজা সব হাট করে খোলা, কোনটাই সেই ঘরটা নয় কিছুতেই সেই ঘরটা খুঁজে পেলাম না... যে ঘরে গেলে মানুষ বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে!

 

    দেওয়ালের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠল সব হাল-আমলের আলো, তবে ছোট বড় নানা-মাপের ঝাড়বাতিও চোখে পড়ল কিছু কোথাও আলোর চমক তাক লাগিয়ে দেখে, আবার কোথাও কোনও রোশনাই নেই  আমি আবার আসতে আসতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম তবে আর ওপরে না উঠে নিচে নামার পথ ধরলাম মনে নিচে নামতে থাকলে হয়ত একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে গিয়ে পৌঁছব সেখান থেকেই আবার বাইরে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে নিচের তলায় এসে দেখলাম সেখানেও আলো জ্বলছে, তবে লোকজনের ভিড় আগের থেকে বেড়েছে মনে যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই ফিরে এসেছি এত লোক, কেউ না কেউ নিশ্চয় বাইরে যাবে, তার সাথেই রাস্তা খুঁজে নিতে পারব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে করিডোর ধরে চলে গেলাম সেই দিকে... যেখানে পথ বাঁদিকে  বাঁক খেয়েছে চারিদিকে লোকজনের ভিড় ক্রমবর্ধমান, অনেকে একসাথে কিছু বলছে... সুর করে দেখলাম দূরে কিছু মেয়ে ঝলমলে পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে  দূর থেকে সুন্দরী বলেই মনে সেই একটানা ধ্বনি সেদিক থেকেই ভেসে আসছে ক্রমে তাদের দিকে যত এগিয়ে যেতে যেতে, স্পষ্ট হয়ে উঠল তারা কী বলছে; তারা এক সাথে বলছেসুখ লে লে... সুখ লে লে’... একই কথা, বার বার কখনও এক সুরে, কখনও সুর পরিবর্তন করে, কখনও বিকৃত সুরে... অবিরাম বলে চলেছে তাদের কাছাকাছি এসে, তাদের হাসি হাসি মুখগুলোর দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, দূর থেকে কতটা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে এসেছি এত চড়া মেকআপ আর প্রসাধনীতেও জোর করে সুন্দরী বলতে হয় মানুষকে কুৎসিত ভাবতে নেই... কিন্তু এদের কিছুতেই সুন্দরী ভাবতে পারছি না কেন? সেখানে দাঁড়িয়ে বহুদিনের পরিচিত একটা দৃশ্য মনে পড়ে গেল এমনই ঝলমলে পোশাক পরে তারাও হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। এদের অতিক্রম করে কোথায় পৌঁছনো সম্ভব– মুহূর্তের এই চিন্তার মাঝেই সেখান থেকে কেউ বা কিছু একটা ঠেলে সরিয়ে দিল আমাকে  দেখলাম তখন সব ঘরের দরজাগুলো খুলে গেছে কোনও কোনও ঘরে কেউ দাঁড়ি-পাল্লা নিয়ে বসে আছে ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলল এটা সুখের বাজার মশায়... সুখ বিক্রি হয়... রাত বাড়বে, বেচা-কেনা বাড়বে... মাল ফেলুন, সুখ নিয়ে যান

 

    করিডোরের দরজাগুলো ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল... এক নম্বর দরজার জায়গায় দুনম্বর দরজা, দুনম্বর দরজার জায়গায় তিন নম্বর... এই ভাবে তারা ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে চলল চারপাশের লোকজন ব্যস্ত ভাবে হাঁটাচলা শুরু করেছে গলা উঁচিয়ে চিৎকার করছে কেউ কেউ আমাকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে গেল আমি অবাক হয়ে তখনও চলন্ত দরজার খেলা দেখছি ঘর সমেত, ঘরের বাসিন্দা সমেত দরজা চলে যাচ্ছে... অন্য দরজা, অন্য ঘর, অন্য বাসিন্দা তার জায়গা নিয়ে নিচ্ছে এরকম দরজা পালটাতে পালটাতে হঠাৎ সেই ঘর আমার সামনে এলো সেই নারী! তখনও একই ভাবে শুয়ে আছে পালঙ্কে... নির্নিমেষ করুণ দৃষ্টি, চেয়ে আছেন আমার দিকে চোখের পাতা যেন অল্প কেঁপে উঠল, এক বিন্দু অশ্রু চোখ থেকে গড়িয়ে তার গালে এসে পড়ল আর বেরিয়ে এলো এক গভীর দীর্ঘশ্বাস সেই দীর্ঘশ্বাস ঝড়ের মত সোঁ সোঁ শব্দ তুলে আমার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল তার সাথে কানে এলো নূপুরের শব্দ, এক পা এক পা করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে... আর এক টানা সুর করে কারা বলে চলেছেসুখ লে লে... সুখ লে লে...’ 

নিজের কানে হাত চাপা দিয়ে বসে পড়লাম মাটিতে বন্ধ করে নিলাম ঝাড়বাতির আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ! পরিস্থিতি ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠল... দুটো আঙুলের চাপে একটা পিঁপড়েকে পিষে ফেললে তার যেমন কষ্ট হয়

নতজানু হয়ে ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছি চোখ বন্ধ করে, দুহাতে কান চেপে…  অসহনীয় পীড়ায় কুঁকড়ে যাচ্ছি। তাও চাপা গুঞ্জনের মতো ভেসে আসছে, সমবেত নারীকণ্ঠের এক নির্দিষ্ট অসহ্য সুরে গেয়ে চলা– সুখ লে লে… সুখ লে লে… সুখ লে লে। 



[জ্যৈষ্ঠ, ১৪১৮]


নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি