জখম

 

চিত্র ঋণ : আন্তর্জাল; শিল্পী : Barry Farley; চিত্রের নাম : Somewhere between Pain and Pleasure

গোলাপী মেঘগুলো একটু একটু করে গভীর নীলে মিশে যেতে যেতে হঠাৎই চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেল। বড়ো রাস্তায় আলো থাকলেও, গলির শিরা-উপশিরায় আলো কমে আসে দ্রুত, অন্ধকারও বেশি ঘন হয়। বাই-লেনের ভেতর পাড়ার ডাক্তারখানার সামনে তখনো ভিড়। ডায়গনোসিসের রিপোর্ট প্যাকেটের ভেতর থেকে নিজেদের আভাস জানান দিচ্ছে। চিন্তিত মুখে কেউ সহ্য করছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার বিরক্তি। অবশ্য আজকাল প্রায় সকলের হাতেই মোবাইল ফোন আর মুখে মাস্ক। মানুষ একে অপরের দিকে তাকায় না। যাতে কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়... তাই মোবাইলের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে থাকে। বাইকে হেলান দিয়ে এভাবে মোবাইলে আঙুল বুলোতে বুলোতেই একজন হঠাৎ বেসামাল হয়ে গেল। বাইকটা কোনো রকমে সামলে নিলেও, হেলমেটটা পড়ল পাশ দিয়ে যাওয়া একটা বেড়ালের ওপর। হেলমেটের ওপর দিয়ে গেল এ যাত্রায়... ডাক্তার তো আর পশুচিকিৎসক নয়!

পিঠে হেলমেটের আঘাতে চমকে উঠেই প্রায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সেখান থেকে কিছুটা দূরে সরে গেল বেড়ালটা। ভয় পেতে পেতে মানুষেরও অভ্যেস হয়ে যায়। দুর্বল শরীর... তবু রিফ্লেক্স ভালো। অবশ্য সংকটের গন্ধে অনেকেই এমন অনেক কিছু করে ফেলে, যা অন্য সময়ে পেরে ওঠে না। পিছতে পিছতে একদমে কোণ-ঠাসা বেড়াল হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে চিতাবাঘের মত। আততায়ী নিজেই সামলাতে পারবে না, যদি আক্রমণ আসে চোখ কিংবা গলা লক্ষ্য করে।
বেড়ালটা রাস্তার ধারে একটা পাঁচিলে লাফিয়ে উঠল। ডাক্তারের চেম্বারকে পেছনে রেখে এগিয়ে গেল সামনের ছোটো কালী মন্দিরের দিকে। এক বাড়ির পাঁচিল থেকে অন্য বাড়ির পাঁচিল। তারপর মন্দিরের সিঁড়ির কাছে লাফিয়ে নামল। এর পরেই এই গলি গিয়ে মিশেছে চওড়া রাস্তায়। ট্যাক্সি-ট্রাক চলাচল করা রাস্তা। নিরাপত্তা নেই, তবে ফুটপাথ আছে।

'আমি তো টাইম পাস... বল?'
গলি আর বড়ো রাস্তার সঙ্গমে ফুটপাথের ওপর একটা ফুচকা-গাড়ি। সেখানে হাতে শালপাতার বাটি নিয়ে একটি মেয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল। ছেলেটারও হাতে শালপাতার বাটি। সে কোনো উত্তর দিল না, ফুচকাওয়ালাকে ইশারা করল মেয়েটিকে আগে দিতে।
মেয়েটা একটা গোটা ফুচকা মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতেই কনুই দিয়ে ছেলেটিক গোঁতাতে গোঁতাতে বলল-- 'বল না... বল? টাইম পাস তো?!'
ছেলেটি এবারও কোনো উত্তর দিল না, ফুচকা দিয়ে মুখ-বন্ধ রেখে রাস্তার উলটোদিকে তাকিয়ে রইল। রাস্তার উলটো ফুটে একটা মা শীতলার মন্দির। শীতলা ঠিকই, কিন্তু লোকমুখে 'শেতলা'। সঙ্গে বড়োঠাকুরও আছেন। সন্ধ্যা-আরতি চলছে, একজন বিধবা বৃদ্ধা আর একজন ম্যাক্সি পরা মাঝবয়সী মহিলা গেটের বাইরে হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে। দু-তিনটে বাচ্চা সিঁড়ির ওপর বসে, মলিন পোষাক... লালচে চুল। আরতি শেষ হলে বাতাসা পায়। শীতলা মন্দিরের পাশের গলিটা সরু, অন্ধকারও। ছেলে-মেয়েগুলো ওই গলি থেকেই সম্ভবতঃ বেরিয়ে এসেছে। দুজন মহিলাও তাই। সন্ধ্যা আরতির শব্দ পেয়ে এক এক করে আরো দু-তিনজন মহিলা বেরিয়ে এল। দুটো সাদা-কমলা ছাপ কুকুরও।
গলির ভেতর থেকে বেরিয়া আসা মহিলাদের একজনের মুখে বড়ো রাস্তার আলো পড়তে বোঝা গেল, দুটো চোখ একরকম নয়। একটি চোখে দৃষ্টিহীন। কপালে-গালে ব্রণর দাগ। তারও পরনে ম্যাক্সি। কাঁধে একটা গামছা জড়ানো ওড়নার মত... বুকটা ঢেকে। সে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোর করল না। অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। যেদিক থেকে ট্যাক্সি আসছে, লরি আসছে। রাস্তার উলটোদিকে তাকিয়ে রইল-- যেদিকে সেই দুটি ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। সে এক অদ্ভুত ভাস্কর্যের মত ভঙ্গীমা! মন্দিরের দিকেই ফিরে আছে তার শরীর, অথচ সে নিজের মুখটা ফিরিয়ে রেখেছে সেই ছেলে-মেয়েদুটির দিকে। তার ডান হাতে ত্রিকোণ হয়ে কাঁধের কাছে ওড়নারূপী গামছাকে ছুঁয়ে, আর বাঁ হাত ত্রিকোণ হয়ে কোমের কাছে, হাতে ধরা একটা কমদামী মোবাইল ফোন। পুরনো, বহুব্যবহৃত, মলিনমুখ... এই মোবাইল ফোন।
হঠাৎ একটা কালো কুকুর পাশে এসে দাঁড়াল, কিছুক্ষণ বাঁ-হাতের গন্ধ নিয়ে দুপায়ে কোমর ধরে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। ভঙ্গি প্রায় অপরিবর্তিত, শুধু মুখ ফিরিয়ে কুকুরের দিয়ে চাইল সেই মহিলা। বাঁচোখে দৃষ্টিহীন... স্পষ্ট বোঝা যায়।
মন্দিরে তখন কাঁসর আর শাঁখ বাজছে। ধুনোর ধোঁয়া উড়ে বেরিয়ে আসছে রাস্তায়, গলিতে। চিরাচরিত অবহেলা আর অনিচ্ছাতেই সন্ধ্যারতি পাচ্ছে অন্য এক একচোখো দেবী।

কালো কুকুরটা কেমন উদাস দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে গেল বড়ো রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে তিনমাথার মোড়ের দিকে। সেখানে সব দোকান বন্ধ। ক্লাব বন্ধ। সাইকেল সারানোর দোকান বন্ধ। নিউ ইন্ডিয়া চিকেন সেন্টারের সামনে শুধু লোহার জাল-জাল খালি খাঁচাটা পড়ে আছে। ব্রয়লার মুরগীর সাদা পালক আঁটকে। হাওয়ায় উড়ছে। অনেক ভোজনরসিকেরও এমন মৃদু বাতাস বওয়া সন্ধ্যায় খাঁচায় আটকে থাকা পালক দেখলে মনটা হুহু করে ওঠে। হুহু হাওয়ায় মনের ভেতরের কোনো পালক উড়তে গিয়ে আটকে যায়। তারা খেতে ভালোবাসে... খিদে পেলে খায়... মারে-কাটে না। দু-তিন মাস অনেকে 'ওসব' খাওয়া বন্ধও করে। তারপর মনে হয় নিজেকেই ঠকাচ্ছে। তার ওপর এসবও অনেকের জীবিকা... 'গরীবের পেটে লাথি'। তবে শুধুমাত্র মুরগীই ব্রয়লারের হয় না, এই এক সমস্যা। আর মানুষই শুধু গরীব হয়, এ আর এক সমস্যা। কালো কুকুরটাকে কেউ দারিদ্র সীমার নীচে বলতে পারবে না, যদিও সেই সকালেই একবার তার খাওয়া হয়েছে। সকালের ফেলে দেওয়া ছাঁট-পালক তুলে আনার স্মৃতি নিয়ে তাকিয়ে আছে ফাঁকা খাঁচার দিকে। কুকুর আর গরীব এক-- এরকম কিছু তুলনা হচ্ছে জানলে অমানবিক স্টিকার মেরে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে মিডিয়া ট্রায়ালের বাজারে। মানুষের উপার্জন আর সঞ্চয়ের ক্ষমতা সীমিত। কুকুর উপার্জন বা সঞ্চয় করতেই জানে না। আর দুজনেরই... শিকারের অধিকার চলে গেছে অরণ্য ত্যাগ করার সময়ে। অবশ্য কে যে কাকে ত্যাগ করেছে, আর কে যে কাকে বহিষ্কার করেছে...

শহরতলিতে সন্ধ্যেনামা, রাত হওয়া... এসব বনভূমির মত জাদুময় নয়। অন্যরকম। আর এই আরোপিত জনশূন্যতায় আরোই অস্বাভাবিক।
তাই রাস্তার আলো থেকে অল্প দূরে কালো কুকুরের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও আলাদা করে কিছু মনে হয় না। বরং সে সচেতন থাকে... বড়ো গাড়ি, ধেয়ে আসা লরি কিংবা ট্রাক থেকে দূরে রাখতে হবে নিজেকে। বেখেয়ালে রাস্তের মাঝে হারিয়ে গেলে হবে না। গা ঝেড়ে সন্তর্পণে মাথা নীচু করে ফিরে আসে কালো কুকুর। ততক্ষণে যুবক-যুবতীর ফুচকা খাওয়া শেষ। তারা সাইকেল হাঁটাতে হাঁটাতে কুকুরটার পাশ দিয়েই চলে গেল তিনমাথার মোড় থেকে বাঁদিকে বাঁক নেওয়ার জন্য। না থেমেই ছেলেটা এক পলক ক্লাবের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, "নামটা দেখেছিস? বিনয় বাদল দীনেশ স্পোর্টিং!", মেয়েটা সে দিকে না তাকিয়ে বলল "হ্যাঁ জানি... আর সাইকেল রিপেয়ারিং-এর দোকানটার নাম আজাদ হিন্দ।"


সন্ধ্যা আরতির পালা শেষ। ঘণ্টা, কাঁসর আর শাঁখের শব্দ হঠাৎ থেমে গেলে একটা নিস্তব্ধতা লাফ দিয়ে নামে... আর কারো কারো কানের ভেতর চিঁইইই করে শব্দ হয় কিছুক্ষণ। ধুনোর ধোঁয়া ভেসে থাকে আরো কিছুক্ষণ। ধূপ-ধুনোর গন্ধ ভেসে থাকে আরো অনেকক্ষণ। আরতি থামতে কুকুর ফিরে এল। একচক্ষু দেবী মুদ্রাভঙ্গ করে স্বাভাবিক হলেন। হালকা বাতাসে উড়ছে পৃথুলা দেবীর ম্যাক্সির ঘের। কুকুরটার একটা কান অর্ধেক কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে অন্য কুকুরে, দেখতে দেখতে পাড়ার লোকের অভ্যেস হয়ে গেছে তাই আর কান-কাটা বলে চোখে লাগে না। কিন্তু আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় সহজে। ফুচকাওয়ালাটা দেখল কান-কাটা কুকুরটা তার দিকেই আসছে। সেই মহিলাও গামছার ওড়না ঠিক করে রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে গেল ফুচকাওয়ালার দিকে। কালী মন্দিরে কিছু না পেয়ে সেই বেড়ালটাও এসে ফেলে দেওয়া শালপাতার বাটি শুঁকছে।

দেবী এগিয়ে এসে বললেন... "কী রে, আজ তো শনিবার... নিরিমিষ তো তোর?"
ফুচকাওয়ালা হাসল। কালো কুকুরের দিকে দুটো চ্যাপটা ফুচকা ছুঁড়ে দিল। কুকুরটা দ্রুত খেয়ে শেষ করে ল্যাজ নাড়ল আরো কিছুর অপেক্ষায়। দেবীর বাহন, আরো কিছুটা প্রাপ্য হয়।
দেবী আবার বললেন... "কী? তোর জন্য ভাত চাপাবো?... নিরিমিষ খাবি?... নাহলে ডিম আনতে হবে শম্ভুদার বাড়ি গিয়ে... দোকান বন্ধ করে দিয়েছে!"
ফুচকাওয়ালা এবারো হাসল, মাথা নাড়ল... সেই নায়ের কী মানে বোঝা গেল না। কুকুরটা অধৈর্য হচ্ছে দেখে আরো চারটি চ্যাপটা ফুচকা ছুঁড়ে দিল ওর দিকে।
দেবী সেদিকে একবার রেগে তাকালেন, একচোখে আগুনের ফুলকি জ্বলেই নিভে গেল। তারপর বললেন 'ওই সব খেয়ে ওর শরীর খারাপ হবে, রাতে ওকে খাইয়ে দেব আমি! আর দিস না। আসবি না... আজ ও-বাড়ি যাবি... তাই তো?"
ফুচকাওয়ালা আলু মাখা হাতটা প্লাস্টিকের বোতল থেকে জল ঢেলে ধুতে ধুতে চোখ দিয়ে মন্দিরের দিকে ইশারা করে বলল... "মাক্‌স্‌ লাগাওনি কেন?... বুড়িটা দেখছে দেখো..."
দেবী ঘাড় ফিরিয়ে সেদিকে দেখে বললেন "দেখুক... ছেনালি মাগী। বাল পাত্তা দিই ওকে! ওর নিজের ছেলে কোন মোল্লার বিবির সঙ্গে পালিয়ে গেছিল... সে তাকে খুঁজে অ্যায়সা পেদিয়েছিল... সারা পাড়া জানে।"
"শুনেছি... আসলে কাল সকালে... মাকে নিয়ে ডাক্তারখানা যেতে হবে...'
- মার নাম নিয়ে মিথ্যে বলিস না... কেউ জোর করে নি। যা...
- না গো... সত্যি... তোমার ওষুধগুলোও কিনে নেব একসঙ্গে...
- চল রে টুঙ্কু, রান্না চাপাতে হবে। দেখি ঘরে কী আছে!
- আরে এখনো তো খদ্দের আসবে... আছি রাত অবধি... কী হল?... আরে!
দেবী দাঁড়ালেন না, পেছন ফিরে তাকালেন না। হাঁটতে হাটঁতে প্রবেশ করলেন শীতলা মন্দিরের পাশের গলিতে... মিলিয়ে গেলেন গলির আবছায়াতে। কালো কুকুরটিও মিশে গেল গলির অন্ধকারে।

ফুচকাওয়ালা ভিজে গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। যে বোতলের জলে হাত ধুচ্ছিল, সেই বোতল থেকেই জল খেল দু ঢোক।
তারপর শীতলা মন্দিরের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল পরবর্তী ক্রেতার। সন্ধ্যে ক্রমশ রাতে মিশছে, পুলিশের জিপ এলে চলে যেতে বলবে।
সঠিক সময়ে জোর করতে জানলে কত মানুষের জীবন বদলে যেত। তবে এসব মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, দেবীদের ক্ষেত্রে নয়।
দেবী জোর করেন না, তাঁকেও জোর করা যায় না। অথচ মাঝে মাঝে তিনি চান... কেউ জোর করুক।
জোর করা, আর জোর খাটানোর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যটার ওপর দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে লরি চলে যায়।

এঁটো শালপাতার মাঝে খাবার খুঁজতে খুঁজতেই দুটো ফড়িং পেয়ে গেল বেড়ালটা। খেয়েও নিল। রাতের পোকাগুলো একটু অন্যমনস্ক হলে সুবিধেই হয়। ইঁদুর ধরতে আর একটু ক্ষিপ্রতা আর শক্তি লাগবে। আজ পিঠে হেলমেট পড়ার পর থেকে একটু দুর্বল। বেড়ালটা আসলে দু-মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বছর তিনেক বয়স হল... আজ অবধি কেউ ওকে 'ম্যাঁও' ডাকতে শোনেনি।




[আষাঢ়, ১৪২৮-- প্রকাশিত গল্প : শাপলা পত্রিকা, জুলাই ২০২১ সংখ্যা]


নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি