শিখার রঙ ক্যাসাটা

 

ছবির নাম -- Candle Flame  শিল্পী-- Aaron Fink



ক্যাসাটার মত আগুনের শিখা, আর পেপারমিন্ট ক্যান্ডির মত মোমবাতি। ঠোঁটের মত দেখতে কেকের ওপর সাজানো মোমবাতি... ওপরের ঠোঁটটা চকলেট, নিচের ঠোঁটটা স্ট্রবেরী রঙের। 

ইহুদী পরিবারে অ্যানিভার্সারি, মানে বিবাহবার্ষিকী ঠিক সেই ভাবে হয় না, যেভাবে খ্রীষ্টানদের মধ্যে রেওয়াজ আছে। কিন্তু প্রতিবেশী খ্রীষ্টানদের অ্যানিভার্সারীর এত কিছু করে একটা রঙিন অ্যানিভার্সারী করতে দেখি প্রতি বছর... আমাদের আর কীই বা হয় বলো? তাই ভাবলাম এ বছর না হয় একটু!

ক্যাসাটা কী বুঝতে পারছ না? আরে ওই যে... ওই আইসক্রীমগুলো, তোমার মনে নেই? স্ট্রবেরী, চকলেট, বাটারস্কচ... আলাদা আলাদা রঙে স্তরে স্তরে থাকে। মনে পড়েছে? শুনেছি দারুণ লাগে খেতে! মোমের শিখাটাও সেইরকম দারুণ, দেখো?! দেখো ক্যাসাটা রঙের সুন্দর মোমের আগুন। অবিশ্বাস্য সুন্দর... ঠিক আমাদের এতগুলো বছর একসাথে কাটিয়ে দেওয়ার মত। 

      না, ওই মোমবাতির আলো নেভাব না আমরা। জ্বলুক, যতক্ষণ জ্বলতে জ্বলতে পুরোটা শেষ হয়ে যায়... জ্বলুক। তুমি বললে তারপর আবার একটা মোমবাতি জ্বালব, তারপর আবার একটা... সারা রাত ধরে তোমার জন্য আলো করে রাখব এই টেবিলটা। তুমি এই ভাবেই আমার দিকে চেয়ে থাকবে... থাকবে তো? হা হা... সরে যাচ্ছ কেন? ছেলে-ছেলের বউ... কেউ তো নেই এখানে। ওরা নীচে খাবারের টেবিল সাজাচ্ছে। 

কেকটা দেখে লজ্জা পাচ্ছ কেন? ঠোঁটের মত দেখতে বলে?... হা হা হা! তোমার ঠোঁটের সুন্দর নয়, মিষ্টিও নয়... আমি বাজি রেখে বলতে পারি। সত্যি! অত সুন্দর ঠোঁটে ছুড়ির দাগ ভালো দেখায় না-- ঠিক বলেছ। আলতো করে শুধু ঠেকাব ঠোঁট। দু'জনে একসাথে। সব সময় ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে নেই। ভোগ করতে নেই। কত কিছুই তো ভোগ করা হয়, কেটে খেয়ে ফেলা হয়... বলো? আমরা না হয় একটু অন্যরকম করেই... হ্যাঁ, চলো একটু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই; ততক্ষণ ওরা ডাইনিং টেবিলটা সাজিয়ে নিক। 

     ওই দেখো, উইলো কাঠের আগুন জ্বালিয়ে আমাদের নাতি-নাতনিরা কেমন আগুনের চারপাশে পাক খেয়ে খেয়ে গান গাইছে সুর করে। কী গান বুঝতে পারছ? খ্রীষ্টানদের বাচ্চাগুলোর থেকে শিখেছে মনে হয় । ওরাও এই ভাবে গায় খ্রিসমাসের রাতে। একবার খ্রিসমাসের রাতে আমরা বরফ গলিয়ে চা বানিয়েছিলাম, মনে আছে? সতেরো ঘণ্টা পর মিস্‌ আইটনার আমাদের খ্রিসসমাস কেক দিতে এসেছিলেন। ভাগ্যিস এসেছিলেন! অমন সুস্বাদু কেক! না করার প্রশ্নই ওঠে না... আমি তো আনন্দ চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেলেছিলাম "সারা সন্ধে ব্র্যাটওয়ার্স্ট, বার্লিনার, টার্কির রোস্ট, পরিজ, পুডিং-এর গন্ধে পেট এমনিই ভরতি... তারপর কী আর কেক-এর জায়গা আছে? "

আগুনের আলোয় দেখো, কেমন ছায়া গুলো দুলছে ফেন্স-এর ওপর। কী সুন্দর একে একে যাচ্ছে প্রসেশনের মত। হাতে হাত ধরে, গান গাইতে গাইতে। ফসল কাটার গান। 

না না... আমি এখন গাইতে শুরু করছি না! মাথা খারাপ? পাড়ার লোক শুনলে ভাববে বুড়োটার আনন্দে মাথা খারাপ হয়ে গেছে! তোমার মনে আছে গানের কথা গুলো?


হ্যাঁ গো, আমি জানি, আমার সব মনে আছে... বিয়ের পর থেকেই তোমার খুব ইচ্ছে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার... বেড়াতে, মানে দূরে... সমুদ্রে। এইরকম বারান্দা কিংবা ছাদের ওপরে এলেই তুমি বলতে--  'পাহাড়, নদী বা বরফে ঢাকা... এইসব ইচ্ছে করলেই দেখা যায়। কিন্তু সমুদ্রের নোনা জল, বালির উষ্ণতা... আর হাতে গড়া ছোট ছোট নরম দুর্গ!' যেতেই হবে... অথচ বার বার চেষ্টা করেও হয়ে উঠত না। খরচ লেগেই থাকে, একটু একটু করে জমানো টাকা। কাপড়-জামা বানানো আর সেলাই করে পাওয়া টাকা, গাছ আর ফুল বিক্রী করা টাকা, খবরের কাগজ বিলি করা টাকা... একজনের খাবার দুজনে খেয়ে জমানো টাকা - ঠিক খরচ হয়ে যায়। একদিন তৃতীয় একজন আসবে... তার জন্য একটা গুছনো ঘর, একটা সাজানো বাগান... সুন্দর বাড়ি... বাবা-মা না দিলে কে দেবে? হে সর্বশক্তিমান পিতা... কৃপা করো, যেন দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে পারি! 

আজ সুদিন এসেছে... টাকা আছে ভালো ভাবে দুবেলা খাওয়ার, ইচ্ছে মত সাজার। এবার যেতে হবে, সামনের বছর শীত পড়ার আগেই ফ্রান্সে যাচ্ছি আমরা... সাঁ ট্রোপে! অনেক ছোটোবেলা গরম জলে নুন দিয়ে গলায় রেখে শেঁক দিতে বলত মা... সমুদ্রের জল নাকি ঠিক সেইরকম! 


আচ্ছা আচ্ছা... এই কোটটা জড়িয়ে নাও, তাহ'লে আর ঠান্ডা লাগবে না। আচ্ছা ঠিক আছে, আর এখানে দাঁড়াতে হবে না... চলো ভেতরে যাই। ওই দেখো বাচ্চাগুলোকেও ভেতরে ডাকছে এবার। 

দেওয়ালে সুন্দর পেন্টিংটা দেখেছ?... হ্যাঁ ওই ছেলেটারই আঁকা। কী সুন্দর ভাষা ভাষা চোখ। এক সময় ওই সামনের রাস্তাটায় বসে ছবি আঁকত, মনে আছে তোমার? এখন কত দেশে ওর ছবির একজিবিশন হয়! আমিও কিনে আনলাম একটা... আসল নয় যদিও, রেপ্লিকা। ওর আসল পেইন্টিং কেনার মত টাকা খরচ করতে পারছি না এখন! সামনে এখনও অনেক কিছু করতে হবে, তাই না?  তাও দেখো, কী নিখুত নকল করেছে... একটা বিশাল জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাভেরিয়ার বিস্তৃত আকাশ, পাহাড়... আহ্‌! ওর সইটা পর্যন্ত এঁকে দিয়েছে নকল করে-- Adolf der Wanderer !

না না, খুব বেশি টাকা খরচ হয়নি... বিশ্বাস করো। তোমাকে চমক দেব বলে আকে জানাইনি, প্যাক করে বেসমেণ্টের ঘরে লুকিয়ে রাখতে বলেছিলাম ছেলেকে। আচ্ছা ধরে নাও না, গত বছর যেমন ওই কার্পেট টা কিনেছিলাম... সেরকমই এবছর না হয় এই ছবিটা। কার্পেটে মোড়া সম্পর্ক... ভেলভেট কি না জানা নেই... কোনও প্রাণীর লোম কিন তাও জানা নেই। কিন্তু সুন্দর তো লাগছে আমাদের ঘরের মেঝেতে, বলো? সেরকম এই নকল রেপ্লিকা ছবিটাও না হয় উজ্জ্বল হয়ে থাক। ভালোবাসার রঙে। এমন বড়ো জানলা দিয়ে পৃথিবীকে দেখতে কার না ভাল লাগে বলো?


আমার ঠাকুর্দা বলতেন... সব খারাপ দিন পার করে একটা ভালো দিন আসে। সবাই খারাপ দিনগুলো সহ্য করতে পারে না, কাটিয়ে উঠতে পারে না। তাই দেখতে পায় না। ভালো দিন দেখতে না পেয়ে একে একে সবার বিশ্বাস হারিয়ে যায়, ইচ্ছে ফুরিয়ে যায়... ঈশ্বর আর জীবন দুই-ই মিথ্যে মনে হয়। এই দেখো... আমরা দুজন কেমন একটা একটা করে পেতে রাখা ইটে পা দিয়ে এত কিছু পেরিয়ে এলাম। আমাদের সন্তানরা কি কিছুই মনে রাখবে না?! তা কি হয়? 


                                                                                             ---   ---   ---   ---


একটা সরু বাংকে দুজন মিলে শোয়া এমনিতেই কষ্টের। তাও এই ঠান্ডায় একটা ভেজা জুতো মাথায় রেখে। তবুও দুপুরের জমিয়ে রাখা আধখানা রুটির টুকরো রাতে শোয়ার আগে খেতে পারলে ঘুমটা একটু ভালো হয়। ক্লান্তি থেকেই হোক, বা জীবন থেকে ওইটুকু সময় পালিয়ে বাঁচতে পেরেই হোক... স্বপ্ন চলে আসে। এই ভাবেই ঠোঁটের কোণে শুকনো পাউরুটি নিয়ে একজন ঘুমের মধ্যে অল্প অল্প হাসছিল। ঘুষি খেয়ে ফেটে যাওয়া ঠোঁটে রক্তের স্বাদ সমুদ্রের নোনা জলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে... আর কিছুদিন পর তার বিবাহ বার্ষিকী। অথচ অশউইৎজ ক্যাম্পের কোথায় তার স্ত্রীকে রাখা আছে... আদৌ সে আছে কি না... জেগে থাকলে হয়ত এখন এটা মনে করেই হাউ হাউ করে কাঁদত। আর পাশের লোকটার স্বপ্ন ভেঙে যেতো সেই শব্দে। 


                                                                                               ---   ---   ---   ---


বহু সমাদৃত এবং সমান্নিত মনস্তত্ববিদ এবং স্নায়ুবিদ ডাক্তার ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কল ইহুদী বলে, সপরিবারে তাঁদের ঘেটোতে আটকে রাখা হয়। এবং ১৯৪৪ সালে সমস্ত পরিবারকেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় অশউইৎজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। 

ওঁর মা এবং ভাই অশউইৎজ-এই নিহত হন। ওনার স্ত্রীকে (অবশ্যই ওনার থেকে আলাদা করে) সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বার্গেন-বেলসেন এর ক্যাম্পে... ওঁর স্ত্রী সেখানেই নিহত হন অথবা অসুস্থতার কারণে মারা যান (ঠিক কী হয়েছিল ভিক্টর জানতে পারেননি, তবে বোঝা কষ্টকর নয়)। ভিক্টর (যাঁর একাধিক বার ক্যাম্প বদল হয়) আর ওঁর একমাত্র বোন স্টেলা (যিনি অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে বেঁচেছিলেন) ছাড়া ওঁর পরিবারের কেউই হলোকস্ট থেকে রক্ষা পাননি।  

'Man's Search for Meaning' বইটির একটি অংশে ভিক্টর সেই অশউইৎজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের একটি বিশেষ রাতের করুণ মুহূর্ত বর্ণনা করেছিলেন ।  জার্মান সৈন্য / ডাক্তারদের মধ্যে একজন ভায়োলিন বাজাচ্ছেন নৈশভোজের সময়ে। আর সেই ভায়োলিনের করুণ সুর শুনে ভিক্টরের মনে পড়ে গেল ওঁর স্ত্রীয়ের মুখ। সেও দূরে সেই ক্যাম্পের অন্য অংশে কোথাও আছে। হয়ত ভিক্টরের কথাই ভাবছে। আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী! কেঁদে ফেলছিলেন ভিক্টর। 


যে প্রৌঢ় ইহুদী স্ত্রীকে নিয়ে একদিন সমুদ্রে বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন... তিনি ভিক্টর নন। আর তাঁর পরিচয় জেনেই বা কী হবে? কখনও বাস্তবে, বাস্তবে না হলে স্বপ্নেই-- এই ভাবে ইচ্ছাপূরণ হয়ে যায় টুকরো টুকরো রাতে। ইচ্ছাগুলো থাকে, মানুষগুলো বাতাসে ভেসে যায় ছাই হয়ে । 


[ভাদ্র, ১৪২৪]


নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি