| চিত্র -- Shark Tooth, শিল্পী -- Silvia Rubboli Golf |
মানুষের জীবন এক একটা ডায়েরি... যার প্রতিটা পাতা কেবলমাত্র অপরের নয়, মাঝে মাঝে সেই ব্যক্তির নিজেরও কৌতূহল অথবা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কিছু পাতা খালি থাকে, খালিই থেকে যায়। কিছু পাতা হয় স্বচ্ছ। কিছু পাতা হয় অর্ধস্বচ্ছ। কিছু পাতার হাতের লেখা, যে লিখেছে পরবর্তীকালে সেই নিজেই চিনতে পারে না। আবার, কিছু পাতার লেখা দেখে স্পষ্ট চেনা যায়, এ তার হাতের লেখা নয়... অন্য কেউ যেন তার অজান্তেই কতকিছু লিখে রেখে গেছে। ডায়েরির কোনও পাতা ছিঁড়ে ফেলে দিলেও, সেই জায়গায় একটা চিহ্ন থেকে যায়। পাতা উলটোতে উলটোতে ঠিক সেইখানে এসে পৌঁছলে সেই ছেঁড়া দাগও জানান দিয়ে যায়, যে এইখানে একসময়ে কেউ ছিল। এইসবকিছুর ব্যক্তিগত থাকা… অজ্ঞাত থেকে যাওয়া… গোপনীয়তা, অনুপস্থিতি বা পরোক্ষে থাকারও একটা নিজের স্থান আছে, যা সম্মান দাবি করে। ছিঁড়ে ফেলা পাতাদের সেই শূন্যস্থানগুলোর প্রতি সেই সম্মান দেখিয়ে ময়নাতদন্ত থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়াই শ্রেয়। ওই শূন্যের মাঝেই তারা আশ্রয় খুঁজে নিক।
— — —
একসময়ে শহর আর শহরতলির বহু অঞ্চলে দুপুর হলেই শোনা যেত এক বিশেষ সুর... সাপের বাঁশির সুর। কেউ অলিগলি দিয়ে সাপের বাঁশি বাজাতে বাজতে চলে যাচ্ছে দুপুরের নিস্তব্ধতার বুকে একটা হালকা ঢেউ তুলে। তার এই চলে যাওয়াটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। রাস্তার কুকুরগুলো ঘুমে আচ্ছন্ন থেকেও কেবল কান খাড়া করে একবার বোঝার চেষ্টা করত সেই আওয়াজের উৎস। দৈবাত একবার মাথা তুলে আবার মাথা ফেলে দিত। যেসব বাধ্য ছেলেমেয়েরা দুপুর জেগে অঙ্ক করত, তারা হয়ত অন্যমনস্কভাবেই একবার দেখত জানলার বাইরে। তারপর বীজগণিতের সমীকরণে হারিয়ে যেত সেই বাঁশির সুর। কিন্তু সেই বাঁশুরিয়া যেন খুঁজত কোনও আগ্রহী শ্রোতাকে, যাকে তার কৌতূহল বাধ্য করবে বাইরে এসে দেখতে… কে অমন বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে এ পথ ধরে। যেন ইচ্ছে করেই এই গুরুত্বহীন উপস্থিতিটা তন্দ্রাচ্ছন্ন দুপুরকে জানান দিয়ে যাওয়া। এমন সাপের বাঁশি বাজিয়ে পথ ধরে হেঁটে গেছে অনেকে, তবুও ‘তারা’ না বলে, সে বলে গেলাম। কী অদ্ভুত!
এমনই একজন সাপুড়েকে দেখতাম আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা খেলার মাঠে আসতে মাঝে মধ্যে। শহরতলি অঞ্চলে তখনও বহু খেলার মাঠ ছিল, প্রোমটারেরা মুক্ত শৈশবের গলা টিপতে পারেনি। একবার ছুটির দিনে বেলার দিকে সেই মাঠের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম, একটা জায়গায় বেশ কিছু লোক ভিড় করে আছে। গোল হয়ে ঘিরে বেশ আগ্রহ নিয়েই কিছু দেখছে। অত লোকের কৌতূহল আমাকেও টেনে নিয়ে গেল সেদিকে। লোকজনের ফাঁক দিয়ে ভিড়ের মধ্যে গলে গিয়ে দেখলাম একজন সাপুড়ে একটা লম্বা সাপকে সামনে ঝুলিয়ে ধরে এক নাগারে কিছু বলে চলেছে, আর লোকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে। আমার কানে তার একটা কথাও ঢুকছিল না। আমি এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার হাতের সেই প্রাণীটির দিকে। ল্যাজের একটা প্রান্ত তার হাতে ধরা, হাতটা উঁচু করে রাখা যাতে সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করে। তার লম্বা শরীরের অপর প্রান্ত এসে ঠেকেছে মাটিতে। মাটিতে যাতে মাথা ঠোকা না লাগে, যেন সেই জন্যই সাপটা জোর করে নিজের মাথা তুলে রেখেছে খানিকটা ওপরে। মুহুর্মুহু চেরা জিভটা বেরিয়ে বাতাসের স্বাদ নিয়ে যাচ্ছে। বিষ দাঁত ভেঙ্গে দেওয়ার প্রবাদটা আমি শুনেছিলাম। সেই সাপুড়ের হাতে সাপটিকে সেদিন বড় অসহায় মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল– এ যতই লোকজনকে জ্ঞান দিক, হয় এই সাপ বিষধর নয়, আর নাহ’লে বিষদাঁতের একটা কিছু ব্যবস্থা করা আছে। এরপরেও একাধিক বার সেই সাপুড়েকে দেখেছি ওই অঞ্চলে। ভালোই পসার জমেছিল। ভর দুপুরে সেই সাপের বাঁশি বাজিয়ে চলে যেত পাড়ার অলি-গলি দিয়ে। সে সুর অবশ্য তার নিজের নয়, হিন্দি সিনেমা নাগিনের বীণ... হেমন্ত কুমারের সুর।
সাপ বা সাপের বাঁশি, যার টানেই হোক, যখনই সেই সাপুড়েকে দেখতাম, থমকে দাঁড়িয়ে পড়তাম। ইচ্ছে হ’ত একবার বলি– সাপটাকে বার করতে, কিন্তু সাহস হ’ত না। পাড়ার চেনা কেউ দেখে ফেললে সে কথা বাড়ি অবধি পৌঁছবেই, আর তা মোটেই সুখের নয়। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখলাম একটা বন্ধ দোকানের শাটারে হেলান দিয়ে সেই সাপুড়ে পা ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। দেখে মনে হ’ল সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। তার পাশে রাখা কাপড়ের বড়ো ঝোলা, যার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে সেই পেট মোটা সাপের বাঁশি, আর একটা বেতের ঝুড়ির কিছুটা অংশ। তার ভেতরেই সেই প্রাণীটা চেরা জিব নিয়ে, তার প্রভুর মতই সারাদিনের ক্লান্তির পর বিশ্রাম নিচ্ছে। ভাবলাম, “সাপুড়েটা ঘুমোচ্ছে, এই ফাঁকে, একবার বাঁশিটা হাতে নিয়ে দেখলে কেমন হয়।” এক পা এক পা করে সেইদিকে এগিয়ে গেলাম। সেই প্রথম এত কাছ থেকে লক্ষ করলাম লোকটাকে। কানে দুল, বা হাতে বালা অথবা উলকি, বা লম্বা চুল এমন কিছুই নেই… তাকে বেদে ভাবলে ভুল হবে। পরনে একটা মলিন শার্ট আর সবুজ চেক লুঙ্গি। যেমন আমাদের সমাজে শ্রমজীবী মানুষের চেহারা হয়। তার ঘুম যাতে না ভাঙে, সন্তর্পনে এগিয়ে গেলাম সেই কাপড়ের ঝুলির দিকে। সামনের দিকে ঝুঁকে বাঁশিটা ধরতে যেতেই সে এক চোখ খুলে বলল “কী খোকাবাবু? সাপ ধরবা?” আমি চমকে দু’পা পিছিয়ে গেলাম। আর এক পা পিছোলেই নর্দমায় পড়ে যেতাম। সেই সাপুড়ে চকিতে আমার হাত ধরে এক টান মেরে সামনের দিকে নিয়ে এলো। মনের মধ্যে একটা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও চেষ্টা করলাম যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকতে। লোকটা আমার হাত ছাড়ল না। খয়েরের দাগ ধরা দাঁত বার করে হেসে বলল “কী খোকাবাবু… এহুনি নালায় পড়তা যে! ঝুলি থেইক্যা কী নিতে আইসিলে?” আমি অপ্রতিভ হয়ে বললাম “কোই, কিছু না তো…” সে সোজা হয়ে বসে, ঝুলি থেকে বাঁশিটা বার করে বলল “তাইলে আইসিলে ক্যান? আমি যে দ্যাখলাম এই বাঁশির লগে হাত বাড়াইলা…” আমি তাকে বাঁধা দিয়ে বললাম “ওই বাঁশিটা… হ্যাঁ, একবার দেখব বলে…” সে সাপের বাঁশিটা মুখে নিয়ে একবার গালফুলিয়ে মুখভঙ্গি করল… তারপর লাল জিব বার করে হা হা করে হাসল। “বাঁশি নিয়া কী করবা? বাজাতি পারবা?” আমার বাঁশি বাজানোর বা শোনার ইচ্ছে ছিল না। শুধু হাতে নিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল। আসল কৌতূহলের বস্তু ছিল সেই ঝুলির ভেতর ঢাকা দেওয়া বেতের ঝুড়ি। সে আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার আমার হাতটা খপ করে ধরে বলল “দু’টাকা দ্যাও, তাইলে বাজায়ে শোনাতি পারি।” এভাবে রাস্তায় হাত ধরে যে টাকা চায়, সে মোটেই সুবিধের লোক নয়। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। প্যান্টের পকেটে খুচরো পয়সা ছিল, তবুও দিতে ইচ্ছে হ’ল না।
পেছন থেকে সেই সাপুড়ের গলার আওয়াজ ভেসে আসছিল “আরে ও খোকাবাবু... পালাইলা ক্যান… বাঁশি শুনবা না? হা হা হা হা...”
ভয় পাওয়ার মত তার চেহারায় কিছুই ছিল না। আরও ছোট হ’লে হয়ত ওই কাপড়ের বড়ো ঝুলিটা দেখে ছেলেধরা বলে ভয় পেতাম। কিন্তু সেই সময়ে অপরিচিত কারো হাত ধরা একটা অস্বস্তি জন্ম দিত মনে। ভয়ের থেকেও বিশ্রী একটা অস্বস্তির অনুভূতি। ঝুলিটার অত কাছে গিয়েও সুবিধে হল না। আর লোকটা স্পষ্ট জানাল– বাঁশি শুনতেও টাকা লাগবে! সেই সময়ে হাত খরচের টাকা দূর অস্ত, কারও দাক্ষিণ্যে হয়ত মাঝে মাঝে চার আনা, আট আনা বা দৈবাৎ এক টাকা পাওয়া যেত। সেই টাকা জমিয়ে রাখা থাকত বছরের কোনও বিশেষ দিনে, কোনও বিশেষ সাধ মেটানোর জন্য, তা সে যত তুচ্ছই হোক। সেই সামান্য পুঁজি খরচ করে বাঁশি শোনা মানে, অন্য একটা ইচ্ছা বিসর্জন দেওয়া। মনটা কেমন ভেঙে গেল। এরপর বেশ কিছুদিন, পাড়া দিয়ে ওই সাপুড়ে বাঁশির আওয়াজ করে গেলেই মন চঞ্চল হয়ে উঠত। বারান্দার গ্রিল ধরে দেখতাম সে চলে যাচ্ছে। মাঝেমাঝে স্বপ্নেও সেই বাঁশির সুর শুনতে পেতাম।
কোথাও একটা টান ছিলই... সে টান সাপের প্রতি, না সাপের বাঁশির প্রতি না সাপুড়ের প্রতি তা ঠিক বুঝতাম না। কিছুদিন পরই ইচ্ছে হ’ল আবার একবার কথা বলে দেখি। সেই মাঠের ধারেই একটা পার্কের ভেতর লোকটার সঙ্গে আবার দেখা হ’ল। দুপুরবেলা ওই পার্কে খুব একটা কেউ যেত না। পথ চলতি কেউ কেউ আসত বিশ্রাম করতে। অথবা ভবঘুরেরা বেঞ্চের ওপর পড়ে পড়ে ঘুমত। সেই পার্কে বসে সে পেয়াঁজ-মুড়ি খাচ্ছিল। এবারে সেই পেটমোটা বাঁশি তার পাশেই রাখা। বেতের ঝুড়িটাও ঝুলির বাইরে। আমাকে কাছাকাছি আসতে দেখেই সে বিশ্রী রকম হেসে বলল “কী খোকা… সেদিন অমন পালালে ক্যান্? ভয় পাইলা নাকি?” আমি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে বললাম “ওই ঝুড়ির ভেতর সাপটা আছে?” সে একই রকম হেসে বলল “কালিয়া নাগ আসে! ফোঁস!” আমি সভয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বললাম “আমি জানি, বিষদাঁত ভাঙা।” সে কিছুক্ষণ সুরমা দেওয়া চোখে তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা দুলিয়ে হাসতে হাসতে আবার মুড়ি খাওয়া শুরু করল। আমি আবার কিছুটা কাছে এসে বললাম “দু’টাকা দিতে পারি... বাঁশি বাজাতে হবে না, আমার হাতে দিতে হবে।” লোকটা খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কী?”, তারপর আবার দাগধরা দাঁত বার করে হাসতে লাগল। বিরক্ত হয়ে বললাম “এতে হাসার কী আছে? বললাম তো টাকা দেব।” বালকের অপ্রসন্নতা তার কৌতুক বাড়াল। সে বাঁশিটা বাঁ হাতে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিল, সেদিকে আমি হাত বাড়াতেই আবার পিছিয়ে নিল। এইরকম দু’তিন বার হওয়ার পর “দিতে হবে না যাও!” বলে সেখান থেকে ফিরে আসতে উদ্যত হ’তেই সে খাবার ছেড়ে উঠে পড়ে ছুটে এসে আমার হাত ধরল। তারপর বাঁশিটা হাতে দিয়ে বলল “এই ন্যাও, কী দ্যাখবা দ্যাহো। কিন্তু খুব সাবধান! হাবিজাবি সুর বাজলেই কেলেঙ্কারী কাণ্ড! নাগরাজ খু-উ-ব গোস্সা হবেন।” কোনো ঝিমিয়ে থাকা সাপকে ক্ষ্যাপানোর কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না, কেবল সেই অদ্ভুত দর্শন বাঁশিটা একবার হাতে নিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। প্রথমবার সেটা হাতে পেয়ে বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম। সেই বাঁশিতে কোন কায়দায়, কেমন করে ফুঁ দিলে অমন আচ্ছন্ন করা সুর বের হয় তার কিছুই জানি না। আমি সেটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আনন্দ পাচ্ছিলাম, আর সেই সাপুড়ে আমাকে দেখে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছুক্ষণ দেখার পর হঠাৎ সেই বাঁশি মুখে দিয়ে বাজানোর চেষ্টা করলাম। ঠিক ওইভাবে মুখে দিয়ে মাথা দুলিয়ে, যেমন সাপুড়েরা করে। কিন্তু তার থেকে সাপুড়িয়া বাঁসির সুরের বদলে যে শব্দ বেরোল, তাতে আমার নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। সেই সাপুড়ে ছুটে এসে আমার হাত থেকে বাঁশিটা কেড়ে নিয়ে বলল “ফুঁক দিতে মানা করসিলাম কি না!” আমি মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম, “ফুঁ দিয়ে দেখছিলাম কেমন আওয়াজ, তাতে দোষ কোথায়?” সে আমার শার্টের হাফ হাতার ফাঁক থেকে উঁকি দেওয়া পৈতেয়ে একটা আলত টান দিয়ে বলল “হেথায়।”
বাড়ির কেউ কখনও জানেনি যে ওই সাপুড়ের সাথে আমার আলাপ আছে। অভিভাবকদের জেড়া সামলানো সাবালকদের পক্ষেও বহুক্ষেত্রে নিদারুণ হয়ে ওঠে। কখনও বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে ইচ্ছে করেই তাকে দেখা দিতাম না, পাছে সে চিনে ফেলে হাঁক দেয়। তার সাথে কথা বলে জেনেছিলাম তার নাম সুলেমান, দিনাজপুরের লোক। সাপখেলা দেখানো সে শিখেছে তারা বাবার থেকে। যদিও তারা বেদে নয়, সাপ নিয়ে কারবারও করে না। চাষের সময়ে জমিতে ভাগচাষীর কাজ করে, আর অন্যসময়ে শহরে ভেসে বেড়ায় কিছু না কিছু কাজে। শহরে কেবল সাপের খেলাই দেখাত এমন নয়। কোথাও দিনমজুর লাগলে সেখানেও চলে যেত। সুলেমান থাকত সেই মাঠ থেকেই অল্প দূরে একটা বাজারের পেছন দিকে... একটা ছোট বস্তিতে। সে বস্তির বেশির ভাগ বাসিন্দাই আসলে সেই বাজারের ছোটখাটো দোকনদার অথবা সেই অঞ্চলের রিকশাচালক বা ঠিকে ঝি। তাদেরই মাঝে একটা ছোট ঝুপরিতে থাকত সুলেমান, তার অদ্ভুতদর্শণ বাঁশি আর তার পোষ্য সাপ। আমার সঙ্গে ব্যক্তি সুলেমানের কোনওদিনই কোনও নিবিড় সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয় না। আমি তার সাথে বসে থাকতাম দেখার জন্য, কখন সে ঝুড়ির ঢাকা তুলে ওই সাপটাকে বের করে। সেই সাপের মুখের মধ্যে একটা নল গুঁজে তাকে এক অদ্ভুত কায়দায় কাঁচা ডিম খাওয়াত, আমি অবাক হয়ে সেই সাপের খাওয়া দেখতাম। ইচ্ছে থাকলেও সেই সাপের গায়ে হাত দেওয়ার মত সাহস আমার একেবারেই হয়নি। দু’হাতে সেই প্রাণীটিকে ধরে খেলার ছলে মাঝে মাঝে আমার দিকে এগিয়ে দিলে আমি সভয়ে লাফ মেরে দূরে সরে যেতাম, সুলেমান হা হা করে তার লাল টকে টকে জিব বার করে হাসত। কোন জাতের সাপ, কোথা থেকে ধরেছে এইসব বিষদে কখনও জানতে চাইনি। কেবল তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম “এই নাগরাজ যদি মরে যায়, বা হারিয়ে যায়... তাহলে তুমি কী করবে?” সেই সাপের মাথার কাছে বাঁশির একটা দিক নিয়ে গিয়ে তার সাথে খেলতে খেলতে সুলেমান বলেছিল “এক নাগরাজ যায়, আর এক নাগরাজ আসে... এক সুলেমান যায়, আর এক সুলেমান আসে... বাঁশি থাইম্যা থাকে না।”
ঠিক বর্ষার শেষে সুলেমানকে দেখা যেত, আর শীতের শুরুতেই সে চলে যেত। এইভাবে চার-পাঁচ বছর কেটে গেল। ছোটবেলার সেই বালকোচিত সখগুলো একটা একটা করে মুছে গিয়ে তার জায়গায় নতুন ইচ্ছের বীজ অঙ্কুরিত হ’তে লাগল। সেই সাপের বাঁশির সুরের মায়াও ক্রমে ফিকে হয়ে এলো, তার জায়গা নিল জনপ্রিয় হিন্দি গানের সুর। সুলেমান তখনও আসত। তখনও বন্ধুদের সাথে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম পার্কের কোনও একটা বেঞ্চে সুলেমান বসে আছে তার কাপড়ের ঝুলি নিয়ে। আমাকে দেখলে সেই আগের মতই দাগধরা দাঁত বার করে হাসত, “কী বাবু! ইশকুল থেইক্যা ফিরস?” বলে হাঁক দিত। আগের মত আর বেশিক্ষণ কথা বলা হ’ত না। খেলা দেখানোর সময় ছাড়া সে সাপটাকে বিশেষ বার করত না। কেবল আমিই সুযোগ পেতাম ওই সাপকে অত কাছ থেকে দেখার। তাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম “এই সাপটা কি সেইটাই? যেটা পাঁচ বছর আগে দেখেছিলাম? এখনও বেঁচে আছে?” সুলেমান তার স্বভাবোচিত হাসি হেসে বলত “ওরেই জিগাও না... দ্যাখো চিনে সাড়া দেয় কি না!”
এই সুলেমানের সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎটাও বড় অদ্ভুত! তখন আমার বয়স পনেরো কি ষোলো। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময়ে দেখলাম বাজারের দিকটা বেশ ভিড় জমে আছে। অসময়ে এমন জটলা, দেখেই মনে হল ব্যাপার সুবিধের না। বন্ধুদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে গিয়ে দেখলাম ভিড়টা ক্রমশ ঘন হয়েছে বসতির দিকে... এও একরকম তামাশা দেখার জটলা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ এইভাবে তামাশা দেখার জন্যই ভিড় জমায়। মজা ফুরিয়ে গেলে, আবার ভিড় পাতলা হয়ে যায়। লক্ষ করলাম একটা পুলিশের জিপও দাঁড়িয়ে আছে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখলাম তিন চারজন উর্দি পড়া পুলিশ সেখানে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের একজনের হাতে একটা হাতকড়া, যার অপর প্রান্ত সুলেমানের হাতে বাঁধা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুলেমান। তার পরনের জামাটা ছেঁড়া, চোখমুখ ফুলে আছে। তাদের অনতি দূরেই একটা সাপের থ্যাঁতলানো দেহ, তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আর একটা সাইকেল ভ্যানের ওপর চাদর চাপা একটা লাশ, মুখ আর শরীরের ওপরের অংশ ঢাকা। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই সুলেমানকে জিপের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। যাওয়ার সময়ে সেই ভিড়ের মধ্যেও আমার সঙ্গে চোখাচুখি হয়ে গেল সুলেমানের। আমাকেও ওখানে দেখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হল, হয়ত প্রত্যাশা করেনি। তারপর যেন আমাকে শুনিয়েই ইচ্ছে করে চিৎকার করে বলতে বলতে চলে গেল– “মর্জি হইলেই জানে মাইর্যা ফ্যালবা? বরদাস্ত হয় না তাই মাইর্যা ফ্যালবা? এ কেমন ইনসাফ আল্লাহ?...”
পুলিসের জিপ চলে যাওয়ার পর উপস্থিত জনতার কাছ থেকে শুনলাম বিষধর সাপ নিয়ে বস্তিতে থাকা নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবৎ এক মাছওয়ালার সাথে সুলেমানের কথা কাটাকাটি চলছিল। সেদিন দুপুরে মদ্যপ অবস্থায় সেই মাছওয়ালা সাপটাকে ঝুড়ি থেকে বার করে মাথায় থান ইঁট দিয়ে মেরে ফেলে। মাতাল সাপ মারতে সক্ষম ছিল, আত্মরক্ষা করতে নয়। সুলেমান মাথার ঠিক রাখতে না পেরে সেই থান ইঁটই সেই মদ্যপের হাত থেকে কেরে তার মাথায় বসিয়ে দেয়। আর একজন বলল , সুলেমান মারার জন্য ইট তুলেছিল… লোকটা টাল রাখতে না পেরে পড়ে গেছিল, মাথার পেছনে চোট লেগে অজ্ঞান হয়ে যায়। তাকে আবার অন্য একদল থামিয়ে দিয়ে বলল… দুজনের মধ্যে মারামারি হচ্ছিল, সুলেমান দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেয়। ঠিক কী ঘটেছিল বুঝতে পারলাম না। আসতে আসতে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম সুলেমানের ঝুপরিটা পুলিস সিল করে দিয়ে গেছে... দরজায় অসম টিনের পাল্লার তলা দিয়ে উঁকি মারছে সেই পেট মোটা বাঁসিটা। সাপুড়ের বাঁশি তো আর খুনের একজিবিট নয়, তাই তার প্রতি কারও নজর পড়েনি। একটা অস্বস্তি হঠাৎ গলার কাছে চেপে বসায়, দ্রুত সেখান থেকে চলে এলাম। সুলেমানের সেই কথাটা মনে পড়ছিল–
“এক নাগরাজ যায়, আর এক নাগরাজ আসে... এক সুলেমান যায়, আর এক সুলেমান আসে... বাঁশি থাইম্যা থাকে না।”
অথচ বাঁশিটাও…
— — —
এরপর বহু বছর কেটে গেছে। সুলেমানকে, তার সাপের ঝুলি সমেত অনেক অনেক দূরের কোনও স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছি। সেই সাপের বাঁশির সুরও ফিকে হয়ে গেছে। সেই আট আনা, এক টাকা জমিয়ে ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো পূরণ করার স্বপ্ন দেখা খোকাবাবুও হারিয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে এইভাবেই একটা একটা করে সব কিছু সরে যায়, আর নতুন কিছু এসে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়। কিন্তু ডায়েরির পাতাগুলো আছে, তার লেখাগুলো আছে...
কিছুদিন আগে, এক রবিবার দুপুরে হঠাৎ বাড়ির সামনের রাস্তায় সাপের বাঁশির শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হ’ল একটা হালকা হাওয়া ডায়েরির পাতাগুলো উলটে উলটে পেছন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেই সুর আমার পরিচিত নয়, মনে হ’ল দক্ষিণ ভারতীয় কোনও গানের সুর। কিন্তু যন্ত্রটা সাপের বাঁশি ছাড়া আর কিছুই নয়। বাইরে এসে দেখলাম গেটের সামনে রাস্তার ওপর কেউ ওই বাঁশি বাজাচ্ছে। আর তার সাথে একটি ছোট মেয়ে হাতে একটা বেতের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বেরিয়ে আসতে দেখে সেই লোকটি আরও উৎসাহের সঙ্গে বাজাতে লাগল। কাছে গিয়ে দেখলাম, সেইরকম পেটমোটা সাপের বাঁশিই বটে। আর বেতের ঝুড়িতে একটা সাপ ঝিম মেরে কুণ্ডলি পাকিয়ে পড়ে আছে, তার আসে পাসে খুচরো পয়সা। বুঝলাম এরা সাপের খেলা দেখাতে বেরোয়নি, নাগ দেবতার নামে প্রণামী তুলতে বেরিয়েছে। এদেশে অনেকেই এইভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। লোকটার কাছাকাছি যেতে সে নিজের ভাষায় ঝুড়িটার দিকে দেখিয়ে বেশ বিনয়ের সাথে কিছু বলল, বুঝলাম টাকা দিতে বলছে। কিন্তু প্রায় যন্ত্রচালিতের মত, আমার ডান হাতটা এগিয়ে গেল সেই বাঁশিটার দিকে। ঠিক সেইরকম বাঁশি! লোকটি হাসি মুখে বিনা বাঁধায় বাঁশিটা আমার হাতে তুলে দিল। যেন নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই তাকে স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম– পূর্বপরিচিত সেই স্পর্শ ফিরে আসে কিনা। দু-এক বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার ফিরিয়ে দিলাম। সেই ছোট্টো মেয়েটি বেতের ঝুড়িটা আমার দিকে তুলে ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। দেখলাম সাপটা চোখ খুলেই পড়ে আছে, তার গলার কাছে নরম চামড়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুত ওঠা নামা। তার চেয়ে ছোট্টো মেয়েটির চোখে জীবনের ভাগ বেশি। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে একটা দশ টাকার নোট বার করে ঝুড়িতে রাখতে গিয়ে, সাপের গায়ে হাত ঠেকে গেল। দ্রুত সেই হাত সরিয়ে নিলাম, কিন্তু সাপটার মধ্যে এতটুকু প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। তারা আবার বাঁশিতে সুর তুলে রাস্তা ধরে দূরে এগিয়ে গেল। আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম তাদের সেই চলে যাওয়া। সুলেমান বা তার সাপটার সঙ্গে কখনওই কোনও নিবিড় সম্পর্ক ছিল না, তবুও... আবার এক ঝলক বাতাসে ডায়েরির পাতাগুলো ফরফর করে উঠল। চারাপাশে সব কিছুই কেমন হাঙরের দাঁতের মত। আসলে আমরাও এক একটা হাঙরের দাঁত!
৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪১৯।