হাঙরের দাঁত

চিত্র -- Shark Tooth, শিল্পী -- Silvia Rubboli Golf


মানুষের জীবন এক একটা ডায়েরি... যার প্রতিটা পাতা কেবলমাত্র অপরের নয়, মাঝে মাঝে সেই ব্যক্তির নিজেরও কৌতূহল অথবা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কিছু পাতা খালি থাকে, খালিই থেকে যায়। কিছু পাতা হয় স্বচ্ছ। কিছু পাতা হয় অর্ধস্বচ্ছ। কিছু পাতার হাতের লেখা, যে লিখেছে পরবর্তীকালে সেই নিজেই চিনতে পারে না। আবার, কিছু পাতার লেখা দেখে স্পষ্ট চেনা যায়, এ তার হাতের লেখা নয়... অন্য কেউ যেন তার অজান্তেই কতকিছু লিখে রেখে গেছে। ডায়েরির কোনও পাতা ছিঁড়ে ফেলে দিলেও, সেই জায়গায় একটা চিহ্ন থেকে যায়। পাতা উলটোতে উলটোতে ঠিক সেইখানে এসে পৌঁছলে সেই ছেঁড়া দাগও জানান দিয়ে যায়, যে এইখানে একসময়ে কেউ ছিল। এইসবকিছুর ব্যক্তিগত থাকা… অজ্ঞাত থেকে যাওয়া… গোপনীয়তা, অনুপস্থিতি বা পরোক্ষে থাকারও একটা নিজের স্থান আছে, যা সম্মান দাবি করে। ছিঁড়ে ফেলা পাতাদের সেই শূন্যস্থানগুলোর প্রতি সেই সম্মান দেখিয়ে ময়নাতদন্ত থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়াই শ্রেয়। ওই শূন্যের মাঝেই তারা আশ্রয় খুঁজে নিক। 


— — — 

 

একসময়ে শহর আর শহরতলির বহু অঞ্চলে দুপুর হলেই শোনা যেত এক বিশেষ সুর... সাপের বাঁশির সুর। কেউ অলিগলি দিয়ে সাপের বাঁশি বাজাতে বাজতে চলে যাচ্ছে দুপুরের নিস্তব্ধতার বুকে একটা হালকা ঢেউ তুলে। তার এই চলে যাওয়াটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। রাস্তার কুকুরগুলো ঘুমে আচ্ছন্ন থেকেও কেবল কান খাড়া করে একবার বোঝার চেষ্টা করত সেই আওয়াজের উৎস। দৈবাত একবার মাথা তুলে আবার মাথা ফেলে দিত। যেসব বাধ্য ছেলেমেয়েরা দুপুর জেগে অঙ্ক করত, তারা হয়ত অন্যমনস্কভাবেই একবার দেখত জানলার বাইরে। তারপর বীজগণিতের সমীকরণে হারিয়ে যেত সেই বাঁশির সুর। কিন্তু সেই বাঁশুরিয়া যেন খুঁজত কোনও আগ্রহী শ্রোতাকে, যাকে তার কৌতূহল বাধ্য করবে বাইরে এসে দেখতে… কে অমন বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে এ পথ ধরে। যেন ইচ্ছে করেই এই গুরুত্বহীন উপস্থিতিটা তন্দ্রাচ্ছন্ন দুপুরকে জানান দিয়ে যাওয়া। এমন সাপের বাঁশি বাজিয়ে পথ ধরে হেঁটে গেছে অনেকে, তবুও ‘তারা’ না বলে, সে বলে গেলাম। কী অদ্ভুত! 

     এমনই একজন সাপুড়েকে দেখতাম আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা খেলার মাঠে আসতে মাঝে মধ্যে। শহরতলি অঞ্চলে তখনও বহু খেলার মাঠ ছিল, প্রোমটারেরা মুক্ত শৈশবের গলা টিপতে পারেনি। একবার ছুটির দিনে বেলার দিকে সেই মাঠের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম, একটা জায়গায় বেশ কিছু লোক ভিড় করে আছে। গোল হয়ে ঘিরে বেশ আগ্রহ নিয়েই কিছু দেখছে। অত লোকের কৌতূহল আমাকেও টেনে নিয়ে গেল সেদিকে।  লোকজনের ফাঁক দিয়ে ভিড়ের মধ্যে গলে গিয়ে দেখলাম একজন সাপুড়ে একটা লম্বা সাপকে সামনে ঝুলিয়ে ধরে এক নাগারে কিছু বলে চলেছে, আর লোকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে। আমার কানে তার একটা কথাও ঢুকছিল না। আমি এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার হাতের সেই প্রাণীটির দিকে। ল্যাজের একটা প্রান্ত তার হাতে ধরা, হাতটা উঁচু করে রাখা যাতে সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করে। তার লম্বা শরীরের অপর প্রান্ত এসে ঠেকেছে মাটিতে। মাটিতে যাতে মাথা ঠোকা না লাগে, যেন সেই জন্যই সাপটা জোর করে নিজের মাথা তুলে রেখেছে খানিকটা ওপরে। মুহুর্মুহু চেরা জিভটা বেরিয়ে বাতাসের স্বাদ নিয়ে যাচ্ছে। বিষ দাঁত ভেঙ্গে দেওয়ার প্রবাদটা আমি শুনেছিলাম। সেই সাপুড়ের হাতে সাপটিকে সেদিন বড় অসহায় মনে হয়েছিল।  মনে হয়েছিল– এ যতই লোকজনকে জ্ঞান দিক, হয় এই সাপ বিষধর নয়, আর নাহ’লে বিষদাঁতের একটা কিছু ব্যবস্থা করা আছে। এরপরেও একাধিক বার  সেই সাপুড়েকে দেখেছি ওই অঞ্চলে। ভালোই পসার জমেছিল। ভর দুপুরে সেই সাপের বাঁশি বাজিয়ে চলে যেত পাড়ার অলি-গলি দিয়ে। সে সুর অবশ্য তার নিজের নয়, হিন্দি সিনেমা নাগিনের বীণ... হেমন্ত কুমারের সুর। 

     সাপ বা সাপের বাঁশি, যার টানেই হোক, যখনই সেই সাপুড়েকে দেখতাম, থমকে দাঁড়িয়ে পড়তাম। ইচ্ছে হ’ত একবার বলি– সাপটাকে বার করতে, কিন্তু সাহস হ’ত না। পাড়ার চেনা কেউ দেখে ফেললে সে কথা বাড়ি অবধি পৌঁছবেই, আর তা মোটেই সুখের নয়। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখলাম একটা বন্ধ দোকানের শাটারে হেলান দিয়ে সেই সাপুড়ে পা ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। দেখে মনে হ’ল সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। তার পাশে রাখা কাপড়ের বড়ো ঝোলা, যার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে সেই পেট মোটা সাপের বাঁশি, আর একটা বেতের ঝুড়ির কিছুটা অংশ। তার ভেতরেই সেই প্রাণীটা চেরা জিব নিয়ে, তার প্রভুর মতই সারাদিনের ক্লান্তির পর বিশ্রাম নিচ্ছে। ভাবলাম, “সাপুড়েটা ঘুমোচ্ছে, এই ফাঁকে, একবার বাঁশিটা হাতে নিয়ে দেখলে কেমন হয়।” এক পা এক পা করে সেইদিকে এগিয়ে গেলাম। সেই প্রথম এত কাছ থেকে লক্ষ করলাম লোকটাকে। কানে দুল, বা হাতে বালা অথবা উলকি, বা লম্বা চুল এমন কিছুই নেই… তাকে বেদে ভাবলে ভুল হবে। পরনে একটা মলিন শার্ট আর সবুজ চেক লুঙ্গি। যেমন আমাদের সমাজে শ্রমজীবী মানুষের চেহারা হয়। তার ঘুম যাতে না ভাঙে, সন্তর্পনে এগিয়ে গেলাম সেই কাপড়ের ঝুলির দিকে। সামনের দিকে ঝুঁকে বাঁশিটা ধরতে যেতেই সে এক চোখ খুলে বলল “কী খোকাবাবু? সাপ ধরবা?” আমি চমকে দু’পা পিছিয়ে গেলাম। আর এক পা পিছোলেই নর্দমায় পড়ে যেতাম। সেই সাপুড়ে চকিতে আমার হাত ধরে এক টান মেরে সামনের দিকে নিয়ে এলো। মনের মধ্যে একটা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও চেষ্টা করলাম যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকতে। লোকটা আমার হাত ছাড়ল না। খয়েরের দাগ ধরা দাঁত বার করে হেসে বলল “কী খোকাবাবু… এহুনি নালায় পড়তা যে! ঝুলি থেইক্যা কী নিতে আইসিলে?” আমি অপ্রতিভ হয়ে বললাম “কোই, কিছু না তো…” সে সোজা হয়ে বসে, ঝুলি থেকে বাঁশিটা বার করে বলল “তাইলে আইসিলে ক্যান? আমি যে দ্যাখলাম এই বাঁশির লগে হাত বাড়াইলা…” আমি তাকে বাঁধা দিয়ে বললাম “ওই বাঁশিটা… হ্যাঁ, একবার দেখব বলে…” সে সাপের বাঁশিটা মুখে নিয়ে একবার গালফুলিয়ে মুখভঙ্গি করল… তারপর লাল জিব বার করে হা হা করে হাসল। “বাঁশি নিয়া কী করবা? বাজাতি পারবা?” আমার বাঁশি বাজানোর বা শোনার ইচ্ছে ছিল না। শুধু হাতে নিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল। আসল কৌতূহলের বস্তু ছিল সেই ঝুলির ভেতর ঢাকা দেওয়া বেতের ঝুড়ি। সে আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার আমার হাতটা খপ করে ধরে বলল “দু’টাকা দ্যাও, তাইলে বাজায়ে শোনাতি পারি।” এভাবে রাস্তায় হাত ধরে যে টাকা চায়, সে মোটেই সুবিধের লোক নয়। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। প্যান্টের পকেটে খুচরো পয়সা ছিল, তবুও দিতে ইচ্ছে হ’ল না।

পেছন থেকে সেই সাপুড়ের গলার আওয়াজ ভেসে আসছিল “আরে ও খোকাবাবু... পালাইলা ক্যান… বাঁশি শুনবা না? হা হা হা হা...” 

     ভয় পাওয়ার মত তার চেহারায় কিছুই ছিল না। আরও ছোট হ’লে হয়ত ওই কাপড়ের বড়ো ঝুলিটা দেখে ছেলেধরা বলে ভয় পেতাম। কিন্তু সেই সময়ে অপরিচিত কারো হাত ধরা একটা অস্বস্তি জন্ম দিত মনে। ভয়ের থেকেও বিশ্রী একটা অস্বস্তির অনুভূতি। ঝুলিটার অত কাছে গিয়েও সুবিধে হল না। আর লোকটা স্পষ্ট জানাল– বাঁশি শুনতেও টাকা লাগবে! সেই সময়ে হাত খরচের টাকা দূর অস্ত, কারও দাক্ষিণ্যে হয়ত মাঝে মাঝে চার আনা, আট আনা বা দৈবাৎ এক টাকা পাওয়া যেত। সেই টাকা জমিয়ে রাখা থাকত বছরের কোনও বিশেষ দিনে, কোনও বিশেষ সাধ মেটানোর জন্য, তা সে যত তুচ্ছই হোক।  সেই সামান্য পুঁজি খরচ করে বাঁশি শোনা মানে, অন্য একটা ইচ্ছা বিসর্জন দেওয়া। মনটা কেমন ভেঙে গেল। এরপর বেশ কিছুদিন, পাড়া দিয়ে ওই সাপুড়ে বাঁশির আওয়াজ করে গেলেই মন চঞ্চল হয়ে উঠত।  বারান্দার গ্রিল ধরে দেখতাম সে চলে যাচ্ছে। মাঝেমাঝে স্বপ্নেও সেই বাঁশির সুর শুনতে পেতাম। 


     কোথাও একটা টান ছিলই... সে টান সাপের প্রতি, না সাপের বাঁশির প্রতি না সাপুড়ের প্রতি তা ঠিক বুঝতাম না। কিছুদিন পরই ইচ্ছে হ’ল আবার একবার কথা বলে দেখি। সেই মাঠের ধারেই একটা পার্কের ভেতর লোকটার সঙ্গে আবার দেখা হ’ল। দুপুরবেলা ওই পার্কে খুব একটা কেউ যেত না। পথ চলতি কেউ কেউ আসত বিশ্রাম করতে। অথবা ভবঘুরেরা বেঞ্চের ওপর পড়ে পড়ে ঘুমত। সেই পার্কে বসে সে পেয়াঁজ-মুড়ি খাচ্ছিল। এবারে সেই পেটমোটা বাঁশি তার পাশেই রাখা। বেতের ঝুড়িটাও ঝুলির বাইরে। আমাকে কাছাকাছি আসতে দেখেই সে বিশ্রী রকম হেসে বলল “কী খোকা… সেদিন অমন পালালে ক্যান্‌? ভয় পাইলা নাকি?” আমি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে বললাম “ওই ঝুড়ির ভেতর সাপটা আছে?” সে একই রকম হেসে বলল “কালিয়া নাগ আসে! ফোঁস!” আমি সভয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বললাম “আমি জানি, বিষদাঁত ভাঙা।” সে কিছুক্ষণ সুরমা দেওয়া চোখে তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা দুলিয়ে হাসতে হাসতে আবার মুড়ি খাওয়া শুরু করল। আমি আবার কিছুটা কাছে এসে বললাম “দু’টাকা দিতে পারি... বাঁশি বাজাতে হবে না, আমার হাতে দিতে হবে।” লোকটা খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কী?”, তারপর আবার দাগধরা দাঁত বার করে হাসতে লাগল। বিরক্ত হয়ে বললাম “এতে হাসার কী আছে? বললাম তো টাকা দেব।” বালকের অপ্রসন্নতা তার কৌতুক বাড়াল। সে বাঁশিটা বাঁ হাতে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিল, সেদিকে আমি হাত বাড়াতেই আবার পিছিয়ে নিল। এইরকম দু’তিন বার হওয়ার পর “দিতে হবে না যাও!” বলে সেখান থেকে ফিরে আসতে উদ্যত হ’তেই সে খাবার ছেড়ে উঠে পড়ে ছুটে এসে আমার হাত ধরল। তারপর বাঁশিটা হাতে দিয়ে বলল “এই ন্যাও, কী দ্যাখবা দ্যাহো। কিন্তু খুব সাবধান! হাবিজাবি সুর বাজলেই কেলেঙ্কারী কাণ্ড! নাগরাজ খু-উ-ব গোস্‌সা হবেন।” কোনো ঝিমিয়ে থাকা সাপকে ক্ষ্যাপানোর কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না, কেবল সেই অদ্ভুত দর্শন বাঁশিটা একবার হাতে নিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। প্রথমবার সেটা হাতে পেয়ে বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম। সেই বাঁশিতে কোন কায়দায়, কেমন করে ফুঁ দিলে অমন আচ্ছন্ন করা সুর বের হয় তার কিছুই জানি না। আমি সেটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আনন্দ পাচ্ছিলাম, আর সেই সাপুড়ে আমাকে দেখে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছুক্ষণ দেখার পর হঠাৎ সেই বাঁশি মুখে দিয়ে বাজানোর চেষ্টা করলাম। ঠিক ওইভাবে মুখে দিয়ে মাথা দুলিয়ে, যেমন সাপুড়েরা করে। কিন্তু তার থেকে সাপুড়িয়া বাঁসির সুরের বদলে যে শব্দ বেরোল, তাতে আমার নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। সেই সাপুড়ে ছুটে এসে আমার হাত থেকে বাঁশিটা কেড়ে নিয়ে বলল “ফুঁক দিতে মানা করসিলাম কি না!” আমি মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম, “ফুঁ দিয়ে দেখছিলাম কেমন আওয়াজ, তাতে দোষ কোথায়?” সে আমার শার্টের হাফ হাতার ফাঁক থেকে উঁকি দেওয়া পৈতেয়ে একটা আলত টান দিয়ে বলল “হেথায়।”  

    বাড়ির কেউ কখনও জানেনি যে ওই সাপুড়ের সাথে আমার আলাপ আছে। অভিভাবকদের জেড়া সামলানো সাবালকদের পক্ষেও বহুক্ষেত্রে নিদারুণ হয়ে ওঠে। কখনও বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে ইচ্ছে করেই তাকে দেখা দিতাম না, পাছে সে চিনে ফেলে হাঁক দেয়। তার সাথে কথা বলে জেনেছিলাম তার নাম সুলেমান, দিনাজপুরের লোক। সাপখেলা দেখানো সে শিখেছে তারা বাবার থেকে। যদিও তারা বেদে নয়, সাপ নিয়ে কারবারও করে না। চাষের সময়ে জমিতে ভাগচাষীর কাজ করে, আর অন্যসময়ে শহরে ভেসে বেড়ায় কিছু না কিছু কাজে। শহরে কেবল সাপের খেলাই দেখাত এমন নয়। কোথাও দিনমজুর লাগলে সেখানেও চলে যেত। সুলেমান থাকত সেই মাঠ থেকেই অল্প দূরে একটা বাজারের পেছন দিকে... একটা ছোট বস্‌তিতে। সে বস্‌তির বেশির ভাগ বাসিন্দাই আসলে সেই বাজারের ছোটখাটো দোকনদার অথবা সেই অঞ্চলের রিকশাচালক বা ঠিকে ঝি। তাদেরই মাঝে একটা ছোট ঝুপরিতে থাকত সুলেমান, তার অদ্ভুতদর্শণ বাঁশি আর তার পোষ্য সাপ। আমার সঙ্গে ব্যক্তি সুলেমানের কোনওদিনই কোনও নিবিড় সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয় না। আমি তার সাথে বসে থাকতাম দেখার জন্য, কখন সে ঝুড়ির ঢাকা তুলে ওই সাপটাকে বের করে। সেই সাপের মুখের মধ্যে একটা নল গুঁজে তাকে এক অদ্ভুত কায়দায় কাঁচা ডিম খাওয়াত, আমি অবাক হয়ে সেই সাপের খাওয়া দেখতাম। ইচ্ছে থাকলেও সেই সাপের গায়ে হাত দেওয়ার মত সাহস আমার একেবারেই হয়নি। দু’হাতে সেই প্রাণীটিকে ধরে খেলার ছলে মাঝে মাঝে আমার দিকে এগিয়ে দিলে আমি সভয়ে লাফ মেরে দূরে সরে যেতাম, সুলেমান হা হা করে তার লাল টকে টকে জিব বার করে হাসত। কোন জাতের সাপ, কোথা থেকে ধরেছে এইসব বিষদে কখনও জানতে চাইনি। কেবল তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম “এই নাগরাজ যদি মরে যায়, বা হারিয়ে যায়... তাহলে তুমি কী করবে?” সেই সাপের মাথার কাছে বাঁশির একটা দিক নিয়ে গিয়ে তার সাথে খেলতে খেলতে সুলেমান বলেছিল “এক নাগরাজ যায়, আর এক নাগরাজ আসে... এক সুলেমান যায়, আর এক সুলেমান আসে... বাঁশি থাইম্যা থাকে না।” 


     ঠিক বর্ষার শেষে সুলেমানকে দেখা যেত, আর শীতের শুরুতেই সে চলে যেত। এইভাবে চার-পাঁচ বছর কেটে গেল।  ছোটবেলার সেই বালকোচিত সখগুলো একটা একটা করে মুছে গিয়ে তার জায়গায় নতুন ইচ্ছের বীজ অঙ্কুরিত হ’তে লাগল। সেই সাপের বাঁশির সুরের মায়াও ক্রমে ফিকে হয়ে এলো, তার জায়গা নিল  জনপ্রিয় হিন্দি গানের সুর। সুলেমান তখনও আসত। তখনও বন্ধুদের সাথে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম পার্কের কোনও একটা বেঞ্চে সুলেমান বসে আছে তার কাপড়ের ঝুলি নিয়ে। আমাকে দেখলে সেই আগের মতই দাগধরা দাঁত বার করে হাসত, “কী বাবু! ইশকুল থেইক্যা ফিরস?” বলে হাঁক দিত। আগের মত আর বেশিক্ষণ কথা বলা হ’ত না। খেলা দেখানোর সময় ছাড়া সে সাপটাকে বিশেষ বার করত না। কেবল আমিই সুযোগ পেতাম ওই সাপকে অত কাছ থেকে দেখার। তাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম “এই সাপটা কি সেইটাই? যেটা পাঁচ বছর আগে দেখেছিলাম? এখনও বেঁচে আছে?” সুলেমান তার স্বভাবোচিত হাসি হেসে বলত “ওরেই জিগাও না... দ্যাখো চিনে সাড়া দেয় কি না!” 


     এই সুলেমানের সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎটাও বড় অদ্ভুত! তখন আমার বয়স পনেরো কি ষোলো। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময়ে দেখলাম বাজারের দিকটা বেশ ভিড় জমে আছে। অসময়ে এমন জটলা, দেখেই মনে হল ব্যাপার সুবিধের না। বন্ধুদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে গিয়ে দেখলাম ভিড়টা ক্রমশ ঘন হয়েছে বসতির দিকে... এও একরকম তামাশা দেখার জটলা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ এইভাবে তামাশা দেখার জন্যই ভিড় জমায়। মজা ফুরিয়ে গেলে, আবার ভিড় পাতলা হয়ে যায়। লক্ষ করলাম একটা পুলিশের জিপও দাঁড়িয়ে আছে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখলাম তিন চারজন উর্দি পড়া পুলিশ সেখানে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের একজনের হাতে একটা হাতকড়া, যার অপর প্রান্ত সুলেমানের হাতে বাঁধা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুলেমান। তার পরনের জামাটা ছেঁড়া, চোখমুখ ফুলে আছে। তাদের অনতি দূরেই একটা সাপের থ্যাঁতলানো দেহ, তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আর একটা সাইকেল ভ্যানের ওপর চাদর চাপা একটা লাশ, মুখ আর শরীরের ওপরের অংশ ঢাকা। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই সুলেমানকে জিপের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।  যাওয়ার সময়ে সেই ভিড়ের মধ্যেও আমার সঙ্গে চোখাচুখি হয়ে গেল সুলেমানের। আমাকেও ওখানে দেখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হল, হয়ত প্রত্যাশা করেনি। তারপর যেন আমাকে শুনিয়েই ইচ্ছে করে চিৎকার করে বলতে বলতে চলে গেল– “মর্জি হইলেই জানে মাইর‍্যা ফ্যালবা? বরদাস্ত হয় না তাই মাইর‍্যা ফ্যালবা? এ কেমন ইনসাফ আল্লাহ?...” 

     পুলিসের জিপ চলে যাওয়ার পর উপস্থিত জনতার কাছ থেকে শুনলাম বিষধর সাপ নিয়ে বস্তিতে থাকা নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবৎ এক মাছওয়ালার সাথে সুলেমানের কথা কাটাকাটি চলছিল। সেদিন দুপুরে মদ্যপ অবস্থায় সেই মাছওয়ালা সাপটাকে ঝুড়ি থেকে বার করে মাথায় থান ইঁট দিয়ে মেরে ফেলে। মাতাল সাপ মারতে সক্ষম ছিল, আত্মরক্ষা করতে নয়। সুলেমান মাথার ঠিক রাখতে না পেরে সেই থান ইঁটই সেই মদ্যপের হাত থেকে কেরে তার মাথায় বসিয়ে দেয়। আর একজন বলল , সুলেমান মারার জন্য ইট তুলেছিল… লোকটা টাল রাখতে না পেরে পড়ে গেছিল, মাথার পেছনে চোট লেগে অজ্ঞান হয়ে যায়। তাকে আবার অন্য একদল থামিয়ে দিয়ে বলল… দুজনের মধ্যে মারামারি হচ্ছিল, সুলেমান দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেয়। ঠিক কী ঘটেছিল বুঝতে পারলাম না। আসতে আসতে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম সুলেমানের ঝুপরিটা পুলিস সিল করে দিয়ে গেছে... দরজায় অসম টিনের পাল্লার তলা দিয়ে উঁকি মারছে সেই পেট মোটা বাঁসিটা। সাপুড়ের বাঁশি তো আর খুনের একজিবিট নয়, তাই তার প্রতি কারও নজর পড়েনি। একটা অস্বস্তি হঠাৎ গলার কাছে চেপে বসায়, দ্রুত সেখান থেকে চলে এলাম। সুলেমানের সেই কথাটা মনে পড়ছিল–

“এক নাগরাজ যায়, আর এক নাগরাজ আসে... এক সুলেমান যায়, আর এক সুলেমান আসে... বাঁশি থাইম্যা থাকে না।”

অথচ বাঁশিটাও… 


— — — 


     এরপর বহু বছর কেটে গেছে। সুলেমানকে, তার সাপের ঝুলি সমেত অনেক অনেক দূরের কোনও স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছি। সেই সাপের বাঁশির সুরও ফিকে হয়ে গেছে। সেই আট আনা, এক টাকা জমিয়ে ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো পূরণ করার স্বপ্ন দেখা খোকাবাবুও হারিয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে এইভাবেই একটা একটা করে সব কিছু সরে যায়, আর নতুন কিছু এসে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়। কিন্তু ডায়েরির পাতাগুলো আছে, তার লেখাগুলো আছে... 


     কিছুদিন আগে, এক রবিবার দুপুরে হঠাৎ বাড়ির সামনের রাস্তায় সাপের বাঁশির শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হ’ল একটা হালকা হাওয়া ডায়েরির পাতাগুলো উলটে উলটে পেছন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেই সুর আমার পরিচিত নয়, মনে হ’ল দক্ষিণ ভারতীয় কোনও গানের সুর। কিন্তু যন্ত্রটা সাপের বাঁশি ছাড়া আর কিছুই নয়। বাইরে এসে দেখলাম গেটের সামনে রাস্তার ওপর কেউ ওই বাঁশি বাজাচ্ছে। আর তার সাথে একটি ছোট মেয়ে হাতে একটা বেতের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বেরিয়ে আসতে দেখে সেই লোকটি আরও উৎসাহের সঙ্গে বাজাতে লাগল। কাছে গিয়ে দেখলাম, সেইরকম পেটমোটা সাপের বাঁশিই বটে। আর বেতের ঝুড়িতে একটা সাপ ঝিম মেরে কুণ্ডলি পাকিয়ে পড়ে আছে, তার আসে পাসে খুচরো পয়সা। বুঝলাম এরা সাপের খেলা দেখাতে বেরোয়নি, নাগ দেবতার নামে প্রণামী তুলতে বেরিয়েছে। এদেশে অনেকেই এইভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। লোকটার কাছাকাছি যেতে সে নিজের ভাষায় ঝুড়িটার দিকে দেখিয়ে বেশ বিনয়ের সাথে কিছু বলল, বুঝলাম টাকা দিতে বলছে। কিন্তু প্রায় যন্ত্রচালিতের মত, আমার ডান হাতটা এগিয়ে গেল সেই বাঁশিটার দিকে। ঠিক সেইরকম বাঁশি! লোকটি হাসি মুখে বিনা বাঁধায় বাঁশিটা আমার হাতে তুলে দিল। যেন নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই তাকে স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম– পূর্বপরিচিত সেই স্পর্শ ফিরে আসে কিনা। দু-এক বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার ফিরিয়ে দিলাম। সেই ছোট্টো মেয়েটি বেতের ঝুড়িটা আমার দিকে তুলে ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। দেখলাম সাপটা চোখ খুলেই পড়ে আছে, তার গলার কাছে নরম চামড়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুত ওঠা নামা। তার চেয়ে ছোট্টো মেয়েটির চোখে জীবনের ভাগ বেশি। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে একটা দশ টাকার নোট বার করে ঝুড়িতে রাখতে গিয়ে, সাপের গায়ে হাত ঠেকে গেল। দ্রুত সেই হাত সরিয়ে নিলাম, কিন্তু সাপটার মধ্যে এতটুকু প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। তারা আবার বাঁশিতে সুর তুলে রাস্তা ধরে দূরে এগিয়ে গেল। আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম তাদের সেই চলে যাওয়া। সুলেমান বা তার সাপটার সঙ্গে কখনওই কোনও নিবিড় সম্পর্ক ছিল না, তবুও... আবার এক ঝলক বাতাসে ডায়েরির পাতাগুলো ফরফর করে উঠল। চারাপাশে সব কিছুই কেমন হাঙরের দাঁতের মত। আসলে আমরাও এক একটা হাঙরের দাঁত!


৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪১৯।


মাঝে নদী বহে রে

 


চিত্রঋণ -- আন্তর্জাল


মরা যখনই সুখ-দুঃখের গল্প করতে বসি (বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্যকে নিয়ে), আমাদের অজান্তেই সুখের পরিমাণ কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকে। আর শেষে, ওই গল্প জীবনের প্রতি এক ব্যর্থ অভিযোগে রূপান্তরিত হয়। অদৃষ্ট নামক অদৃশ্য শয়তানের প্রতি এক বিরূপ মনোভাব জন্মায়। হালকা হাসি, অনুযোগ, অভিযোগ আর মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে চোখের জল সামলে নিতে নিতে জীবনের এক প্রান্তে এসে একদিন দেখা যায়, সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ওইটুকু সম্বলই রয়ে গেছে। নিন্দুকেরা যাই বলুক, ওই সুখ-দুঃখের গল্পই সংসারীর পরম সম্পদ। ওটি না থাকলে তেঁতুলের আচার বিস্বাদ লাগে, বারবার চ্যানেল বদলেও টিভিতে কিছু ভালো লাগে না, স্কচ-হুইস্কি জোলো মনে হয়। এমন কি জনৈক সৃষ্টিশীল ব্যক্তির রসদেও ভাঁটা পড়ে (চুপি-সাড়ে)।


রমাপদ পালিত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। পরবর্তীকালে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা হন এবং বর্তমানে সেই পরিবারেরই বসত বাড়ির উত্তর দিকের আমগাছে থাকেন। হ্যাঁ আমগাছেই থাকেন, হপ্তা খানেক আগে তাঁর গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটেছে। তবে, পিছুটান এখনও ছিঁড়তে পারেননি, তাই আপাতত আমগাছ। সংসারের হিতে যে সব পরিকল্পনা ফেঁদে বসেছিলেন তা জীবদ্দশায় ফিনিশ করা হয়ে ওঠেনি। তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় পূর্ণ সময়টাই প্রয়োজনীয়, আসল কাজ ফেলে এদিক ওদিক চড়ে বেড়ালে উত্তরপত্র অসমাপ্তই থেকে যায়। তাই বলে, প্রাণ থাকতে কি রমাপদবাবু কিছুই করেননি? খুব করেছেন! বাপের সুপুত্তুর হয়ে শাঁসালো ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়েকে ঘরের লক্ষ্মী করেছেন। কলেজ পাশ দিয়েই টুক করে মামার ধরে দেওয়া আপিশের কেরানী হয়ে সাপ-সিঁড়ি খেলতে খেলতে ক্রমে বড়োবাবুর চেয়ার অবধি উঠেছেন। তারপর কোম্পানি বলল “এবার ছাড়েন কত্তা, ভি আর এস নেন!” টেবিলের ওপরে-নীচে যা আসত তাই দিয়ে তার আগেই শহরতলি অঞ্চলে আড়াই কাঠা জমিতে নিজের লাগসই বাড়ি, পেছনে বাগানের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ছেলে-বউ-নাতি-নাতনীদেরও তেমন কোনও অভিযোগ নেই রমাপদবাবুকে নিয়ে। তাঁর শ্রাদ্ধ-শান্তিও তাঁর ছেলেরা বাপের টাকাতেই দিব্যি চালিয়ে নিয়েছে। আর মেয়ে-জামাই কলোরাডো থেকে  ভিডিও কল করে পরোলোকগত পিতার আত্মার শান্তি কামনার কর্তব্য সেরে নিয়েছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তেমন কোনও অশান্তি ছিল না। কিন্তু শেষের দিকে এসে কেমন সব হিসেব গোলমাল হয়ে গেল... এখন এই সাধের আম গাছটা ছাড়া সবই আধখাওয়া মালপোয়ার মত। তবে কি, দেহই যখন রইল না, তখন সেই দেহের সংসারের প্রতি আবদ্ধ হয়ে থাকা কি সুবিবেচকের কাজ? মায়াডোর আর সুপুরিগাছের পাতা-বাকল... সে তো কখনো না কখনো খসাতেই হবে।

জীবদ্দশায় রমাপদবাবুর দুটো বিশেষণ জুটেছিল... ‘কুচুটে’ আর ‘কিপটে’। এখন সেই সব প্রতিবেশীদের একটু শিক্ষা দেওয়ার দুষ্টু-বুদ্ধি মনে জাগে মাঝে মাঝে। কিন্তু, তখন ওইসব বাইরের আপদের টিটকিরি যতটা গা’জ্বালিয়েছিল, আজকাল নিজের পরিবারের আচরণ তার থেকে বেশি খোঁচা দিচ্ছে। বুকের মাঝখানটা ফাঁকা হয়ে গেছে বলে বোধহয় এখন বেশি হু হু করে! এখনও গাছের একটা ডালে ঠেস দিয়ে সেই অন্তঃপুরের দিকেই চেয়ে আছেন। মহামায়া সাতাত্তর বছরের মোহ-মায়ার জালে আটকে রেখেছিলেন, তা এই ক’দিনে ছিন্ন হওয়ার নয়।
শেষবারের মত চোখ বোঁজার আগে গিন্নি, আর বোধহয় কোনো এক ছেলের বউয়ের কান্নার শব্দ কানে এসেছিল, এছাড়া কিছু শুনতে পাননি। সূক্ষ্ম শরীর লাভের পর যখন আবার দৃষ্টি পরিষ্কার হল, তখন দেখলেন তাঁর এতকালের চেনা দেহর ওপর হালকা হয়ে ভাসছেন। আর সেই দেহটিকে, তাঁর বউমারা শেষবারের মত সাজিয়ে নিচ্ছে। লোকজনের অন্তিম যাত্রা দেখা রমাপদর কোনওদিনই ঠিক পছন্দ নয়, তাই নিজের খোলটার সামনে থাকতেও ইচ্ছে করল না। একলাফে খাট থেকে নামতে গিয়ে, পালকের মত ভেসে সদর দরজা অবধি এগিয়ে গেলেন, যেন ব্যোমযাত্রী! অল্প বয়সে কেউ কেউ বলতেন বটে “রমাপদ, তোমার গ্র্যাভিটি একটু বাড়াও... না হ’লে কোথাও পাত্তা পাবে না।” কিন্তু তাই বলে মরার পর যে এমন বায়বীয় হয়ে ভেসে বেড়ানো যাবে, একথা কে জানত? মৃত্যুর আগের যন্ত্রণা-কষ্ট, বিদেহী অবস্থার এই প্রাপ্তির আমোদে খানিকটা ফিকে হয়ে গেল। কিন্তু রমাপদ হিসেবী মানুষ, ছোটখাটো আনন্দে বড়ো চিন্তা ভুলে যান না। এতদিন যে গৃহিনীর পুষ্যি হয়ে ছিলেন, তার প্রতি আনুগত্য থেকে হোক অথবা অনুরাগ থেকেই হোক, একবার অন্দরমহলে তাকে দেখতে গেছিলেন ভেসে ভেসে। গিয়ে দেখলেন গিন্নি এক নিকট আত্মীয়ার কোলে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বিলাপ করছে। আর এক প্রতিবেশীর স্ত্রী তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সেই বিলাপের মাঝেই এক মহিলা গিন্নির গলা থেকে সোনার হারটা খুলতে গেল। রমাপদ ভাবলেন, এই বুঝি বুড়ি শোক ভুলে মারতে যায়! কিন্তু তাকে হতাশ করে একেবারে বিনা বাঁধায় তাঁর গিন্নিকে নিরাভরণ করে সেই মহিলা গয়নাগুলি সযত্নে অন্য ঘরে নিয়ে গেল। যে মানুষ সংসারে পা রাখার পর থেকে রমাপদকে একদিনও এক পয়সা বাজে খরচ করতে দেয়নি, চিরকাল নিজের বাপের বাড়ির লোক ছাড়া অন্য আত্মীয়দের উৎপাত এবং আতিথেয়তাকে আদিখ্যেতা বলে এসেছে, তার এমন আকস্মিক বৈরাগ্যে রমাপদ নিজের মৃত্যুর থেকেও বেশি মর্মাহত হলেন। তাঁর কষ্টার্জিত সম্পত্তি বারো-ভূতের পেটে যাওয়া থেকে আর ঠেকায় কে? আর সেখানে না থেকে, নিজের বাসা ত্যাগ করে ভেসে ভেসে পাড়ার মোড়ের কদমগাছটায় গিয়ে বসেছিলেন সেদিন। সেইখানে বসেই নিজের শব-যাত্রা দেখলেন। শ্মশান যাত্রার নামে পাড়ার ছোকরাদের ফূর্তি দেখে রমাপদর প্রেতজিহ্বা অস্থির হয়ে উঠেছিল। কিন্তু  প্রেতমুখের খিস্তির সবটাই ‘বলো হরি’ রবে চাপা পড়ে গেল।


                                                                    --- --- --- ---


আজকাল সাত-পাঁচ চিন্তা হয়। শরীরের মায়া গেলেও, জগতের মায়া যাচ্ছে না। না মরলে বুঝতেই পারতেন না যে পুরনো দিনের সব লোকগুলো এখনো এতজনএই পাড়াতেই রয়ে গেছে। যে যার বাড়ির ছাদে, বা কাছাকাছি কোথাও একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে। এই ঠাঁই খোঁজাও একরকমের অভ্যেস। না পেলেও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, অশরীরী হলেও ঠাঁই-নাড়া হতে ভালো লাগে না। গাছ কমে গেছে, পুকুর কমে গেছে, পোড়ো বাড়ি কমে গেছে। মুক্তি না পাওয়া আত্মাগুলো এখনো বেরোতে পারছে না মায়া কাটিয়ে। অত দাপুটে ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জে, কেমন মুখ চুন করে ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে জলের ট্যাঙ্কের ওপর বসে থাকে। মাঝে মাঝে মাথা দোলায়, আর বলে -- 'স-অ-ব জলে গেল... স-অ-ব জলে গেল'। ফ্ল্যাটবাড়িটা ভোলা বাঁড়ুজ্জের চার-কাঠা জমির ওপর। ছেলেরা যে যার মত ফ্ল্যাট আর ক্যাশ পেয়েছে। নতুন ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে অন্য জায়গায়, আর এই ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। ভোলা বাঁড়ুজ্জেরও ইচ্ছে করে চলে যেতে, চেষ্টাও করেন। পারেন না, বেশি দূরে গেলেই কেমন জল থেকে ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খেতে শুরু করেন। মনে হয়ে 'আবার মরে যাব'। সে অসহ্য কষ্ট! অথচ, ওঁর স্ত্রী  নাকি পাকা আমের মত টুকুস করে খসে পড়ে মুক্তি পেয়ে গেছেন। বাঁধন কেটে উড়ে যেতে কোনো কষ্ট হয়নি। সুখেন, শঙ্করলাল...  এরা বলে আসলে সব ভ্যাজাল। কমিউনিস্ট হলেও, এদের ছেলেরা শ্রাদ্ধ-শান্তি নিয়ম মেনেই করেছিল। তাও আটকে আছে, ডাক পায়নি। জিনিসের ভ্যাজাল, নিয়ম-বিধিতে ভ্যাজাল, আচার-অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়াতে ভ্যাজাল... কী ঠিক আর কী ভুল সেই পদ্ধতিটাই হারিয়ে গেছে। যা হয় সব তালে গোলে। ঠিকঠাক প্রতিক্রিয়াও হয় না, জীবাত্মাগুলোও সব আটকে পড়ছে মায়াজালে মাছ আটকানোর মত। ব্রজেনের মত দু-চারজন এসব শুনে হাসে, বলে 'তোরা না লাল ঝান্ডা ওড়াতি? তোরাও এখন বলবি আচার-বিধির দোষ?'  রমাপদ এসব শুনে হাসে না, সবে সবে অশরীরী হয়েছে বলে সব কিছু ঠিক মত বোঝেও না। অস্বস্তি হয়। বেমানান লাগে নিজেকে এসবের মাঝে। আর সবাইকে যে বেঁচে থাকতে পছন্দ করত এমনও তো না। বরং এখন আর এড়িয়ে যেতেও পারছে না, চারপাশে চেনা-পরিচিত লোকদের মাঝে অপছন্দের লোকও অনেক। তাদের শোক আর অপূর্ণতাও অনেক, ঝুপ করে আঁধার ঘনিয়ে আসা মেঘের মত। রমাপদবাবুর মাঝে মাঝে এসব দেখে মায়া আরো বেড়ে যায়। চোখ ফেটে জল আসার মত লাগে... চোখ নেই, দু-ফোঁটা জলও ফেলতে পারেন না। বাপ-ঠাকুর্দা থাকত সেই ডোমজুরে। তারাও এখনো সেখানেই পড়ে আছে কি না কে জানে! ঠিক-ঠাক শ্রাদ্ধ-শান্তি না হলেই কি শুধু এমন হয়? তাহলে তো রমাপদরও দায়... তেনাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারেন নি। তাই যদি হয়, তাহলে রমাপদরও তো কোনো গতি হবে না! কেউ নিতে আসবে না তাকে।  
আছি, অথচ নিজেকেই দেখতে পাচ্ছি না... মানে আসলে নেই-- এই স্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতেও মনের জোর লাগে। মনকে শান্ত করে অনুশীলন অধ্যায়নের দরকার হয়। 
 
“ওহে রমা, এই ভর সন্ধ্যেবেলা মুখ পেঁচা করে বসে আছো কেন?” কথাগুলো একসাথে চার দিক থেকে ভেসে এলো। ব্রজেন ঘোষাল বছর দুয়েক হল চোখ বুঁজেছেন। জীবিতাবস্থায় রমাপদর সঙ্গে বেশ ভাব ছিল। আর এই ভাবের মূল উৎস হ’ল বিকেলে রক্ষেকালীতলার পাশে চায়ের দোকানে বসে সুখ-দুঃখের গপ্পো করা। দু বছর আগে বায়ুচড়া হয়েছেন, তাই হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো, ভাসতে ভাসতে কথা বলা-- এগুলো বেশ রপ্ত হয়ে গেছে। রমাপদর চারপাশে দ্রুত একটা পাক খেতে খেতেই ওই কথাটা বলেছেন। রমাপদ প্রথমে টের পাননি, তারপর ঠাওর করে দেখলেন ব্রজেন ঘোষাল তাঁর ডালের সামনে ভেসে আছেন। ওঁর প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরের খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন রমাপদ। ব্রজেন ঘোষাল সেই দিকে তাকিয়ে বললেন “ওদিকে আর দেখছ কী? ওখানে কি আর তোমার যাওয়া হবে? না, গেলে কেউ টের পাবে?... আর টের পেলেও, সেটা কি খুব একটা ভালো হবে?” রমাপদ সেই দিকে চেয়েই বললেন “আর যাওয়া... আসলে...”

- আসলে কী?
- একটা ভারী গোলমাল চলছে... সকাল থেকেই...
- কীসের গোলমাল?”
- ওই যা হয়... মৎস্যমুখের পর কদিন যেতে না যেতেই  মাথায় কদমফুলের মত চুল নিয়ে দুই ভাই বসে গেছে কবে সার্ভেয়ার ডেকে জমির মাপ হবে সেই নিয়ে!
- ওহ! এ আর নতুন কথা কী?
- মানে? বাপের জমিদারি নাকি!
- ছিল... এখন নেই।
- খোঁটা মারছ!
- দূর! এই আমাকেই দেখো না... পাকাপোক্ত দোতালা বাড়ি ছেলেদের জন্য রেখে চোখ বুঁজলুম... এমন মালমুগুর জিনিস এখন আর হবে?... শালারা বছর ঘুরতেই প্রমোটর কে দিয়ে দিলে!    
 - সেই, তাপ্পর দেখো-- ভবতোষ লাহা, মন্টু ঘোষ... ছেলে-মেয়ে তো নয়, শকুন... বাপ চোখ বুঁজলেই কাটাছেঁড়া স্টার্ট!
- কুণ্ডুবাবুর তো বেঁচে থাকতেই...
- কোন কুণ্ডু?
- আরে ওই যে... যার মেন রোডে তিন-তিনটে ড্রেস মেটেরিয়াল্‌সের দোকান।”
- অ... তাকে তো ওল্ডেজে পাচার করে দিয়েছে শুনলাম...”
- তাহলেই ভাবো...

 
ব্রজেন ঘোষালের কথা শেষ হ’ল না... রমাপদ’র বাড়ির একতলা থেকে আবার কথা কাটাকাটির শব্দ ভেসে এলো। দুই ভাইয়ের মধ্যে তর্ক চলছে, বেশ উঁচু গলায়। ব্রজেন ঘোষাল নিজের ভাসমান স্থিতিটা আমগাছের একটা ডালের আগায় জড়ো করে বললেন “ইয়ে, বলছি রমা... এভাবে তোমার বাড়ির ইন্টারনাল প্রবলেম দেখা... কিন্তু এখন আর কী তোমার, কী আমার... বলো?”
রমাপদ কোনও উত্তর দিলেন না... একাগ্র চিত্তে বোঝার চেষ্টা করছেন ঠিক কী চলছে দুই ভাইয়ের মধ্যে।

ঘরের ভেতরে দুই ভাইয়ের ক্যাচালটা রাস্তা অবধি শোনা যাচ্ছে এখন। তাদের বউরাও কেউ বাঁধা দিচ্ছে না, মনে মনে দু’জনেই চায় এর একটা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। সার্ভেয়ার আসবে, জরিপ হবে... কিন্তু দুই ভাইয়ের কার কতটা দাবী, অধিকার আর প্রাপ্য সেই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তবে দু’জনেই মোটামুটি একটা ব্যাপারে এক মত-- সার্ভেয়ার আসছে। প্রেতরূপী রমাপদ দুই ভাইয়ের ডুয়েল দেখতে দেখতে কেবল একবার অস্ফুটে বললেন “ওরে, তোদের বাপ যে একটা উইল করেছিল... যার নামে সব কিছু, তাকে একবার জিজ্ঞেস করবিনি?” ছেলেরা সে কথা শুনতে পেলো কি না কে জানে, দু’জনেই হুড়মুড় ধুপধাপ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় মায়ের ঘরে গিয়ে হাজির। রমাপদবাবুর সদ্য বিধবা স্ত্রী সুলেখা দেবী ফুলো ফুলো চোখ (কেঁদে না ঘুমিয়ে বলা মুশকিল) বন্ধ করে রাধামাধবের ছবির সামনে আসনে বসে ছিলেন। ছেলেরা একসঙ্গে ঘরে ঢুকে, মাকে দেখে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল। মা-র কাছ থেকে কোনও সারাশব্দ না পেয়ে নিজে থেকেই দুই ভাই পালা করে বুঝিয়ে দিল, এবার একটা ব্যবস্থা করতে হবে... আগামী রবিবারই সার্ভেয়ার আসছে... ফয়সালা দরকার... তারা মাকে জানাবার কর্তব্য করতে এসেছে। সুলেখা দেবী সব শোনার পর চোখ খুললেন... কিন্তু কিছু বললেন না। 
     ব্রজেন ঘোষাল ডালের শেষ প্রান্তে হুমড়ি খেয়ে আছেন উত্তেজনায়, শরীরটা থাকলে নির্ঘাত গাছ থেকে পড়তেন, বায়ুচড়া বলে ভেসে আছেন। সত্তরের দশকে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল খেলা দেখতে গিয়ে এমন উত্তেজনা হ’ত! রমাপদর বড়ো ছেলে মা’র দিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে বলল “কী গো, তোমার অমত নেই তো?” আর ছোটো ছেলে একটু গলা চড়িয়ে বলল “যদি কিছু বলার থাকে, এখনই বলে দাও!... মামার পারমিশন ছাড়া তো আবার চলে না!” রমাপদ আড়ষ্ট হয়ে অপেক্ষা করছেন এর পর কী হয়। তাঁর গিন্নি নির্মোহ দৃষ্টিতে একবার বড়ো ছেলে, তারপর একবার ছোটো ছেলেকে দেখে করুণ ভাবে বললেন “উনি যাওয়ার আগে একটা উইল লিকে গ্যাচেন... জানিস তো? ওতে লেকা আচে পাওয়ার অব অ্যাটর্নী দিপুর... আর স্থাবর অস্থাবরের মালিকানা সবটাই আমার...” তাঁর কথা শেষ করতে না দিয়ে ছোটো ছেলে তড়পে উঠে বলল “সে যা আছে, আছে... কিন্তু আমাদেরটাও তো বুঝে নিতে হবে নাকি?” বড়ো ভাইও সায় দিয়ে বলল “হুম, ব্যাপারটা ক্লিয়ার হওয়া দরকার।” সুলেখা দেবী আসন পাট করে উঠতে উঠতে একই রকম ধরা গলায় ক্ষীণ স্বরে বললেন “হ্যাঁ... রাজপাট রেখে চলে গেল মানুষটা...  বুজে তো নিতেই হবে... দে, দিপুকে খবর দে তাহলে, ও আসুক।” দিপু রমাপদ’র একমাত্র শালা, ঘোড়েল চিজ্‌ আর রমাপদর থেকেও বড় কুচুটে (কারণ রমাপদ নিজেও তাকে কুচুটে বলতেন)। এক কথায় বাস্তু-ঘুঘু। কীভাবে যে মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি করে ফেলল... রমাপদবাবু এখনো বুঝতে পারেন না। মনে হল, এতেই যেন সকলের ভালো। বাইরের লোক ছেলেদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে দাঁত ফোটাতে পারবে না। বাইরের লোক বলতে মূলতঃ বউমাদের বাপের-বাড়ির লোকজন আর কী! জীবদ্দশায় তার শালা দীপ্তিময়ের আসার কথা শুনলে রমাপদ মনে-মনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন। কিন্তু এখন যেন অশান্তি ঠেকাতে ওইটাই শ্রেয় মনে হ’ল। ‘দিপু’-র নাম শুনে দুই ভাইও কেমন একটু দমে গিয়ে এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি-পাতা বউমারাও ভুরু কুঁচকলো। মোবাইল ফোনে পটাপট কিছু ম্যাসেজ চলে গেল কোথাও। বুড়ি ছেলেদের উপস্তিতিকে পাত্তাই দিলেন না। দুটো বাতাসা খেয়ে গেলাসে রাখা জল দু ঢোক খেলেন। তারপর খাটে উঠে বসে এক পায়ের পাতা দিয়ে অন্য পায়ের পাতা ঘষে পা-দুটো খাটে তুলে নিলেন। এমন ভাবে নির্লিপ্ত হয়ে গেলেন, যেন এই বিষয়ে আর কোনো ভাবনাও নেই... কথাও নেই। এরপর মা-কে ম্যানেজ করতে কিংবা চ্যালেঞ্জ করতে বড়ো ছেলে আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যেতেই হঠাৎ কী হল, হাতের কাছের স্টিলের গ্লাসটা পটাং করে মেঝেতে আছড়ে দিলেন সুলেখা দেবী। সেটা ঠং করে শব্দ করে ছিটকে দরজার দিকে চলে গেল। তারপর ধপাস করে খাট থেকে নেমে একেবারে ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন “বাপটা বেঁচে থাকতে তো হাড়ে দুব্বো গজিয়ে দিল! এখন তোদের চলবে! কান খুলে শুনে রাখ--  কোত্থাও দাঁত-ফোটাতে দেব না... এই আমি বলে দিলুম!  বেশি জ্বালালে সব আশ্রমের নামে লিখে দিয়ে যাব! বউদের সঙ্গে ফন্দি কর, হাঁড়ি আলাদা কর, লোক ডাক... যা করবি নিজেদের ঘরে গিয়ে কর গে যা! বাপ মরেছে এক মাসও পেরোয়নি... বউগুলোও হয়েছে তেমনি!” 
শেষ কথাগুলো বলে বাঁ-পাটা একবার ঠুকলেন মেঝেতে। আরো উত্তেজিত করলে আরো বড়ো কিছু ঘটাতে পারেন... পাশের বাড়ির লোক চলে আসবে। 
বাইরে পায়ের শব্দ হল ধুপধাপ করে... বউমারা  সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিজের নিজের ঘরে চলে যাচ্ছে। কয়েক সেকন্ড নীরবতার পর ছোটো ছেলে মাকে শুনিয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে বলল "তাহলে কী করব? সার্ভেয়ার..." বড়ো ছেলে কোনো উত্তর না দিয়ে চোয়াল শক্ত করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল। সুলেখা দেবী ততক্ষণে আবার খাটে বসে পড়েছেন, দেওয়ালে টাঙানো রমাপদবাবুর ছবির দিকে উদাস ভাবে  তাকিয়ে আগের মতই করুণ স্বরে বললেন, "শোন না, বলছি লনড্রির ছেলেটাকে কাল সকালে একটু ডেকে দিবি বাবা? আলমারি ভর্তি মানুষটার জামা-কাপড়, কত শখের... স-অ-ব রয়ে গেল!"
ছোটো ছেলে 'পারব না' বলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বুড়ি আবার এক লাফে খাট থেকে নেমে চেঁচিয়ে উঠলেন "তা পারবি কেন? বউ কিছু বলুক... অমনি নেচে নেচে ছাগলের মত চলে যাবি তার বাপের-বাড়ি কুলির মত!"
রমাপদ টের পেলেন, গিন্নি পুরনো ফর্ম ফিরে পেয়ে গেছে। বুড়ি বেকায়দায় ফেলে দিচ্ছে দেখে, এবারে ছেলের বউরা ঘরে বসে অন্যভাবে মাথা খাটাবে... আবার পরে ছেলেদের পাঠাবে, কখনো আলাদা আলাদা, কখনো একসঙ্গে। তবে চিঁড়ে সহজে ভিজবে না। এরা শুরুতেই হুড়োহুড়ি করে ভুল করল। 
     বুড়ি উদাস চোখে কিছুক্ষণ রমাপদবাবুর ছবির দিকে তাকিয়ে রইল, তার একট হাই তুলে ঘরে রাখা টিভিটা চালিয়ে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পছন্দের বাংলা ধারাবাহিকের চ্যানেলে এসে থামল। একটা বেশ জমিয়ে পাক দিয়ে ওঠা ঝামেলা এমন সস্তা বাজির মত নিভে গেল দেখে ব্রজেন ঘোষাল ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “একবার চক্কোত্তিদের ছাদে যেতে হবে বুঝলে... দেরি হয়ে গেল, অপেক্ষা করছে।  আসছ তো?” রমাপদ ঘাড় নেড়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বললেন "নাহ্‌! বরং পরে রাতের দিকে তোমাদের পুকুর পাড়ে... ওহ, সে পুকুর আর কোথায়, সেখানেও তো ফ্ল্যাট উঠে গেছে! সরি। " খোঁচাটা বুঝতে অসুবিধে হল না ব্রজেন ঘোষালের, আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোঁ করে ভেসে চলে গেল সেখান থেকে। বাতাসে দুলে উঠল আমগাছের ডালগুলো। 

     গিন্নি ভুরু কুঁচকে টিভির দিকে তাকিয়ে বসে আছে, টিভির যা ভলিউম তাতে পাশের বাড়ির লোকও শুনতে পাবে... আর রমাপদর তো এমনিই চোখ-কান খুলে গেছে শরীর থেকে বেরিয়ে আসার পর। অনেক দূরের কথাও কান পাতলে শুনতে পাচ্ছেন, অনেক দূরের জিনিসও একদম কাছের মনে হচ্ছে একটু মন-সংযোগ করলে। টিভির পেছনের দেওয়ালেই একটু ওপরে রমাপদবাবুর ছবিটা একটা সুন্দর চকচকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে টাঙানো হচ্ছে। সেদিকে চোখ গেলেই আবার অস্বস্তিটা জেগে ওঠে  রমাপদর। ব্রজেন বলেছে, এই ব্যাপারটা কাটতে মাস কয়েক সময় নেবে। অনেকের তারপরেও যায় না। 
     
     আসলে রমাপদর বেঁচে থাকতেও অনেক কিছু নিয়ে অনভ্যেস ছিল। অনেক কিছুই ধাতে সইত না। এখনো তা থেকে যাবে। তাই নিজেকে নিয়ে চিন্তাই হয়। আজকাল নিজেকে নিয়ে একটু বেশি-ই চিন্তা হয় রমাপদর। আগের মত দুশ্চিন্তা নয়, অন্যরকম। নিজের প্রতি একটা মায়া, যাকে ইংরেজিতে বলে এমপ্যাথি... যার জন্মও হয়ত এক প্রকার সেলফ-লাভ থেকেই। অথচ নিজের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে গেলে আরো দুর্বল লাগে। চোখের সামনে তো দেখছে অন্যদের অবস্থা! মনে হয় সুলেখার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে গেলেও ওকে আরো দুর্বল করে দেওয়া হবে। বরং স্মৃতি, অভ্যেস আর অতীত-বিরক্তি অতিক্রম করে এই বয়সে এসে ও কেমন থাকতে চায়... কেমন থাকতে পারে-- এটা দেখার ইচ্ছে বেশি। শুধু ছবিটা ওরা অন্য দেওয়ালে টাঙিয়ে দিক। বার বার চোখে পড়ে, অস্বস্তি হয়। আপনজনকে হারানোর ব্যথায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়। এ এক আশ্চর্য অনুভূতি... নিজে যে নিজের এতটা আপনজন, এতকাল বুঝতেই পারেনি এভাবে! হ্যাঁ... শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরেও অনুভূতি আর জমা কথাগুলো থাকে। বরং অনেকরকম অনুভূতি বাড়ে, অব্যক্ত... বেঁচে থাকতে যেগুলোর ব্যাপারে ধারণা ছিল না। মা বলতেন, 'অসহ্য কষ্ট হলে ঠাকুরের শেষ দিনগুলো মনে করিস... তারপর মা আর শিষ্যদের অবস্থা মনে করিস'। রমাপদর অত আধ্যাত্মিকতাও ছিল না, মনের জোরও ছিল না। ভাবেই নি এসব। শেষদিকে মা-কে আর মায়ের এই কথাগুলো মনে পড়ত। এখন মনে হয়... মা যেন ভোলা বাঁড়ুজ্জের বউয়ের মত এসব পিছুটান ছিঁড়ে বেরিয়ে গিয়ে থাকেন। মাকে যেন এভাবে দেখতে না হয়। 

ব্রজেনের জন্য খারাপ লাগল একটু। পুকুরের খোঁচাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। বড়ো সাধের পুকুর ছিল। একসাথে কত মাছ ধরেছে এক কালে। ঘাটে বসে চা-ফুলুরি খেয়েছে একসাথে। পুকুর, জীবজন্তু আর গাছগুলো মরে ভূত হয় না? সবাই কি সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি পায়? সম্ভব? হয়ত ওরাও প্রেত হয়ত হয়... কিছু একটা কায়দা আছে তাদের অশরীরীদের খুঁজে বের করার। সেটা শিখতে পারলে ব্রজেনকে আর মন খারাপ করতে হবে না। পুরনো ব্যবস্থা আবার বহাল করা যাবে! ভূত পুকুর, তাতে ভূত মাছ, চারপাশে পরিচিত ভূত লোকজন... পাঁচিল টপকে এপাড়ে চলে আসা সকলের একটা আলাদা জগত। এইসব ভাবতে ভাবতে ব্রজেনের মতই ভেসে উঠে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ধপ করে ডালের ওপর পড়ে গেল রমাপদ। গাছের ডালগুলো হালকা মরমর শব্দ করল, বাতাস বইলে যেমন হয়। এতক্ষণে রমাপদর খেয়াল হল-- আকাশে থালার মত বড়ো একটা চাঁদ উঠছে, তবে নিটোল গোল না... হয়ত কাল পূর্ণিমা। দক্ষিণ দিকে হালকা বাতাসও বইছে। হালকা লালচে মেঘ দ্রুত ভেসে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে চাঁদের কাছ দিয়ে... মাঝে মাঝে তাকে আড়াল করে। টিভি, ছবি, গিন্নি, ঘর সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে চাঁদের দিকে মুখ তুলে তাকাল রমাপদ। আর অমনি... বাতাসে ভাসতে ভাসতে আমগাছটা নীচে রেখে একটু একটু করে ওপরে চলে যেতে লাগল। নীচে তাকাল না, তাই বুঝতে পারল  না বাড়ি, বাগান, পাড়া... এসব ছেড়ে কতটা ওপরে উঠে এসেছে! জ্যোৎস্নার আলোয় কুয়াশার মত মিহি হয়ে বিন্দু বিন্দু ছড়িয়ে যাচ্ছে আসতে আসতে... আবার জড়ো হয়ে যাচ্ছে পুঞ্জিভূত মেঘের মত। 
আছি, অথচ নিজেকেই দেখতে পাচ্ছি না... মানে আসলে নেই-- এই স্থিতিকে মানিয়ে নেওয়ার এ যেন এক অলৌকিক অনুশীলন। 
ছোটোবেলা বেসিক ডিস্কে শোনা কৃষ্ণ চন্দ্র দে'র কণ্ঠস্বরে সেই টান ভেসে আসে-- 
কেন কারাগৃহে আছিস বন্ধ
ওরে, ওরে মূঢ়, ওরে অন্ধ
ভবে সেই সে পরমানন্দ, যে আমারে ভালবাসে...


[আশ্বিন, ১৪২৮ -- প্রকাশিত -- সৃজন ওয়েবপত্রিকা]

নির্বাচিত লেখা

প্রিমিয়াম — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

  ব্লে ডের অভ্যেসটা অনেকদিন হল কেটে গেছে। দাঁত দিয়েই কাজ চলে যায়— যেভাবে মুহূর্তও চলে যায়, টিক টিক শব্দ শোনা যাক বা না যাক। তবু, মাসে অন্ততঃ...

বহু পঠিত লেখাগুলি